১০:৫০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬

মাদক নির্মূল করতে মাঠ পর্যায় থেকে কাজ করা জরুরি

তবু আঠারোর শুনেছি জয়ধ্বনি/ এ বয়স বাঁচে দুর্যোগে আর ঝড়ে, বিপদের মুখে এ বয়স অগ্রণী/ এ বয়স তবু নতুন কিছু তো করে। সুকান্ত ভট্টাচার্য তার কবিতায় পদাঘাতে পাথর ভাঙতে চাওয়া সেই দুঃসাহসী তরুণদের বড়ো গর্ব করে জাতির সামনে তুলে ধরেছেন। আর তা করবেনই বা না কেন?
একটি সুন্দর  সমাজ, দেশ, রাষ্ট্র উপহার দিতে তরুণদেরই তো নেতৃত্ব দিতে হয় অন্যথা এত অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাড়াবে কে, প্রতিবাদ করবে কে!
তবে বর্তমান প্রেক্ষাপট কি এই তরুণদের দেশসেবার কাজে, নিজেদের সমৃদ্ধ করার কাজে মনোনিবেশ করতে দিচ্ছে!  ভয়াল থাবা হানছে মাদক নামক এক অদ্ভুত বস্তু।তিলে তিলে নিঃশেষ করে দিচ্ছে যুব সমাজ।
এই যুব ধ্বংসের হার নিছকই কম নয়। ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের হিসেবে,দেশে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩৬ লাখ এবং সবচেয়ে বেশি মাদকাসক্ত রয়েছে ঢাকাতে। যদিও বেসরকারি সংস্থাগুলোর হিসেবে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৭০ লক্ষ।
এতে স্পষ্ট যে,যুব সমাজের এক বিরাট অংশ এই মাদকের কবলে পড়ে আছে। এখন প্রশ্ন আসছে কিভাবে এত পরিমাণ মাদকের যোগান দেয়া হয় দেশে?
সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ কি নেই? সম্প্রতি ৫ই মার্চ চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন অঞ্চল থেকে ২৪ হাজার পিস ইয়াবা সহ একজন মাদক চোরাকারবারি আটক করা হয়েছে। শুধু তাই নয় করোনাকালীন যে দুর্যোগ আমরা পার করছি এই দুঃসময়ের এবং দুর্বলতার সুযোগে নিচ্ছে যুব সমাজ ধ্বংসকারী মাদক ব্যবসায়ীরা।
এই দুর্যোগকালীন যে ত্রাণ সামগ্রী বহনকারী  ভ্যান,গাড়ি, পিকাপ আসা যাওয়া করছে এসব ত্রাণ সামগ্রীর আড়ালে শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীরা মাদক দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দিচ্ছে। পণ্য পরিবহনের গাড়িতেই সারা দেশে চালান হচ্ছে মাদক এবং করোনা যুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যস্ততার সুযোগ নিচ্ছে এই অসাধু চক্র।
যেখানে সামরিক বাহিনী নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে করোনা মোকাবিলায় দিনরাত সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষায় পরিশ্রম করে যাচ্ছে তারই সুযোগ নিচ্ছে এই অসাধু ব্যবসায়ীরা। যুব সমাজকে ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যু মুখে।এরপরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সক্রিয় থেকে ঢাকার যাত্রাবাড়ি,পল্টন,ওয়ারী,নরসিংদী থেকে উদ্ধার করেন প্রচুর ইয়াবা।
এই চক্র করোনাকালীন মাদক পৌঁছে দেয়াকে “করোনাকালে মাদকের ইমার্জেন্সি সার্ভিস” হিসেবে বিশেষ উপাধি দিয়েছে।
