বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সহায়তায় করোনা মহামারির ধাক্কা থেকে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি রক্ষা পেয়েছে ব্যাংক খাত। করোনার অর্থনৈতিক অভিঘাত থেকে দেশের ব্যবসায়ীদের বাঁচাতে গত বছরজুড়েই বিশেষ সুবিধা দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণ পরিশোধ না করলেও কোন ব্যবসায়ী খেলাপির তালিকাভূক্ত হয়নি। এতে ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে যেতে পেরেছেন। অন্যদিকে ব্যাংকগুলো বেঁচে গিয়েছে বিপুল খেলাপির চাপ থেকে। কারণ, করোনায় সারা বিশ্বের পাশাপাশি বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল খাত বাদে সকল খাতের ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধের বাধ্যবাধকতা শিথিল না করলে অধিকাংশ ঋণগ্রহীতা খেলাপি হয়ে পড়তেন। এতে ব্যাংকগুলোর ওপর বিশাল খেলাপির বোঝা চাপতো। এর প্রভাব পড়তো ব্যাংকের মুনাফায়। কারণ খেলাপি ঋণের বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে একশ ভাগ পর্যন্ত প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হতো ব্যাংকগুলোকে। এতে ব্যাংকগুলোর মুনাফায় বিশাল ধস নামতো।
এই সুবিধার পরও ব্যাংকগুলো লোকসানে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি সিদ্ধান্তে। ব্যাংকগুলোর অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করার স্বার্থেই সিদ্ধান্তটি নিতে যাচ্ছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু ওই সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়িত হলে অধিকাংশ ব্যাংক লোকসানে চলে যেত এবং ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভরশীল দেশের শেয়ারবাজারে বড় ধস নামার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই প্রক্রিয়াধীন সিদ্ধান্তটি ছিল, ব্যাংকগুলোকে সকল ঋণের ওপর ১ শতাংশ বাড়তি প্রশিভন সংরক্ষণ। অর্থাৎ, নিয়মিত প্রভিশনের বাইরেও বাড়তি ওই প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হতো ব্যাংকগুলোকে। বিষয়টি প্রকাশ হলে বিভিন্ন সুবিধাভোগী মহল থেকে নৈতিক চাপ আসে। সার্বিক অর্থনীতির স্বার্থে এই বিষয়ে মত পরিবর্তন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। শুধু যেসব ঋণ ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদে আদায় হয়নি শুধু সেই ঋণগুলোর ওপরে ১ শতাংশ হারে বাড়তি নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখার নির্দেশ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই সিদ্ধান্ত জানিয়ে ব্যাংকারদের শীর্ষ সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ বা এবিবি’কে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই সিদ্ধান্তকে ব্যাংক খাতের জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন জ্যেষ্ঠ ব্যাংকাররা।
এবিবি’র সাবেক চেয়ারম্যান এবং মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বিজনেস বাংলাদেশ’কে বলেন, সকল ঋণের ওপর ১ শতাংশ প্রভিশন রাখলে ব্যাংকগুলোর জন্য অবিচার হয়ে যেত। কারণ যে ঋণগুলোর কিস্তি বকেয়া হয়নি সেসব ঋণের ওপরও বাড়তি প্রভিশন রাখতে হলে ব্যাংকগুলো চাপে পড়তো। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটা ব্যাংকগুলোর জন্য ভাল হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত ব্যাংকের মুনাফার জন্য সহায়ক হয়েছে যা দেশের পুঁজিবাজারেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
