০২:১৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬

কম্বাইন হার্ভেস্টারে ইব্রাহীমের জীবন বদলানোর স্বপ্ন

পঞ্চাশোর্ধ মো. ইব্রাহিম গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার পৌর এলাকার বালীগাঁও গ্রামের বাসিন্দা। আগাগোড়া একজন কৃষি প্রেমিক মানুষ। কৃষি এবং কৃষককে নিয়ে তিনি প্রায় সময়ই ভাবেন। তাই সব সময় দেশের কৃষিতে অবদান রাখার একটা আগ্রহ তার মধ্যে বিদ্যমান।

এক সময় শিক্ষকতা করতেন জেলার বিদ্যাময়ী ক্যাডেট একাডেমিতে। এছাড়াও তিনি একজন ঠিকা ভূমি সার্ভেয়ার প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। এজন্য তাকে বেশির ভাগ সময় কুমিল্লার ময়নামতি ভূমি ট্রেনিং সেন্টারে যেতে হয় প্রশিক্ষক হয়ে। এখন করোনাকাল তাই আপাতত বন্ধ আছে।

এক সময় নিজের কৃষি জমি থাকলেও বর্তমানে খুব একটা কৃষি জমি নেই। স্থানীয়ভাবে শিল্পান্নোয়নের স্বার্থে কারখানার কাছে কৃষি জমি বিক্রি করে দিতে হয়েছে। সে কারখানায় বর্তমানের স্থানীয় হাজার হাজার লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। তবে বর্তমানে তার যেটুকু কৃষি জমি আছে বয়সের কারণে সেটুকুও চাষাবাদ করতে পারেননা। তবে এক সময় তিনি নিজে গরু-লাঙ্গল-জোয়াল দিয়ে খেত-খামারে কাজ করেছেন।

১ মেয়ে ও ৩ ছেলে সন্তানের জনক তিনি। স্ত্রী-সন্তান, নাতি-নাতনি সবমিলিয়ে পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৮ জন। ছোট-খাটো ব্যবসা বানিজ্য আছে যা ছেলেরাই দেখাশোনা করেন। কিন্তু বয়স হয়েছে বলে কৃষি এবং কৃষককে নিয়ে ভাবনার মানুষটি বসে থাকতে নারাজ। কোন না কোনভাবেই স্থানীয় কৃষিতে তিনি অবদান রাখতে চান। যা দেশের কৃষিতেও প্রভাব পড়বে বলে তিনি মনে করেন।

দেশে প্রতি বছর ধান কাটার মৌসুমে শ্রমিক সংকটে ভোগেন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে স্থানীয় কৃষির সাথে জড়িত কৃষক সমাজ। তবে সঠিক সময়ে ধান কাটতে, মারাতে ও ঝারতে না পারলে নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বড় ধরণের ক্ষতির সম্মুখিন হতে হয় কৃষকদের। এছাড়াও দেশে এখন চলছে কঠোর লকডাউন। যে কারণে পাবলিক পরিবহন বন্ধ। দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে ধান কাটার যে শ্রমিকগুলো আসতো তারা এই সময়টাতে আসতে পারছেন না। ফলে স্থানীয় কৃষকদের এই ধান কাটা, মারাই ও ঝারাতে পড়তে হচ্ছে নানা সমস্যায়। বিষয়গুলো খুব কাছ থেকেই দেখেছেন ইব্রাহীম।

তাই সব সময় চিন্তা করতেন নিজে যেহেতু কৃষি কাজ করেন না। সেক্ষেত্রে কিভাবে দেশের এই গুরুগ¦পূর্ণ সেক্টরটিতে অবদান রাখা যায়। এ চিন্তা থেকে তিনি স্থানীয় কৃষি অফিসে যোগাযোগ করেন। আর কৃষি অফিসের পরামর্শে তিনি একটি কম্পাইন হারভাস্টার মেশিনের জন্য আবেদন করেন। কৃষি বিভাগ তার আবেদনটি আমলে নিয়ে তাকে একটি হারভাস্টার মেশিন প্রদান করেন। আর এর জন্য ৫০% ভর্তুকি সরকারকে দিতে হয়েছে। ৩০ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা মূল্যের ধান কাটার, মারাই ও ঝারার এই কম্পাইন হারভাস্টার মেশিনের জন্য তাকে গুনতে হয়েছে মূল্যের অর্ধেক টাকা। লাভ ক্ষতি পরের বিষয় তিনি কৃষি এবং কৃষকের জন্য এখানে বিনিয়োগ করেছেন। কম খরচে এখন থেকে কৃষক তার ধান ঘরে তুলতে পারবেন। স্থানীয় কৃষকদের এখন আর খুব বেশি চিন্তা করতে হবে না কাটা, মারাই ও ঝারা নিয়ে। ইব্রাহীম এ ভাবেই মঙ্গলবার (২০ এপ্রিল) দুপুরে উপজেলা কৃষি অফিসে বসে অবলিলায় কথাগুলো বললেন।