সম্প্রতি লবণ বোঝাই গাড়িতে ৫৯ হাজার ইয়াবা জব্দ করে পুলিশ এবং এ বছর এপ্রিলে র‍্যাব, পুলিশ  ও বিজিবির অভিযানে  প্রায় ৩ লক্ষ ইয়াবা কক্সবাজার থেকে উদ্ধার করা হয়। টেকনাফ অঞ্চলের রোহিঙ্গাদের মধ্যে কিছু চক্রের এই মাদক পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগ আছে এবং এর যথাযথ প্রমাণ পাওয়া গেছে।
গত বছর ২০১৯ সালে নতুন ধরণের এক মাদকের চালান করা হয় দেশে যার নাম “আইস। এর শরীরে গ্রহণ প্রক্রিয়া ইয়াবার মত হলেও ইয়াবার থেকে কয়েক গুণ বেশি ক্ষতিকর। গতবছর রাজধানীর ক্ষিলক্ষেত ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে এই নতুন মাদক আইস জব্দ করা হয় এবং সাথে একজন মাদক পাচারকারী নাইজেরিয়ান ব্যক্তি আটক করা হয়।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ২০১৮ সালে “চল যাই যুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে” শিরোনামে অভিযান শুরু করে র‍্যাব। একইসাথে পুলিশও এই মাদক বিরোধী অভিযানে সমান তালে প্রচেষ্টা করে। গতবছরই বন্দুক যুদ্ধে নিহত হয় ৩৮৯ জন এবং আত্মসমর্পণ করে শীর্ষস্থানীয় ১০২ জন মাদক ব্যবসায়ী।
এই ভাবে মাদক বিরোধী অভিযানও চলছে পাশাপাশি মাদক সাপ্লাই হয়ে যাচ্ছে সারা দেশে আর এই নোংরা পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে আমাদের যুব সমাজ। কিন্ত যদি প্রশ্ন করা হয় যুব সমাজ কেন মাদকের দিকে ঝুঁকছে? তাহলে এর পিছনের অন্যরকম চিত্র উঠে আসবে। প্রধান যে কারণ তা হচ্ছে সহজলভ্যতা। মাদক ক্রয় করা
কোনো কষ্টসাধ্য ব্যাপার নয়।হাতের কাছে পৌঁছে দিয়ে যাচ্ছে অসাধু চক্র। উঠতি বয়সী ছেলেমেয়েরা বন্ধুদের চাপে পরে শুধু মাত্র মাদকের স্বাদ গ্রহণ করতে যেয়ে অথবা মনের কৌতুহল মেটাতে যেয়ে আসক্ত হয়ে যাচ্ছে অথবা পরিবারে কলহ, বাবা মার সন্তানের প্রতি যথেষ্ট সচেতন না থাকা, সন্তানকে সঠিক এবং পর্যাপ্ত সময় না দেয়া, বাবা মার মধ্যকার ঝগড়া বিবাদ সন্তানের মনে অত্যন্ত গভীর এবং তীব্র বিষাদ সৃষ্টি করে।
এই বিষাদ থেকে স্বস্তি পেতেও যুবসমাজ মাদকের মত ভুল জিনিসের আশ্রয় নেয়। অনেক ছেলেমেয়ের শৈশব বিকাশ সঠিক ভাবে বিকশিত হয় না। বাবা মায়ের উভয়ের ব্যস্ততা অথবা পারিবারিক অস্থিতিশীলতা ছেলেমেয়ের শৈশব বিকাশে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়।
যার কারণে সঠিক বেঠিক বেছে নেয়ার পরিপূর্ণ জ্ঞান তাদের তৈরি হয় না। বয়ঃসন্ধি কালের ভালোবাসার সম্পর্ক ভাঙনেও ছেলেমেয়েদের মাদকের রাস্তায় আসতে দেখা যায়। নানাবিধ কারণেই তাদের অস্বতিজনক মানসিক  অবস্থা থেকে সাময়িক মুক্তি পেতে এই ভুল পথ বেঁছে নেয়।
মাদকদ্রব্য  নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী দেশে আসক্তদের শতকরা ৯০ ভাগ কিশোর এবং তরুণ। তাদের মধ্যে ৪৫ শতাংশ বেকার এবং ৬৫ শতাংশ আন্ডারগ্র‍্যাজুয়েট।
বাকি ১৫ শতাংশ উচ্চ শিক্ষিত।অর্থাৎ বেকারত্ব মানসিক বিকারের জন্য অন্যতমভাবে দায়ী। যার জন্য তারা মাদকের উপর ঝুঁকে পরছে।ফেন্সিডিল, ইয়াবার মত সিসা নামক এক ভয়ংকর মাদকের আবির্ভাব ঘটেছে আর মধ্যে কার্বন মনোক্সাইড এর পরিমাণ সিগারেটের চেয়ে চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি।
