০৫:১৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬

গরু বিক্রি করে লাভ নয়, আসল তোলা নিয়ে চিন্তায় খামারিরা

করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে এবার গরু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন চট্টগ্রামের পটিয়ার খামারিরা। কোরবানির ঈদ যতই এগিয়ে আসছে, ততই তাদের দুশ্চিন্তা বাড়ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে লাভের আশাতো দূরে থাক বাজারে গরু তুলে তা বিক্রি করে আসল তুলতে পারবেন কি-না তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন খামারিরা।
চট্টগ্রামের মধ্যে মাংসের চাহিদা মেটাতে বড় ভূমিকা রেখে আসছেন পটিয়ার খামারি ও কৃষকরা। এবার কোরবানির ঈদকে টার্গেট করে পটিয়ার খামারি পালন করেছেন এক ৫০ হাজারের  বেশি গরু। এছাড়াও প্রায় ১৫ হাজার ছাগল পালন করেছেন খামারিরা। করোনার কারণে এবার প্রায় ৫০ ভাগ পশু অবিক্রিত থাকতে পারে বলে পটিয়ার খামারি ও কৃষকরা আশঙ্কা করছেন।
পটিয়া উপজেলার কেলিশহর ইউনিয়নের উত্তরভূর্ষী গ্রামের খামারি মোঃ মুনছুর আলম সারা বছর বাড়িতে কমবেশি গরু পালন করেন। তবে কোরবানির ঈদ সামনে আসলে লাভের আশায় বাড়িতে গরুর সংখ্যা বাড়ান। এবারও তার খামারে ছোট বড় মিলিয়ে ১২টি গরু রয়েছে। দিন-রাত গরু পরিচর্যায় সময় পার করছেন। তবে ঈদের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই তার দুশ্চিন্তা বাড়ছে। হান্নানের মত জেলার বেশির ভাগ খামারি গরু বিক্রি করা নিয়ে এখন দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
করোনা পরিস্থিতির কারণে লাভ কম হলেও অনেক খামারি স্থানীয় বাজারে আগেই গরু বিক্রি করে দিচ্ছেন। আর যারা ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের অন্য জেলায় গরু বিক্রি করেন তারা অপেক্ষা করছেন পরিস্থিতি বোঝার জন্য।
প্রাণিসম্পদ অফিসে সূত্র জানায়, গত বছর  ছোটবড় মিলিয়ে প্রায় ৪৫  হাজার গরু পালন হয়েছিল। খামারিরা ভালোই লাভ পেয়েছিলেন। এবার জেলায় প্রায় এক লাখের কাছাকাছি গরু পালন করছেন খামারিরা। গতবারের তুলনায় এবার গরুর সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার বেশি।
পটিয়া উপজেলার খরনা ইউনিয়নের ফকির পাড়া গ্রামের খামারি আব্দুল লতিফ জানান, গত বছর গরু বিক্রি করে মোটামুটি লাভ হয়েছিল। তাই এবারও গরু পালছি। করোনার কারণে এবার লাভতো দূরে থাক আসল দাম তুলতে পারলেই আল্লাহর কাছে শুকরিয়া। গো-খাদ্যের যে দাম বেড়েছে তাতে এবার লোকসান হবে বলে মনে হচ্ছে। অন্য বছর আগেই ব্যাপারীরা বাড়ির ওপর আসতো। এবার কেউ আসছে না। দু’একজন আসলেও দাম বলছেন অনেক কম।
উপজেলার হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নের খামার মালিক সোহেল রানা বলেন, গত বছর সাত লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। এতো টাকা বিনিয়োগ করে যদি ভালো দাম না পাই তাহলে দুঃখের সীমা থাকবে না। করোনার কারণে গরু বাজারে নিয়ে বিক্রি করা এবার কঠিন হবে। তাই বাড়ির ওপর থেকে বা স্থানীয়ভাবে কম লাভ হলেও গরু ছেড়ে দেবেন বলে জানান। তার খামারে ৫টির মত বড় গরু রয়েছে।