এর আগে তাকে সকালে উপজেলা পরিষদ চত্ত্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে কম্পাইন হারভাস্টার মেশিনের একটি প্রতিকী চাবি তুলে দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকতা মো. শিবলী সাদিক। এ সময় উপজেলা সহকারী কমিশনা (ভূমি) শাহিনা আক্তার, কালীগঞ্জ পৌরসভার নব নির্বাচিত মেয়র এস.এম রবীন হোসেন, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফারজানা তাসলিম, উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম, মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নূর-ই-জান্নাত, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শাহানাজ আক্তারসহ উপ সহকারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

কৃষি কর্মকর্তা ফারজানা তাসলিম জানান, একটি কম্পাইন হারভাস্টার মেশিনে ১ ঘন্টায় ৩ বিঘা (১ একর) জমির ধান কাটতে পারে। যা হিসেব করলে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা আয় হয়। আর এই হারভাস্টার মেশিনের কৃষকের অনেক সময় এবং অর্থ অপচয় কম হবে। কেননা এক বিঘা জমিতে একজন কৃষকের ধান কাটতে ৪/৫ শ্রমিক লাগে।

তিনি আরো জানান, অনেক সময় দুর্যোগের কারণে ধান মাটিতে শুয়ে পড়ে, কিন্তু এই মেশিন ধারা শুয়ে পড়া ধানও কাটা সম্ভব। এছাড়া ১০ ইঞ্চি কাঁদামাটি থেকে এই কম্পাইন হারভাস্টার মেশিনের মাধ্যমে ধান কাটা যায়। মেশিনের ভিতরে আলাদা দুটি চেম্বার রয়েছে যে কারণে ধান মারাইয়ের সময় সলিট এবং চিটা আলাদা হয়ে যাবে। মেশিনের ট্রেঙ্কিতে ২৫ মণ ধান ধরে রাখা যায়। যেখান থেকে কৃষক খুব সহজেই ধান বস্তা বন্দি করে ঘরে তুলতে পারেন।

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

২১ জানুয়ারি থেকে মার্কিন ভিসার জন্য অনুমোদিত হলে ভিসা বন্ড দিতে হবে

কম্বাইন হার্ভেস্টারে ইব্রাহীমের জীবন বদলানোর স্বপ্ন

প্রকাশিত : ১২:০১:২৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ এপ্রিল ২০২১

পঞ্চাশোর্ধ মো. ইব্রাহিম গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার পৌর এলাকার বালীগাঁও গ্রামের বাসিন্দা। আগাগোড়া একজন কৃষি প্রেমিক মানুষ। কৃষি এবং কৃষককে নিয়ে তিনি প্রায় সময়ই ভাবেন। তাই সব সময় দেশের কৃষিতে অবদান রাখার একটা আগ্রহ তার মধ্যে বিদ্যমান।

এক সময় শিক্ষকতা করতেন জেলার বিদ্যাময়ী ক্যাডেট একাডেমিতে। এছাড়াও তিনি একজন ঠিকা ভূমি সার্ভেয়ার প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। এজন্য তাকে বেশির ভাগ সময় কুমিল্লার ময়নামতি ভূমি ট্রেনিং সেন্টারে যেতে হয় প্রশিক্ষক হয়ে। এখন করোনাকাল তাই আপাতত বন্ধ আছে।

এক সময় নিজের কৃষি জমি থাকলেও বর্তমানে খুব একটা কৃষি জমি নেই। স্থানীয়ভাবে শিল্পান্নোয়নের স্বার্থে কারখানার কাছে কৃষি জমি বিক্রি করে দিতে হয়েছে। সে কারখানায় বর্তমানের স্থানীয় হাজার হাজার লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। তবে বর্তমানে তার যেটুকু কৃষি জমি আছে বয়সের কারণে সেটুকুও চাষাবাদ করতে পারেননা। তবে এক সময় তিনি নিজে গরু-লাঙ্গল-জোয়াল দিয়ে খেত-খামারে কাজ করেছেন।

১ মেয়ে ও ৩ ছেলে সন্তানের জনক তিনি। স্ত্রী-সন্তান, নাতি-নাতনি সবমিলিয়ে পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৮ জন। ছোট-খাটো ব্যবসা বানিজ্য আছে যা ছেলেরাই দেখাশোনা করেন। কিন্তু বয়স হয়েছে বলে কৃষি এবং কৃষককে নিয়ে ভাবনার মানুষটি বসে থাকতে নারাজ। কোন না কোনভাবেই স্থানীয় কৃষিতে তিনি অবদান রাখতে চান। যা দেশের কৃষিতেও প্রভাব পড়বে বলে তিনি মনে করেন।