ব্যাংকগুলো বছরে যে পরিমাণ পরিচালন মুনাফা করে তার ওপর পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোকে সাড়ে ৩৭ শতাংশ এবং তালিকাবহির্ভূত ব্যাংকগুলোকে ৪০ শতাংশ হারে করপোরেট ট্যাক্স পরিশোধ করতে হয়। এরপর ব্যাংকগুলোর যে পরিমাণ খেলাপি ঋণ থাকে তার ধরনভেদে ২০ শতাংশ থেকে শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। এছাড়া সব ঋণের ওপর ১ থেকে ৫ শতাংশ হারে সাধারণ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। মূলত ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। প্রভিশন সংরক্ষণের পর ব্যাংকগুলোর রিজার্ভ তহবিলে প্রয়োজনীয় মূলধন সংরক্ষণ করার পর যেটুকু অবশিষ্ট থাকে, সেটাই ব্যাংকের প্রকৃত মুনাফা বা নিট প্রফিট। প্রকৃত মুনাফার একটি অংশ শেয়ারহোল্ডারদের মাঝে বণ্টন করা হয়। বাকি অংশ রিটেইন আর্নিং হিসাবে ব্যাংক সংরক্ষণ করে।
ঋণ নিয়মিত থাকলে শুধু জেনারেল প্রভিশন ১ শতাংশ সংরক্ষণ করতে হয়। আর খেলাপি হলে নীতিমালা অনুযায়ী খেলাপির ধরনভেদে শতভাগ পর্যন্ত প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়।
গত ২৮ সেপ্টেম্বর ব্যাংকগুলোর জন্য এক নির্দেশনা প্রদান করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ওই নির্দেশনায় বলা হয়, গত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণের কোনো কিস্তি পরিশোধ না হলেও তা খেলাপি বিবেচিত হবে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন নির্দেশনায় ব্যাংকের ঋণ আদায় কার্যক্রম অস্বাভাবিক হারে কমে যায়। ঋণ আদায় না হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ঋণ নিয়মিত থেকে যায়। আর নিয়মিত ঋণ থাকলে বাড়তি প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে না। এর ফলে ঋণ আদায় না হয়েও বাড়তি প্রভিশন সংরক্ষণ না করায় ব্যাংকের কৃত্রিম মুনাফা বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়। কৃত্রিম মুনাফা কমাতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে গত ১০ ডিসেম্বর নতুন করে এক সার্কুলার জারি করে। অনাদায়ী ঋণের সুদ ব্যাংকগুলো যাতে আয় খাতে নিতে না পারে সে জন্য বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় বালা হয়, ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ থেকে অর্জিত সুদ আয় খাতে নিতে হলে ৩১ ডিসেম্বর ভিত্তিক ব্যাংকের হিসাব চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে অনাদায়ী ঋণ (এসএমএ) বা বিনিয়োগসহ সব অশ্রেণীকৃত বিনিয়োগের বিপরীতে ১ শতাংশ অতিরিক্ত জেনারেল প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে। এ নির্দেশনাই পরিপালন করতে ব্যাংকগুলোর বিপত্তি বাঁধে। সব অশ্রেণীকৃত ঋণের ওপর ১ শতাংশ জেনারেল প্রভিশন সংরক্ষণ করতে ব্যাংকগুলোর মুনাফা থেকে বাড়তি অর্থ সংরক্ষণ করতে হবে। এতে আয় আরো কমে যাবে। এমনি পরিস্থিতিতে ব্যাংকাররা এ বিষয়ে বিবেচনা করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আবেদন করেন। ব্যাংকারদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এবিবি’কে চিঠি দিয়ে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, শুধু যারা গত বছর ঋণের কিস্তি পরিশোধ করেননি কেবল ওইসব ঋণের ওপর বাড়তি এক শতাংশ জেনারেল প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে। অন্য কোনো ঋণের ওপর অতিরিক্ত এক শতাংশ জেনারেল প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বের সিদ্ধান্ত বহাল থাকলে ব্যাংকগুলোকে ৯ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা অতিরিক্ত সঞ্চিতি রাখতে হতো। এতে অধিকাংশ ব্যাংক লোকসানে চলে যেত বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স এ্যাসোসিয়েশন।
বিজনেস বাংলাদেশ/ এ আর
