এই মাদক অতি সহজেই মস্তিষ্ক বিকৃতি এবং চূড়ান্ত ফলাফল হিসেবে মৃত্যু ডেকে আনে। গবেষণায় দেখা গেছে এই মাদক গ্রহণকারীদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আকস্মিক মৃত্যু ঘটে। মাদকের ভয়াল থাবার কবলে আমাদের দেশের অর্থনীতি কিভাবে হেলে পড়ছে তা অকল্পনীয় এবং ভয়ানক বিপদের ইংগিত দেয়।
 বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী প্রতিবছর ১০ হাজার কোটিরও বেশি টাকার মুদ্রা বিদেশে পাচার হচ্ছে। অপর একটি প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে মাদকসেবীরা প্রতিদিন গড়ে অন্তত ২০ কোটি টাকার মাদক সেবন করছে। আরও ভয়ংকর তথ্য হলো বেশির ভাগ ইয়াবা ভেজাল ইয়াবা রূপে দেশে আসছে যা তরুণদের ধ্বংস আরও দ্রুত ডেকে আনছে। মাদক হচ্ছে একধরনের রাসায়নিক বস্তু যা সেবনে ব্যাথানাশক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি শারীরিক এবং মানসিক বিকৃতি সৃষ্টি করে।
সাথে সাথে উচ্চরক্তচাপ ও তন্দ্রাছন্নতাসহ অনেক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং সেই সঙ্গে মাদকের প্রতি নিরবচ্ছিন্ন রাসায়নিক বস্তু গ্রহণ করার প্রবল আকাংক্ষা তৈরি করে।এইসব রাসায়নিক বস্তুর প্রতি এমন নেতিবাচক আসক্তির নামই মাদকাসক্তি।
যে যুব সমাজের এখন ঘাম ঝরানোর সময়, রাষ্ট্রের রূপ পাল্টে দিয়ে নতুন রাষ্ট্র উপহার দেয়ার সময় তারাই মাদকের ভয়াল গ্রাসে নিপতিত হচ্ছে। মাঠ পর্যায় থেকে শুরু করে প্রতিটি পর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। বাবামায়ের দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালনে কাউন্সিলিং করার ব্যবস্থা করতে হবে।
মাদক আসলে কি, এর সেবন কতটা ভয়াবহ এসব বিষয় সম্পর্কে যুবসমাজকে শিক্ষা ক্ষেত্র থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রে তথ্য সরবারাহ এবং সুষ্ঠু শিক্ষা দিতে হবে। পাশাপাশি স্ব স্ব ধর্মের সঠিক ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিটি শিশু কিশোরদের দেয়া নিশ্চিত করতে হবে। এই যুবসমাজ হয়ে উঠুক প্রাণোচ্ছল।
যেকোনো বিপদ অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে ঠাঁই দাড়িয়ে মোকাবিলা সক্ষম হোক। আর কোনো আকস্মিক মৃত্যু আমরা দেখতে চাই না। একটি সুন্দর এবং নতুন পৃথিবীর জন্ম হোক তরুণদের হাত ধরে।
লেখক- সুবর্ণা মোস্তফা শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
ট্যাগ :
জনপ্রিয়

যে কোনো হামলাকে সর্বাত্মক যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করবে ইরান

মাদক নির্মূল করতে মাঠ পর্যায় থেকে কাজ করা জরুরি

প্রকাশিত : ১২:২৪:৫৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২০
তবু আঠারোর শুনেছি জয়ধ্বনি/ এ বয়স বাঁচে দুর্যোগে আর ঝড়ে, বিপদের মুখে এ বয়স অগ্রণী/ এ বয়স তবু নতুন কিছু তো করে। সুকান্ত ভট্টাচার্য তার কবিতায় পদাঘাতে পাথর ভাঙতে চাওয়া সেই দুঃসাহসী তরুণদের বড়ো গর্ব করে জাতির সামনে তুলে ধরেছেন। আর তা করবেনই বা না কেন?