দেশে প্রতি বছর ধান কাটার মৌসুমে শ্রমিক সংকটে ভোগেন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে স্থানীয় কৃষির সাথে জড়িত কৃষক সমাজ। তবে সঠিক সময়ে ধান কাটতে, মারাতে ও ঝারতে না পারলে নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বড় ধরণের ক্ষতির সম্মুখিন হতে হয় কৃষকদের। এছাড়াও দেশে এখন চলছে কঠোর লকডাউন। যে কারণে পাবলিক পরিবহন বন্ধ। দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে ধান কাটার যে শ্রমিকগুলো আসতো তারা এই সময়টাতে আসতে পারছেন না। ফলে স্থানীয় কৃষকদের এই ধান কাটা, মারাই ও ঝারাতে পড়তে হচ্ছে নানা সমস্যায়। বিষয়গুলো খুব কাছ থেকেই দেখেছেন ইব্রাহীম।

তাই সব সময় চিন্তা করতেন নিজে যেহেতু কৃষি কাজ করেন না। সেক্ষেত্রে কিভাবে দেশের এই গুরুগ¦পূর্ণ সেক্টরটিতে অবদান রাখা যায়। এ চিন্তা থেকে তিনি স্থানীয় কৃষি অফিসে যোগাযোগ করেন। আর কৃষি অফিসের পরামর্শে তিনি একটি কম্পাইন হারভাস্টার মেশিনের জন্য আবেদন করেন। কৃষি বিভাগ তার আবেদনটি আমলে নিয়ে তাকে একটি হারভাস্টার মেশিন প্রদান করেন। আর এর জন্য ৫০% ভর্তুকি সরকারকে দিতে হয়েছে। ৩০ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা মূল্যের ধান কাটার, মারাই ও ঝারার এই কম্পাইন হারভাস্টার মেশিনের জন্য তাকে গুনতে হয়েছে মূল্যের অর্ধেক টাকা। লাভ ক্ষতি পরের বিষয় তিনি কৃষি এবং কৃষকের জন্য এখানে বিনিয়োগ করেছেন। কম খরচে এখন থেকে কৃষক তার ধান ঘরে তুলতে পারবেন। স্থানীয় কৃষকদের এখন আর খুব বেশি চিন্তা করতে হবে না কাটা, মারাই ও ঝারা নিয়ে। ইব্রাহীম এ ভাবেই মঙ্গলবার (২০ এপ্রিল) দুপুরে উপজেলা কৃষি অফিসে বসে অবলিলায় কথাগুলো বললেন।

এর আগে তাকে সকালে উপজেলা পরিষদ চত্ত্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে কম্পাইন হারভাস্টার মেশিনের একটি প্রতিকী চাবি তুলে দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকতা মো. শিবলী সাদিক। এ সময় উপজেলা সহকারী কমিশনা (ভূমি) শাহিনা আক্তার, কালীগঞ্জ পৌরসভার নব নির্বাচিত মেয়র এস.এম রবীন হোসেন, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফারজানা তাসলিম, উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম, মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নূর-ই-জান্নাত, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শাহানাজ আক্তারসহ উপ সহকারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

কৃষি কর্মকর্তা ফারজানা তাসলিম জানান, একটি কম্পাইন হারভাস্টার মেশিনে ১ ঘন্টায় ৩ বিঘা (১ একর) জমির ধান কাটতে পারে। যা হিসেব করলে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা আয় হয়। আর এই হারভাস্টার মেশিনের কৃষকের অনেক সময় এবং অর্থ অপচয় কম হবে। কেননা এক বিঘা জমিতে একজন কৃষকের ধান কাটতে ৪/৫ শ্রমিক লাগে।

তিনি আরো জানান, অনেক সময় দুর্যোগের কারণে ধান মাটিতে শুয়ে পড়ে, কিন্তু এই মেশিন ধারা শুয়ে পড়া ধানও কাটা সম্ভব। এছাড়া ১০ ইঞ্চি কাঁদামাটি থেকে এই কম্পাইন হারভাস্টার মেশিনের মাধ্যমে ধান কাটা যায়। মেশিনের ভিতরে আলাদা দুটি চেম্বার রয়েছে যে কারণে ধান মারাইয়ের সময় সলিট এবং চিটা আলাদা হয়ে যাবে। মেশিনের ট্রেঙ্কিতে ২৫ মণ ধান ধরে রাখা যায়। যেখান থেকে কৃষক খুব সহজেই ধান বস্তা বন্দি করে ঘরে তুলতে পারেন।