১০:৩২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬

বল টেস্পারিং: সাজা পেলেন স্মিথ

অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটের কালো দিন, বলছেন মাইকেল ক্লার্ক। নেতৃত্বের ব্যাটনটা স্টিভেন স্মিথের হাতে তুলে দিয়ে তিনি ছেড়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট দলের অধিনায়কের পদ। উত্তরসূরির নিন্দনীয় কর্মকাণ্ডে ক্লার্ক লুকাচ্ছেন মুখ। কেপ টাউন টেস্টে বল টেম্পারিং কাণ্ড ভূমিধস ডেকে এনেছে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট দলে। অধিনায়ক ও সহ-অধিনায়কের পদ থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছে স্মিথ ও ডেভিড ওয়ার্নারকে। আইসিসি এক ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করেছে স্টিভেন স্মিথকে, কেটে রাখা হবে কেপ টাউন টেস্টের শতভাগ ম্যাচ ফি। ক্যামেরন ব্যানক্রফটের জরিমানা হয়েছে ম্যাচ ফির ৭৫ শতাংশ, সেই সঙ্গে নামের পাশে যোগ হয়েছে ৩ ডিমেরিট পয়েন্ট।

ঘটনার সূত্রপাত পরশু, টেস্টের তৃতীয় দিনের খেলার মধ্যাহ্ন বিরতিতে। দক্ষিণ আফ্রিকার রান তখন ১ উইকেটে ৬৫, লিড ১২১ রানের। সোজা পথে উইকেট না পাওয়ায় আঙুল বাঁকা করার সিদ্ধান্ত নেয় অস্ট্রেলিয়া দলের লিডারশিপ গ্রুপ। মাত্র অষ্টম টেস্ট খেলতে থাকা ব্যানক্রফটকে কাজে লাগানো হয় বল ঘষামাজা করতে। কিটব্যাগ থেকে হলুদ টেপ নিয়ে তাতে উইকেটের কাছ থেকে কুড়িয়ে নেওয়া কিছু মাটির খণ্ড ঘষে নিয়ে টেপটাকে বারবার বলের গায়ে চেপে চেপে ধরেন। এভাবেই বলের একটা পাশ রুক্ষ করে বলটাকে রিভার্স সুইং করানোর উপযোগী করে দেন ব্যানক্রফট। তাঁর এই কর্মকাণ্ড সবই ধরা পড়েছে টিভি ক্যামেরায়। সেই দৃশ্য মাঠের বড় পর্দায় দেখার পর লেম্যান ব্যানক্রফটকে সতর্ক করতে মাঠে পাঠান পিটার হ্যান্ডসকম্বকে। পকেটে কী আছে আম্পায়াররা সেটা দেখতে চাইলে ব্যানক্রফট দেখিয়েছিলেন সানগ্লাসের খাপ। আম্পায়াররা বলের আকৃতি পরখ করে বদল না করেই খেলা চালিয়ে যান। দিনের খেলা শেষের পর নির্ধারিত সংবাদ সম্মেলনে এসে স্মিথ স্বীকার করেন, তাঁরা বল টেম্পারিং করেছেন। অস্ট্রেলিয়া দলের লিডারশিপ গ্রুপের কথামতোই কাজটা করেছেন ব্যানক্রফট।

রবিবারের সকালটায় ঘুম ভেঙে অস্ট্রেলিয়াবাসী হতভম্ব! ব্যাগি গ্রিন পরা কোনো অধিনায়ক তাঁর কোনো সতীর্থকে এমন নির্দেশ দিতে পারেন, সেটা মেনে নিতে পারেনি দেশবাসী। অধিনায়ক স্মিথের তীব্র সমালোচনা করেন দেশের প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুল, ‘দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আসা দুঃসংবাদটা শুনে আমি অত্যন্ত হতাশ এবং বিস্ময়ে বিমূঢ়। অস্ট্রেলিয়ান দল যে প্রতারণার আশ্রয় নিতে পারে, এটা আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না। আমাদের ক্রিকেটাররা আমাদের রোল মডেল এবং ক্রিকেট খেলাটা ফেয়ার প্লের সমার্থক। কী করে আমাদের ক্রিকেটাররা এ রকম একটা কাজের সঙ্গে নিজেদের জড়াতে পারে? এ তো বিশ্বাস করা কঠিন।’ প্রধানমন্ত্রী টার্নবুল কথা বলেন ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার (সিএ) চেয়ারম্যান ডেভিড পিভারের সঙ্গে। তিনি সাফ জানিয়ে দেন নিজের হতাশা ও উদ্বেগের জায়গাটা। প্রত্যুত্তরে পিভারও জানিয়ে দেন ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার কড়া পদক্ষেপের কথা।

সেই পদক্ষেপটা দ্রুতই নিয়েছে সিএ। টেস্টের মাঝপথেই নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে স্মিথ এবং ওয়ার্নারকে। এখানেই শেষ নয়। কেপ টাউন গেছেন সিএর এক্সিকিউটিভ জেনারেল ম্যানেজার অব টিম পারফরম্যান্স প্যাট হাওয়ার্ড এবং হেড অব ইন্টিগ্রিটি ইয়েইন রয়। পেশায় উকিল রয় জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে শনিবার মধ্যাহ্ন বিরতিতে ঠিক কী হয়েছিল এবং কারা কারা জড়িত ছিল সেটা বের করার চেষ্টা করবেন।