একটি সুন্দর  সমাজ, দেশ, রাষ্ট্র উপহার দিতে তরুণদেরই তো নেতৃত্ব দিতে হয় অন্যথা এত অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাড়াবে কে, প্রতিবাদ করবে কে!
তবে বর্তমান প্রেক্ষাপট কি এই তরুণদের দেশসেবার কাজে, নিজেদের সমৃদ্ধ করার কাজে মনোনিবেশ করতে দিচ্ছে!  ভয়াল থাবা হানছে মাদক নামক এক অদ্ভুত বস্তু।তিলে তিলে নিঃশেষ করে দিচ্ছে যুব সমাজ।
এই যুব ধ্বংসের হার নিছকই কম নয়। ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের হিসেবে,দেশে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩৬ লাখ এবং সবচেয়ে বেশি মাদকাসক্ত রয়েছে ঢাকাতে। যদিও বেসরকারি সংস্থাগুলোর হিসেবে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৭০ লক্ষ।
এতে স্পষ্ট যে,যুব সমাজের এক বিরাট অংশ এই মাদকের কবলে পড়ে আছে। এখন প্রশ্ন আসছে কিভাবে এত পরিমাণ মাদকের যোগান দেয়া হয় দেশে?
সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ কি নেই? সম্প্রতি ৫ই মার্চ চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন অঞ্চল থেকে ২৪ হাজার পিস ইয়াবা সহ একজন মাদক চোরাকারবারি আটক করা হয়েছে। শুধু তাই নয় করোনাকালীন যে দুর্যোগ আমরা পার করছি এই দুঃসময়ের এবং দুর্বলতার সুযোগে নিচ্ছে যুব সমাজ ধ্বংসকারী মাদক ব্যবসায়ীরা।
এই দুর্যোগকালীন যে ত্রাণ সামগ্রী বহনকারী  ভ্যান,গাড়ি, পিকাপ আসা যাওয়া করছে এসব ত্রাণ সামগ্রীর আড়ালে শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীরা মাদক দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দিচ্ছে। পণ্য পরিবহনের গাড়িতেই সারা দেশে চালান হচ্ছে মাদক এবং করোনা যুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যস্ততার সুযোগ নিচ্ছে এই অসাধু চক্র।
যেখানে সামরিক বাহিনী নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে করোনা মোকাবিলায় দিনরাত সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষায় পরিশ্রম করে যাচ্ছে তারই সুযোগ নিচ্ছে এই অসাধু ব্যবসায়ীরা। যুব সমাজকে ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যু মুখে।এরপরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সক্রিয় থেকে ঢাকার যাত্রাবাড়ি,পল্টন,ওয়ারী,নরসিংদী থেকে উদ্ধার করেন প্রচুর ইয়াবা।
এই চক্র করোনাকালীন মাদক পৌঁছে দেয়াকে “করোনাকালে মাদকের ইমার্জেন্সি সার্ভিস” হিসেবে বিশেষ উপাধি দিয়েছে।
সম্প্রতি লবণ বোঝাই গাড়িতে ৫৯ হাজার ইয়াবা জব্দ করে পুলিশ এবং এ বছর এপ্রিলে র‍্যাব, পুলিশ  ও বিজিবির অভিযানে  প্রায় ৩ লক্ষ ইয়াবা কক্সবাজার থেকে উদ্ধার করা হয়। টেকনাফ অঞ্চলের রোহিঙ্গাদের মধ্যে কিছু চক্রের এই মাদক পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগ আছে এবং এর যথাযথ প্রমাণ পাওয়া গেছে।