 উপজেলায় কয়েকটি  বড় গরুর হাট বসে। করোনা পরিস্থিতির মধ্যে হাটগুলো বসবে কিনা তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় খামারীরা।  গতবারের তুলনায় গরু বেশি হওয়ায় খামারীরা মুনাফার কথা বাদ দিয়ে আসল তুলতে পারবে কি না তা নিয়ে খুব চিন্তায় আছে। বিশেষ করে বড় গরুর চাহিদা এবার নেই বললেই চলে।
তিনি বলেন, অন্যান্য বছর আমরা চাহিদা মত গরু আগে থেকে কিনে রাখতাম। এবার গরু কিনছি না। দু-একজন আছেন যারা কিছু অর্ডারের গরু কিনছেন। চট্টগ্রামের অনেক ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ আছেন যারা আগেই গরু কিনে রাখতেন। এবার তারাও খুব একটা অর্ডার দিচ্ছেন না। গত বছরের তুলনায় এবার চাহিদা অনেক কম।
আজাহার আলী নামে এক গরু ব্যবসায়ী বলেন, গরুর বাজার কম। কোরবানির আগে দাম বাড়বে বলে মনে হয় না। মানুষের হাতে টাকা নেই। তাই কোরবানির সংখ্যা এবার কম হবে। বেশির ভাগ প্রান্তিক খামারি এবার লোকসানে পড়বেন। অনেকেই গরু বিক্রি করতে পারবেন না। যারা বিক্রি করতে পারবেন তারাও লাভ পাবেন কম।
পটিয়া উপজেলার হাইদগাও ইউনিয়নের গুচ্ছ গ্রামের বড় খামার মালিক হেলাল উদ্দীন। তার খামারটির অবস্থান পাহাড়ি এলাকা গিরে। সমন্বিত এ খামারে এবার তার ৩৫টি গরু রয়েছে। তবে এবার গরু বিক্রি নিয়ে তার দুশ্চিন্তা বাড়ছে।
 উপজেলার আরেক বড় খামারি শরিফ হোসেন। তার খামারে ছোট বড় মিলিয়ে ৬০টি গরু রয়েছে। এ গরুর অর্ধেক বিক্রি করা নিয়ে তার দুশ্চিন্তা। লাভ নিয়ে ভাবছেন না। গরু বিক্রি করতে পারলেই তিনি খুশি। কারণ খামারে গরু থেকে গেলে প্রতিদিন তার পেছনে ব্যয় আছে। তাতে লোকসান আরও বাড়বে। তাই খামার খালি করা নিয়েই ভাবছেন তিনি।
খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিবার ঈদের দু-এক মাস আগে থেকেই জেলার হাটে হাটে ঘুরে ব্যাপারীরা গরু কিনে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন হাটে তুলতেন। এবার সেই সংখ্যা অনেক কম। উপজেলার বড় পশুর হাট রয়েছে ৬টি। এসব হাট ছাড়াও প্রত্যন্ত অঞ্চলে আরও ছোট ছোট হাট-বাজারে বিক্রির জন্য প্রতিদিন হাজার হাজার গরু-ছাগল নিয়ে আসছেন খামারিরা। কিন্ত কেনাবেচা একদম কম। ঈদুল আজহার আর মাত্র ১০-১৫ দিন বাকি থাকলেও এবার বাইরের ব্যাপারীদের তেমন একটা দেখা মিলছে না।
পটিয়া প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. জপু চক্রবর্তী বলেন, উপজেলায় এবার প্রচুর গরু পালন করেছেন খামারিরা। তবে ঈদ এগিয়ে আসায় তাদের দুশ্চিন্তা বেড়েছে। করোনা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় খামার মালিকরা চট্টগ্রামের বাজারে গরু নিয়ে লাভ করতেন। তারা এবার ক্ষতির মুখে পড়ে যেতে পারেন। কারণ জীবন আগে পরে জীবিকা। এই অবস্থায় দেশের সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে গরুর বাজার। স্থানীয় বাজারে কেনাবেচা হলেও বাইরে থেকে ব্যাপারীরা এবার আসছেন না দেখে চিন্তা বেড়েছে খামারিদের।
তিনি বলেন, আমরা খামারিদের মনোবল বাড়াতে কাজ করছি।
বিজনেস বাংলাদেশ / ইমরান মাসুদ
জনপ্রিয়

বাংলাদেশ ভূমি অফিসার্স কল্যাণ সমিতি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আলোচনা সভা ও ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত

গরু বিক্রি করে লাভ নয়, আসল তোলা নিয়ে চিন্তায় খামারিরা

প্রকাশিত : ০১:৫৩:০৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২০
করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে এবার গরু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন চট্টগ্রামের পটিয়ার খামারিরা। কোরবানির ঈদ যতই এগিয়ে আসছে, ততই তাদের দুশ্চিন্তা বাড়ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে লাভের আশাতো দূরে থাক বাজারে গরু তুলে তা বিক্রি করে আসল তুলতে পারবেন কি-না তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন খামারিরা।
চট্টগ্রামের মধ্যে মাংসের চাহিদা মেটাতে বড় ভূমিকা রেখে আসছেন পটিয়ার খামারি ও কৃষকরা। এবার কোরবানির ঈদকে টার্গেট করে পটিয়ার খামারি পালন করেছেন এক ৫০ হাজারের  বেশি গরু। এছাড়াও প্রায় ১৫ হাজার ছাগল পালন করেছেন খামারিরা। করোনার কারণে এবার প্রায় ৫০ ভাগ পশু অবিক্রিত থাকতে পারে বলে পটিয়ার খামারি ও কৃষকরা আশঙ্কা করছেন।
পটিয়া উপজেলার কেলিশহর ইউনিয়নের উত্তরভূর্ষী গ্রামের খামারি মোঃ মুনছুর আলম সারা বছর বাড়িতে কমবেশি গরু পালন করেন। তবে কোরবানির ঈদ সামনে আসলে লাভের আশায় বাড়িতে গরুর সংখ্যা বাড়ান। এবারও তার খামারে ছোট বড় মিলিয়ে ১২টি গরু রয়েছে। দিন-রাত গরু পরিচর্যায় সময় পার করছেন। তবে ঈদের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই তার দুশ্চিন্তা বাড়ছে। হান্নানের মত জেলার বেশির ভাগ খামারি গরু বিক্রি করা নিয়ে এখন দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
করোনা পরিস্থিতির কারণে লাভ কম হলেও অনেক খামারি স্থানীয় বাজারে আগেই গরু বিক্রি করে দিচ্ছেন। আর যারা ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের অন্য জেলায় গরু বিক্রি করেন তারা অপেক্ষা করছেন পরিস্থিতি বোঝার জন্য।
প্রাণিসম্পদ অফিসে সূত্র জানায়, গত বছর  ছোটবড় মিলিয়ে প্রায় ৪৫  হাজার গরু পালন হয়েছিল। খামারিরা ভালোই লাভ পেয়েছিলেন। এবার জেলায় প্রায় এক লাখের কাছাকাছি গরু পালন করছেন খামারিরা। গতবারের তুলনায় এবার গরুর সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার বেশি।
পটিয়া উপজেলার খরনা ইউনিয়নের ফকির পাড়া গ্রামের খামারি আব্দুল লতিফ জানান, গত বছর গরু বিক্রি করে মোটামুটি লাভ হয়েছিল। তাই এবারও গরু পালছি। করোনার কারণে এবার লাভতো দূরে থাক আসল দাম তুলতে পারলেই আল্লাহর কাছে শুকরিয়া। গো-খাদ্যের যে দাম বেড়েছে তাতে এবার লোকসান হবে বলে মনে হচ্ছে। অন্য বছর আগেই ব্যাপারীরা বাড়ির ওপর আসতো। এবার কেউ আসছে না। দু’একজন আসলেও দাম বলছেন অনেক কম।
উপজেলার হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নের খামার মালিক সোহেল রানা বলেন, গত বছর সাত লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। এতো টাকা বিনিয়োগ করে যদি ভালো দাম না পাই তাহলে দুঃখের সীমা থাকবে না। করোনার কারণে গরু বাজারে নিয়ে বিক্রি করা এবার কঠিন হবে। তাই বাড়ির ওপর থেকে বা স্থানীয়ভাবে কম লাভ হলেও গরু ছেড়ে দেবেন বলে জানান। তার খামারে ৫টির মত বড় গরু রয়েছে।
