আগামী তিন বছরে ১৩ লাখ দুই হাজার ৫৬০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের পরিকল্পনা করেছে সরকার। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে আসবে সবচেয়ে বেশি অর্থ। এনবিআরের নিয়ন্ত্রিত খাত থেকে ১১ লাখ ৩২ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
মধ্যমেয়াদি (২০২০-২৩) পরিকল্পনার আলোকে এ লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এনবিআরের রাজস্ব আয়ের এক উল্লেখযোগ্য অংশ আসবে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও সম্পূরক শুল্ক থেকে। এই দুইখাত থেকে তিন বছরের আদায়ের টার্গেট করা হয়েছে ৬ লাখ ২ হাজার ৫১০ কোটি টাকা। লক্ষ্য অর্জনে ভ্যাটের আওতা আরও বাড়ানো হবে। অর্থ বিভাগ ও এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এ ব্যাপারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ বলেন, অর্থনীতির আকার বেড়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি দেখেও তা বোঝা যায়। কর জিডিপি অনুপাত ১৫-১৬ শতাংশ হওয়ার কথা। কিন্তু কর জিডিপি অনুপাত মাত্র ১০ শতাংশ। অর্থাৎ করের আওতার বাইরে প্রায় ৫ শতাংশ। এই পার্থক্য ঘোচাতে হলে কর জাল বিস্তার করতে হবে। ফাঁকিবাজ বড় করদাতাদের ধরতে হবে। কোর্টের মামলায় আটকা টাকা উদ্ধার করতে হবে। অভিযান চালাতে হবে। আমাদের অর্থনীতির আকার অনুযায়ী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু লক্ষ্য অর্জন হয় না, এসব কাজ হয় না বলে। তাই রাজস্ব লক্ষ্য অর্জন করতে হলে আগে এসব কাজ করতে হবে।
তিন বছরে যে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে তার মধ্যে আগামী ২০২০-২০২১ অর্থবছরে আদায়ের টার্গেট নেওয়া হয়েছে তিন লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। এটি চলতি ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮.৬ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় তিন লাখ ৪৮ হাজার ৬৯ কোটি টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরের রাজস্ব আয়ে এনবিআরের মাধ্যমে আদায় করা হবে তিন লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে তিন লাখ ৫০০ কোটি টাকা। সে হিসাবে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা বেড়েছে ২৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
আগামী অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আদায়ের টার্গেটের মধ্যে বড় অংশটি আসবে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক খাত থেকে। এই খাতে এক লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এদিকে ২০২১-২০২২ অর্থবছরে আদায়ের টার্গেট প্রক্ষেপণ করা হয়েছে চার লাখ ৩১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআর থেকে আসবে তিন লাখ ৭৫ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা। এনবিআরের মধ্যে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক খাত থেকে আসবে এক লাখ ৯৯ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা। এর পরের অর্থবছর, অর্থাৎ ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে চার লাখ ৯২ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা চার লাখ ২৬ হাজার ৮২০ কোটি টাকা। এনবিআরের মধ্যে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক খাত থেকে দুই লাখ ২৬ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা আদায়ের টার্গেট নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এনবিআরের রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হবে না। লক্ষ্যমাত্রা বেশি হওয়ার কারণে কর্মকর্তারা একদিকে চাপে থাকবেন, অন্যদিকে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করতে না পারার একটা গ্লানি ভেতরে ভেতরে কাজ করবে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আদায়ে এনবিআরকে টার্গেট দেওয়া হয়েছিল ২ লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা। অর্থবছরের মাঝামাঝি সময় দেখা যায়, কোনভাবেই এই টার্গেট অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হবে না এনবিআরের পক্ষে। ফলে ১৬ হাজার ২১০ কোটি টাকা কাটছাঁট করে সংশোধিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। তবে বছর শেষে এই সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ধারের কাছেও যাওয়া সম্ভব হয়নি এনবিআরের। ওই অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ২৫ হাজার ৯১৯ কোটি টাকা, যা সংশোধিত রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ৫৪ হাজার ৮১ কোটি টাকা কম। মূল লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে তা ৭০ হাজার ২৮২ কোটি টাকা কম ছিল।
এর আগে, ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরের বাজেটে এনবিআরকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছিল ২ লাখ ৪৮ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। পরে তা সংশোধন করে ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। সে বছরও এনবিআর সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ করতে পারেনি। তাদের প্রকৃত রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৯৬ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা। এই পরিমাণ সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৮ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা কম। এর আগে, ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এনবিআরের আওতাধীন সংশোধিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা যথাক্রমে ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা ও ১ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা নির্ধারিত ছিল। এর বিপরীতে আদায় হয়েছিল যথাক্রমে ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৪২ কোটি টাকা ও ১ লাখ ৭১ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকা। এ হিসাবে দেখা যায়, দিন যত যাচ্ছে, এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রার পাশাপাশি ঘাটতির পরিমাণও বড় হচ্ছে।
বিজনেস বাংলাদেশ/ শেখ


