গত বছর ২০১৯ সালে নতুন ধরণের এক মাদকের চালান করা হয় দেশে যার নাম “আইস। এর শরীরে গ্রহণ প্রক্রিয়া ইয়াবার মত হলেও ইয়াবার থেকে কয়েক গুণ বেশি ক্ষতিকর। গতবছর রাজধানীর ক্ষিলক্ষেত ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে এই নতুন মাদক আইস জব্দ করা হয় এবং সাথে একজন মাদক পাচারকারী নাইজেরিয়ান ব্যক্তি আটক করা হয়।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ২০১৮ সালে “চল যাই যুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে” শিরোনামে অভিযান শুরু করে র‍্যাব। একইসাথে পুলিশও এই মাদক বিরোধী অভিযানে সমান তালে প্রচেষ্টা করে। গতবছরই বন্দুক যুদ্ধে নিহত হয় ৩৮৯ জন এবং আত্মসমর্পণ করে শীর্ষস্থানীয় ১০২ জন মাদক ব্যবসায়ী।
এই ভাবে মাদক বিরোধী অভিযানও চলছে পাশাপাশি মাদক সাপ্লাই হয়ে যাচ্ছে সারা দেশে আর এই নোংরা পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে আমাদের যুব সমাজ। কিন্ত যদি প্রশ্ন করা হয় যুব সমাজ কেন মাদকের দিকে ঝুঁকছে? তাহলে এর পিছনের অন্যরকম চিত্র উঠে আসবে। প্রধান যে কারণ তা হচ্ছে সহজলভ্যতা। মাদক ক্রয় করা
কোনো কষ্টসাধ্য ব্যাপার নয়।হাতের কাছে পৌঁছে দিয়ে যাচ্ছে অসাধু চক্র। উঠতি বয়সী ছেলেমেয়েরা বন্ধুদের চাপে পরে শুধু মাত্র মাদকের স্বাদ গ্রহণ করতে যেয়ে অথবা মনের কৌতুহল মেটাতে যেয়ে আসক্ত হয়ে যাচ্ছে অথবা পরিবারে কলহ, বাবা মার সন্তানের প্রতি যথেষ্ট সচেতন না থাকা, সন্তানকে সঠিক এবং পর্যাপ্ত সময় না দেয়া, বাবা মার মধ্যকার ঝগড়া বিবাদ সন্তানের মনে অত্যন্ত গভীর এবং তীব্র বিষাদ সৃষ্টি করে।
এই বিষাদ থেকে স্বস্তি পেতেও যুবসমাজ মাদকের মত ভুল জিনিসের আশ্রয় নেয়। অনেক ছেলেমেয়ের শৈশব বিকাশ সঠিক ভাবে বিকশিত হয় না। বাবা মায়ের উভয়ের ব্যস্ততা অথবা পারিবারিক অস্থিতিশীলতা ছেলেমেয়ের শৈশব বিকাশে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়।
যার কারণে সঠিক বেঠিক বেছে নেয়ার পরিপূর্ণ জ্ঞান তাদের তৈরি হয় না। বয়ঃসন্ধি কালের ভালোবাসার সম্পর্ক ভাঙনেও ছেলেমেয়েদের মাদকের রাস্তায় আসতে দেখা যায়। নানাবিধ কারণেই তাদের অস্বতিজনক মানসিক  অবস্থা থেকে সাময়িক মুক্তি পেতে এই ভুল পথ বেঁছে নেয়।
মাদকদ্রব্য  নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী দেশে আসক্তদের শতকরা ৯০ ভাগ কিশোর এবং তরুণ। তাদের মধ্যে ৪৫ শতাংশ বেকার এবং ৬৫ শতাংশ আন্ডারগ্র‍্যাজুয়েট।
