যুগে যুগে যখনই কোন জাতী অত্যাচারী দ্বারা নির্যাতীত, নিপীড়িত, দলিত হতে হতে চূড়ান্তে উপনীত হয় তখনই সে জাতীতে আবির্ভাব ঘটে চেইঞ্জ মেকারের। যিনি এসে পালটে দেন পুরো সিস্টেম, সৃষ্টি করেন মানুষের মুক্তির পথ। এমন অনেক মহান মনীষী দেখেছে এই পৃথিবী; চীনে মাওসেতুং,তুরস্কে কামাল আতাতুর্ক,কিউবায় চে গুয়েভারা, ভারতে মহাত্মা গান্ধী,বাংলাদেশে শেখ মুজিবুর রহমান।
তেমনি এমনি এক মহামানুষের জন্ম হয়েছিল বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে। যার সারাটি জীবন কেটেছে বর্ণপ্রথার বিরুদ্ধে আর সাম্যতার পক্ষে সংগ্রাম করে। যার জীবনের ২৭ টি বসন্ত কেটেছে নির্জন দ্বীপের মধ্যে মাত্র ৬ ফুট চওড়া কয়েদখানায়,তিনি হলেন সাম্য ও ন্যায়ের মূর্ত প্রতীক দক্ষিণ আফ্রিকার মহান নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা। নিষ্পেষিত একটি জাতিকে তিনি নতুন জীবন উপহার দিয়েছিলেন। মহান এই মানুষটির জন্ম দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনের কুনু নামক গ্রামের এক অভিজাত পরিবারে।
বাবা এমফাকানিসওয়া হেনরি ছিলেন বান্টু নৃ-গোষ্টির গ্রাম্য প্রধান। সেই সুবাদে তার পড়াশুনার সুযোগ হয়েছিল। তিনি পরিবারের প্রথম ব্যাক্তি হিসেবে পড়াশুনা শুরু করেন। এর আগে তার পরিবারের কেউ শিক্ষিত ছিল না। স্থানীয় একটি মিশনারি থেকে তার শিক্ষা যাত্রা শুরু হয়। স্কুলের প্রথম দিনই তার শিক্ষিকা তার আসল নাম এলসন রোলিহলাহলা পরিবর্তন করে নেলসন ম্যান্ডেলা রাখেন। স্কুলগুলোতে তখন এই রীতির প্রচলন ছিল। তখন দক্ষিণ আফ্রিকায় বৃটিশ উপনৈবসিক শাসন চলে।
সেই হিসেবে তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত শেতাঙ্গ সরকার তাদের অনুরাগবাজন হওয়ারই কথা। ছোট থেকেই তিনি পড়াশোনায় মনোযোগী ছিলেন।একসময় তিনি স্কুল,কলেজ জীবন শেষ করে ১৯৩৯ সালে আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য সবচেয়ে নামী প্রতিষ্ঠান ফোর্ট হেয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। মেধাবী ও নেতৃত্বের অধিকারী নেলসন ম্যান্ডেলা দ্বিতীয় বর্ষে ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচিত হন।
সেখানকার হোস্টেলের খাবারের নিম্নমানের কারনে ছাত্রদের নিয়ে প্রতিবাদ করায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাঁর ছাত্রত্ব বাতিল করে দেয়। হতোদ্যম মেন্ডেলা তারপর চলে যান জোহানসবার্গে। সেখানে গিয়ে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যচলর অব আর্টসে ভর্তি হন। এবং একটি খনির প্রহরী কর্মকর্তা হিসেবে চাকরী নেন। যাইহোক, পরবর্রতীতে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ ডিগ্রী সম্পন্ন করতে পেরেছিলেন।
জোহেনসবার্গে এসে তিনি শেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ দাঙ্গামা পরিলক্ষিত করেন। যা তার মনে চরমভাবে রেখাপাত করে। মাত্র আঠারো লক্ষ শেতাঙ্গের কাছে এক কোটিরও বেশি কৃষ্ণাঙ্গের প্রায় জিম্মি অবস্থায় জীবন যাপন করতে হতো। তাদের ভোটাধিকারের উপর নানান বাধ্যবাধকতা জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। নিজ দেশেও ভিনদেশীদের মত জীবনযাপন করতে হতো। এসব দেখে তার মন বিচলিত হয়ে উঠে।
দক্ষিণ আফ্রিকাতে তখন সংহতি,বর্ণ বৈষম্যমুক্ত,গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ‘আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস’ নামে একটি রাজনৈতিক দল সক্রিয়। মুক্তিকামী মেন্ডেলা কালক্ষেপন না করে তার রাজনৈতিক সহযোগী ও বন্ধু অলিভার টম্বোর পরামর্শে এএনসিতে (আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস) যোগদান করেন। এ সংগঠনকে সাজাঁতে থাকেন নতুন করে।
নতুন করে এ সংঘঠনে তরুণদের জন্য ইয়ুথ সংগঠন গঠন করেন। গড়ে তুলেন দুর্বার আন্দোলন। ১৯৪৮ সালে উগ্রবাদী শেতাঙ্গ সরকার নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে, এ সরকার বেপরোয়া হয়ে উঠে। বর্ণবাদ আইন পাশ করে চাকরি-বাকরি,রাজনীতি সবকিছুতে কৃষ্ণাঙ্গদের দূরে ঠেলে দেয়া হয়।শতকরা ৮৭ ভাগ জমি ছিল শেতাঙ্গদের দখলে।