সংবাদ সম্মেলনে স্মিথ এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনে দলের লিডারশিপ গ্রুপের কথা বলেছেন। যদিও অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ক্রিকেটাররা দলে এই রকম কোনো উপদলের অস্তিত্বের কথাই অস্বীকার করে বলছেন, এই লিডারশিপ গ্রুপ আসলে কোচ, অধিনায়ক ও সহ-অধিনায়ক। সাবেক খেলোয়াড় সাইমন ক্যাটিচ মেলবোর্নে একটি রেডিও স্টেশনকে জানিয়েছেন, ‘এই লিডারশিপ গ্রুপটা কী, আমি জানি না। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার হাতে কোচ, অধিনায়ক ও সহ-অধিনায়ককে বরখাস্ত করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। সবাই জানে ক্রিকেটে কোচ আর অধিনায়কের মত ছাড়া কিছু হয় না।’ সিডনি মর্নিং হেরাল্ড জানিয়েছে, অতীতে অধিনায়কের সঙ্গে নানা ব্যাপারে শলাপরামর্শ হতো এমন সব ক্রিকেটার যেমন জশ হ্যাজেলউড, মিচেল স্টার্ক ও নাথান লিয়ন ব্যক্তিগতভাবে জানিয়েছেন তাঁরা এই পরিকল্পনার ব্যাপারে জানতেন না এবং এভাবে তাঁদেরকেও জড়িয়ে ফেলায় নিজেদের বিপন্ন ভাবছেন।

এভাবে পরিকল্পনা করে প্রতারণা করা এবং দলের নবীন সদস্যকে এভাবে প্রতারণার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজে লাগানোয় ব্যবহার করার এই মানসিকতাতেই আঁতকে উঠেছেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ক্রিকেটাররা। অস্ট্রেলিয়ার পেশাদার মনোভাব, অদম্য মানসিকতার সুনাম বিশ্বজুড়ে। এভাবে প্রতারণা করে জেতার চেষ্টা করাটা অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট চেতনার সঙ্গে বেমানান বলেই স্মিথের এই কাণ্ডে চারদিকে ঢিঢি পড়ে গেছে। এসএমএইচ, বিবিসি

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

বল টেস্পারিং: সাজা পেলেন স্মিথ

প্রকাশিত : ০৮:০৮:০৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ মার্চ ২০১৮

অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটের কালো দিন, বলছেন মাইকেল ক্লার্ক। নেতৃত্বের ব্যাটনটা স্টিভেন স্মিথের হাতে তুলে দিয়ে তিনি ছেড়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট দলের অধিনায়কের পদ। উত্তরসূরির নিন্দনীয় কর্মকাণ্ডে ক্লার্ক লুকাচ্ছেন মুখ। কেপ টাউন টেস্টে বল টেম্পারিং কাণ্ড ভূমিধস ডেকে এনেছে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট দলে। অধিনায়ক ও সহ-অধিনায়কের পদ থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছে স্মিথ ও ডেভিড ওয়ার্নারকে। আইসিসি এক ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করেছে স্টিভেন স্মিথকে, কেটে রাখা হবে কেপ টাউন টেস্টের শতভাগ ম্যাচ ফি। ক্যামেরন ব্যানক্রফটের জরিমানা হয়েছে ম্যাচ ফির ৭৫ শতাংশ, সেই সঙ্গে নামের পাশে যোগ হয়েছে ৩ ডিমেরিট পয়েন্ট।

ঘটনার সূত্রপাত পরশু, টেস্টের তৃতীয় দিনের খেলার মধ্যাহ্ন বিরতিতে। দক্ষিণ আফ্রিকার রান তখন ১ উইকেটে ৬৫, লিড ১২১ রানের। সোজা পথে উইকেট না পাওয়ায় আঙুল বাঁকা করার সিদ্ধান্ত নেয় অস্ট্রেলিয়া দলের লিডারশিপ গ্রুপ। মাত্র অষ্টম টেস্ট খেলতে থাকা ব্যানক্রফটকে কাজে লাগানো হয় বল ঘষামাজা করতে। কিটব্যাগ থেকে হলুদ টেপ নিয়ে তাতে উইকেটের কাছ থেকে কুড়িয়ে নেওয়া কিছু মাটির খণ্ড ঘষে নিয়ে টেপটাকে বারবার বলের গায়ে চেপে চেপে ধরেন। এভাবেই বলের একটা পাশ রুক্ষ করে বলটাকে রিভার্স সুইং করানোর উপযোগী করে দেন ব্যানক্রফট। তাঁর এই কর্মকাণ্ড সবই ধরা পড়েছে টিভি ক্যামেরায়। সেই দৃশ্য মাঠের বড় পর্দায় দেখার পর লেম্যান ব্যানক্রফটকে সতর্ক করতে মাঠে পাঠান পিটার হ্যান্ডসকম্বকে। পকেটে কী আছে আম্পায়াররা সেটা দেখতে চাইলে ব্যানক্রফট দেখিয়েছিলেন সানগ্লাসের খাপ। আম্পায়াররা বলের আকৃতি পরখ করে বদল না করেই খেলা চালিয়ে যান। দিনের খেলা শেষের পর নির্ধারিত সংবাদ সম্মেলনে এসে স্মিথ স্বীকার করেন, তাঁরা বল টেম্পারিং করেছেন। অস্ট্রেলিয়া দলের লিডারশিপ গ্রুপের কথামতোই কাজটা করেছেন ব্যানক্রফট।