বাকি ১৫ শতাংশ উচ্চ শিক্ষিত।অর্থাৎ বেকারত্ব মানসিক বিকারের জন্য অন্যতমভাবে দায়ী। যার জন্য তারা মাদকের উপর ঝুঁকে পরছে।ফেন্সিডিল, ইয়াবার মত সিসা নামক এক ভয়ংকর মাদকের আবির্ভাব ঘটেছে আর মধ্যে কার্বন মনোক্সাইড এর পরিমাণ সিগারেটের চেয়ে চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি।
এই মাদক অতি সহজেই মস্তিষ্ক বিকৃতি এবং চূড়ান্ত ফলাফল হিসেবে মৃত্যু ডেকে আনে। গবেষণায় দেখা গেছে এই মাদক গ্রহণকারীদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আকস্মিক মৃত্যু ঘটে। মাদকের ভয়াল থাবার কবলে আমাদের দেশের অর্থনীতি কিভাবে হেলে পড়ছে তা অকল্পনীয় এবং ভয়ানক বিপদের ইংগিত দেয়।
 বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী প্রতিবছর ১০ হাজার কোটিরও বেশি টাকার মুদ্রা বিদেশে পাচার হচ্ছে। অপর একটি প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে মাদকসেবীরা প্রতিদিন গড়ে অন্তত ২০ কোটি টাকার মাদক সেবন করছে। আরও ভয়ংকর তথ্য হলো বেশির ভাগ ইয়াবা ভেজাল ইয়াবা রূপে দেশে আসছে যা তরুণদের ধ্বংস আরও দ্রুত ডেকে আনছে। মাদক হচ্ছে একধরনের রাসায়নিক বস্তু যা সেবনে ব্যাথানাশক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি শারীরিক এবং মানসিক বিকৃতি সৃষ্টি করে।
সাথে সাথে উচ্চরক্তচাপ ও তন্দ্রাছন্নতাসহ অনেক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং সেই সঙ্গে মাদকের প্রতি নিরবচ্ছিন্ন রাসায়নিক বস্তু গ্রহণ করার প্রবল আকাংক্ষা তৈরি করে।এইসব রাসায়নিক বস্তুর প্রতি এমন নেতিবাচক আসক্তির নামই মাদকাসক্তি।
যে যুব সমাজের এখন ঘাম ঝরানোর সময়, রাষ্ট্রের রূপ পাল্টে দিয়ে নতুন রাষ্ট্র উপহার দেয়ার সময় তারাই মাদকের ভয়াল গ্রাসে নিপতিত হচ্ছে। মাঠ পর্যায় থেকে শুরু করে প্রতিটি পর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। বাবামায়ের দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালনে কাউন্সিলিং করার ব্যবস্থা করতে হবে।
মাদক আসলে কি, এর সেবন কতটা ভয়াবহ এসব বিষয় সম্পর্কে যুবসমাজকে শিক্ষা ক্ষেত্র থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রে তথ্য সরবারাহ এবং সুষ্ঠু শিক্ষা দিতে হবে। পাশাপাশি স্ব স্ব ধর্মের সঠিক ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিটি শিশু কিশোরদের দেয়া নিশ্চিত করতে হবে। এই যুবসমাজ হয়ে উঠুক প্রাণোচ্ছল।
যেকোনো বিপদ অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে ঠাঁই দাড়িয়ে মোকাবিলা সক্ষম হোক। আর কোনো আকস্মিক মৃত্যু আমরা দেখতে চাই না। একটি সুন্দর এবং নতুন পৃথিবীর জন্ম হোক তরুণদের হাত ধরে।
লেখক- সুবর্ণা মোস্তফা শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়