মাত্র ১৩ ভাগ জমি নিয়ে অতিকষ্টে জীবন অতিবাহিত করতে হতো কৃষ্ণাঙ্গদের। বিপর্যস্ত কৃষ্ণাঙ্গরা মুক্তির আশার ব্যাকুল হয়ে উঠতে থাকে। ক্রমেই এএনসি জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে। ১৯৫২ সালে গান্ধীবাদী মেন্ডেলা তার সহযোগিদের নিয়ে সরকারের ঘৃণিত নীতির বিরুদ্ধে পুরো দেশে অসহযোগ আন্দোলন গড়ে তুলেন। তিনি হয়ে উঠতে থাকেন আফ্রিকার আমজনতার মাদিবা(জাতির পিতা)।
১৯৬০ সালে ২০হাজার কৃষ্ণাঙ্গের শান্তিপূর্ন মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়। যাকে ইতিহাসে গণহত্যা বলা হয়। সেদিনের গুলিতে ৬৯জন নিহত ও ১৮০ জন আহত হয়। পরপরই এএনসি দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। মেন্ডেলা তখন সশস্ত্র আন্দোলনের পথ বেছে নেয়,গঠন করেন উমখোতো উই সুজুয়ে নামক সশস্ত্র সংগঠন। সরকারের নানান জায়গায় হামলা করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে থাকে।
সরকারে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ১৯৬২ সালে শ্রমিক ধর্মঘটে উস্কানি ও রাজদ্রোহের অপরাধে সাব্যস্ত করে ৫ বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়। এর দু-বছর পর ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দের ১১ জুন ম্যান্ডেলার বিরুদ্ধে এএনসি-র সশস্ত্র সংগ্রামে নেতৃত্বদানের অভিযোগ আনা হয়। এবং সহযোগী ১৮জনসহ তাকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়া হয়। তার মামলা চলাকালে তার আন্দোলনের পক্ষে একটি বিবৃতিতে বলেছিল“আমি সাদা আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি, এবং কালো আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। আমি একটি গণতান্ত্রিক ও মুক্ত সমাজের আদর্শকে লালন করেছি যেখানে সমস্ত ব্যক্তি মিলেমিশে এবং সমান সুযোগের সাথে একসাথে বাস করে। এটি এমন একটি আদর্শ যা আমি বেঁচে থাকার এবং অর্জনের আশা করি। তবে যদি প্রয়োজন হয় তবে এটি একটি আদর্শ, যার জন্য আমি মরতে প্রস্তুত “।
তাদের জেল হয়েছিল কেপটাউন সমুদ্র সৈকত থেকে সাত কিলোমিটার দূরে দুই বর্গ মাইলের ডেড আইল্যান্ড খ্যাত রোবেন দ্বীপে। শত শত বছর ধরে এ দ্বীপে রাজবন্দীদের নির্বাসন দেয়া হতো, খুব কম মানুষই এখান থেকে ফিরে আসতে পেরেছে। কারাগারে থাকার সময়ে তিনি মুহুর্তের জন্যও আশাহত হননি। কারাগারের দিনগুলোতে তিনি ও তার সহযোগীরা গোপনে শেকসপিয়ার পড়ে অনুপ্রেরণা নিতেন। সেখানে বসেই তিনি লিখেছিলেন বিখ্যাত ‘লং ওয়াক টু ফ্রিডম’ বইটি।
অপরদিকে তার দল এএনসি ও দ্বিতীয় স্রী উইনি দেশ-বিদেশে জনমত এবং দেশের অভ্যন্তরে ব্যাপক আন্দোলন শুরু করে। শেতাঙ্গ সরকারের উপর আন্তর্জাতিক চাপ আসতে থাকে। সরকার কোণঠাসা হয়ে পড়ে।বাধ্য হয়ে ১৯৯০ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি তাকে মুক্তিসহ আফ্রিকান ন্যাশনাল জাতীয় কংগ্রেসকে পুনরায় বৈধতা দান করে।
পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালে তার নেতৃত্বে এএনসি জয় লাভ করে। জয় হয় সাম্যের, সমাপ্তি ঘটে দক্ষিণ আফ্রিকার কালো ইতিহাসের। একটি জাতীকে বিনির্মাণ করে অবশেষে মহান এই মানুষটি ২০১৩ সালের ৫ই ডিসেম্বর না ফেরার পথে গমন করেন।
গত বছরের অক্টোবরে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন মুভমেন্ট(ন্যাম) এবং জাতিসংঘ ২০১৯ থেকে ২০২৮ সালকে ‘ম্যান্ডেলা শান্তির দশক’ হিসেবে ঘোষণা করেন। আজ এই মনীষীর ১০৩তম জন্মদিন । জাতিসংঘ একে বিশ্ব ম্যান্ডেলা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দান করেছে। প্রতিবছর পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ দিনটিকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ ও উদযাপন করে। পৃথিবীর শান্তিকামী মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা আর শাসক শ্রেণির জন্য আদর্শ হয়ে বেচেঁ থাকবেন অনন্তকাল। দক্ষিণ আফ্রিকার জনগোষ্ঠী তাঁকে আজীবন শ্রদ্ধার সাথে মনে রাখবে।
লেখক- নুরুদ্দীন আহমেদ, শিক্ষার্থী, লোক প্রশাসন বিভাগ,কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।
বিজনেস বাংলাদেশ / আতিক


