রবিবারের সকালটায় ঘুম ভেঙে অস্ট্রেলিয়াবাসী হতভম্ব! ব্যাগি গ্রিন পরা কোনো অধিনায়ক তাঁর কোনো সতীর্থকে এমন নির্দেশ দিতে পারেন, সেটা মেনে নিতে পারেনি দেশবাসী। অধিনায়ক স্মিথের তীব্র সমালোচনা করেন দেশের প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুল, ‘দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আসা দুঃসংবাদটা শুনে আমি অত্যন্ত হতাশ এবং বিস্ময়ে বিমূঢ়। অস্ট্রেলিয়ান দল যে প্রতারণার আশ্রয় নিতে পারে, এটা আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না। আমাদের ক্রিকেটাররা আমাদের রোল মডেল এবং ক্রিকেট খেলাটা ফেয়ার প্লের সমার্থক। কী করে আমাদের ক্রিকেটাররা এ রকম একটা কাজের সঙ্গে নিজেদের জড়াতে পারে? এ তো বিশ্বাস করা কঠিন।’ প্রধানমন্ত্রী টার্নবুল কথা বলেন ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার (সিএ) চেয়ারম্যান ডেভিড পিভারের সঙ্গে। তিনি সাফ জানিয়ে দেন নিজের হতাশা ও উদ্বেগের জায়গাটা। প্রত্যুত্তরে পিভারও জানিয়ে দেন ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার কড়া পদক্ষেপের কথা।

সেই পদক্ষেপটা দ্রুতই নিয়েছে সিএ। টেস্টের মাঝপথেই নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে স্মিথ এবং ওয়ার্নারকে। এখানেই শেষ নয়। কেপ টাউন গেছেন সিএর এক্সিকিউটিভ জেনারেল ম্যানেজার অব টিম পারফরম্যান্স প্যাট হাওয়ার্ড এবং হেড অব ইন্টিগ্রিটি ইয়েইন রয়। পেশায় উকিল রয় জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে শনিবার মধ্যাহ্ন বিরতিতে ঠিক কী হয়েছিল এবং কারা কারা জড়িত ছিল সেটা বের করার চেষ্টা করবেন।

সংবাদ সম্মেলনে স্মিথ এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনে দলের লিডারশিপ গ্রুপের কথা বলেছেন। যদিও অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ক্রিকেটাররা দলে এই রকম কোনো উপদলের অস্তিত্বের কথাই অস্বীকার করে বলছেন, এই লিডারশিপ গ্রুপ আসলে কোচ, অধিনায়ক ও সহ-অধিনায়ক। সাবেক খেলোয়াড় সাইমন ক্যাটিচ মেলবোর্নে একটি রেডিও স্টেশনকে জানিয়েছেন, ‘এই লিডারশিপ গ্রুপটা কী, আমি জানি না। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার হাতে কোচ, অধিনায়ক ও সহ-অধিনায়ককে বরখাস্ত করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। সবাই জানে ক্রিকেটে কোচ আর অধিনায়কের মত ছাড়া কিছু হয় না।’ সিডনি মর্নিং হেরাল্ড জানিয়েছে, অতীতে অধিনায়কের সঙ্গে নানা ব্যাপারে শলাপরামর্শ হতো এমন সব ক্রিকেটার যেমন জশ হ্যাজেলউড, মিচেল স্টার্ক ও নাথান লিয়ন ব্যক্তিগতভাবে জানিয়েছেন তাঁরা এই পরিকল্পনার ব্যাপারে জানতেন না এবং এভাবে তাঁদেরকেও জড়িয়ে ফেলায় নিজেদের বিপন্ন ভাবছেন।

এভাবে পরিকল্পনা করে প্রতারণা করা এবং দলের নবীন সদস্যকে এভাবে প্রতারণার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজে লাগানোয় ব্যবহার করার এই মানসিকতাতেই আঁতকে উঠেছেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ক্রিকেটাররা। অস্ট্রেলিয়ার পেশাদার মনোভাব, অদম্য মানসিকতার সুনাম বিশ্বজুড়ে। এভাবে প্রতারণা করে জেতার চেষ্টা করাটা অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট চেতনার সঙ্গে বেমানান বলেই স্মিথের এই কাণ্ডে চারদিকে ঢিঢি পড়ে গেছে। এসএমএইচ, বিবিসি