 উপজেলায় কয়েকটি  বড় গরুর হাট বসে। করোনা পরিস্থিতির মধ্যে হাটগুলো বসবে কিনা তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় খামারীরা।  গতবারের তুলনায় গরু বেশি হওয়ায় খামারীরা মুনাফার কথা বাদ দিয়ে আসল তুলতে পারবে কি না তা নিয়ে খুব চিন্তায় আছে। বিশেষ করে বড় গরুর চাহিদা এবার নেই বললেই চলে।
তিনি বলেন, অন্যান্য বছর আমরা চাহিদা মত গরু আগে থেকে কিনে রাখতাম। এবার গরু কিনছি না। দু-একজন আছেন যারা কিছু অর্ডারের গরু কিনছেন। চট্টগ্রামের অনেক ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ আছেন যারা আগেই গরু কিনে রাখতেন। এবার তারাও খুব একটা অর্ডার দিচ্ছেন না। গত বছরের তুলনায় এবার চাহিদা অনেক কম।
আজাহার আলী নামে এক গরু ব্যবসায়ী বলেন, গরুর বাজার কম। কোরবানির আগে দাম বাড়বে বলে মনে হয় না। মানুষের হাতে টাকা নেই। তাই কোরবানির সংখ্যা এবার কম হবে। বেশির ভাগ প্রান্তিক খামারি এবার লোকসানে পড়বেন। অনেকেই গরু বিক্রি করতে পারবেন না। যারা বিক্রি করতে পারবেন তারাও লাভ পাবেন কম।
পটিয়া উপজেলার হাইদগাও ইউনিয়নের গুচ্ছ গ্রামের বড় খামার মালিক হেলাল উদ্দীন। তার খামারটির অবস্থান পাহাড়ি এলাকা গিরে। সমন্বিত এ খামারে এবার তার ৩৫টি গরু রয়েছে। তবে এবার গরু বিক্রি নিয়ে তার দুশ্চিন্তা বাড়ছে।
 উপজেলার আরেক বড় খামারি শরিফ হোসেন। তার খামারে ছোট বড় মিলিয়ে ৬০টি গরু রয়েছে। এ গরুর অর্ধেক বিক্রি করা নিয়ে তার দুশ্চিন্তা। লাভ নিয়ে ভাবছেন না। গরু বিক্রি করতে পারলেই তিনি খুশি। কারণ খামারে গরু থেকে গেলে প্রতিদিন তার পেছনে ব্যয় আছে। তাতে লোকসান আরও বাড়বে। তাই খামার খালি করা নিয়েই ভাবছেন তিনি।
খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিবার ঈদের দু-এক মাস আগে থেকেই জেলার হাটে হাটে ঘুরে ব্যাপারীরা গরু কিনে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন হাটে তুলতেন। এবার সেই সংখ্যা অনেক কম। উপজেলার বড় পশুর হাট রয়েছে ৬টি। এসব হাট ছাড়াও প্রত্যন্ত অঞ্চলে আরও ছোট ছোট হাট-বাজারে বিক্রির জন্য প্রতিদিন হাজার হাজার গরু-ছাগল নিয়ে আসছেন খামারিরা। কিন্ত কেনাবেচা একদম কম। ঈদুল আজহার আর মাত্র ১০-১৫ দিন বাকি থাকলেও এবার বাইরের ব্যাপারীদের তেমন একটা দেখা মিলছে না।
পটিয়া প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. জপু চক্রবর্তী বলেন, উপজেলায় এবার প্রচুর গরু পালন করেছেন খামারিরা। তবে ঈদ এগিয়ে আসায় তাদের দুশ্চিন্তা বেড়েছে। করোনা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় খামার মালিকরা চট্টগ্রামের বাজারে গরু নিয়ে লাভ করতেন। তারা এবার ক্ষতির মুখে পড়ে যেতে পারেন। কারণ জীবন আগে পরে জীবিকা। এই অবস্থায় দেশের সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে গরুর বাজার। স্থানীয় বাজারে কেনাবেচা হলেও বাইরে থেকে ব্যাপারীরা এবার আসছেন না দেখে চিন্তা বেড়েছে খামারিদের।
তিনি বলেন, আমরা খামারিদের মনোবল বাড়াতে কাজ করছি।
বিজনেস বাংলাদেশ / ইমরান মাসুদ