কালজয়ী অমর একুশে গান “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী আমি কি ভুলিতে পারি” রচয়িতা, কিংবদন্তি সাংবাদিক ও সাহিত্যিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীকে ২৮ মে ২০২২ মিরপুরে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হলো। ১৯ মে তিনি লন্ডনের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর প্রয়ানে আজ কিছু কথা বলতে ইচ্ছা জাগছে। দেশের সব জাতীয় পত্রিকায় আবেগ মিশ্রিত সংবাদ ও প্রবন্ধ প্রকাশ করেছে গাফফার চৌধুরী জীবনী ও কর্ম নিয়ে। এর মধ্য দিয়ে তাঁর প্রতি সবার অনন্য শ্রদ্ধা মূর্ত হয়েছে। এমনকি ভারতের পত্রিকাগুলোও যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করেছে তাঁর প্রয়াণ সংবাদ। ১৯ মে ১৯৬১ আসামের দাপ্তরিক ভাষা বাংলার দাবীতে প্রাণ দিয়েছিলেন নয়জন বাঙালি। সেই থেকে আসাম বিশেষত বরাক ভ্যালিতে এ দিনটিকে তারা ভাষা শহীদ দিবস হিসেবে পালন করে আসছেন। গাফ্ফার চৌধুরী তিরোধানকে পশ্চিমবঙ্গের পত্রিকাগুলো কাকতলীয় ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছে। আনন্দ বাজার পত্রিকায় লিখেছে আসামের ভাষা আন্দোলনের স্মরণ দিনে প্রয়াত হলেন বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের নীলকন্ঠ পাখি। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর চির বিদায়ে অনেক বড় নামি-দামি মানুষ যাঁরা তাঁর ঘনিষ্ঠজন ছিলেন তাঁরাই লিখবেন এটাই স্বাভাবিক। ইতিমধ্যে লিখেছেনও অনেকে এবং লিখবেনও অনেকে। আমার মতো মফস্বল শহরের সাংবাদিক তাঁকে নিয়ে কীইবা লিখতে পারি। ঐ আসামের ভাষা আন্দোলনের কাকতালীয় ঘটনার সঙ্গে আমার জীবনেও তাঁর সঙ্গে কাকতলীয় সাক্ষাতের ঘটনা রয়েছে। তবু তাঁর সঙ্গে পরম শ্রদ্ধায় আমার কিছু কথা, ছোট্ট একটু স্মৃতি এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র। সত্যনিষ্ঠতা, বাঙালির কল্যাণের ভাবনা, দেশপ্রেম, অসাম্প্রদায়িকতার দীপ্ত প্রতীক এই মানুষটি ১৯৭৪ সালে স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য লন্ডনে গমণ করেন। সেই থেকে শুরু হয়ে যায় প্রবাস জীবন। প্রবাসে থেকেও সদা-সর্বদা সচল রেখেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় তাঁর লেখনি। সুযোগ পেলেই দেশে আসতেন। সম্ভবত ২০১৩ সালের শেষ ভাগে অথবা ২০১৪ সালের শুরুতে ঠিক দিন ও তারিখ মনে পড়ছে না। সেই সময় বিএফইউজে’র সভাপতি ছিলেন, মনজুরুল আহসান বুলবুল, মহাসচিব ছিলেন আব্দুল জলিল ভূইয়া, এফইসির সভায় দিনাজপুর ও বগুড়া সাংবাদিক ইউনিয়নের থাকার ব্যবস্থা করা হয় পিআইবি (প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ) রেস্ট হাউজে। আমার ও তৎকালীন দিনাজপুর সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারন সম্পাদক এমদাদুল হক মিলনের
পিআইবি’র বরাদ্দকৃত রুমটি ভিতর থেকে বন্ধ ছিলো। ইতিমধ্যে পিআইবির মহাপরিচালক সাংবাদিক নেতা শ্রদ্ধেয় প্রয়াত আলমগীর ভাই ছুটে আসলেন, তিনি জানালেন এই রুমটিতে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী আছেন, তিনি এখনই চলে যাবেন। এটি শোনার পর বাহিরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ছোট বেলা থেকেই তাঁর নাম শুনে এসেছি তবে দেখা হয়নি কখনো। আলমগীর ভাই ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন তাই তিনার সঙ্গে আমার পূর্ব পরিচয় ছিলো। আমি বায়না ধরে বসলাম আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী’র সঙ্গে দেখা করবো। তিনি আমার অনুরোধ রাখলেন। তখনই তাঁকে স্বচক্ষে কাছ থেকে প্রথম দেখলাম। সেই দেখাই আজ শেষ দেখা। বিস্মৃতি হইনি সেদিনের কথা আজ স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ছি। পরিচয়পর্ব শেষ হলেই তিনি চেয়ারে বসে পড়লেন। দাঁড়িয়ে কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিল। একুশে ফেব্রুয়ারির পটভূমি, স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও সাহচার্য নিয়ে সেদিন প্রশ্ন করেছিলাম। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, যে পেশায় এসেছো মুক্তিযুদ্ধ-স্বাধীনতার প্রশ্নে কখনো আপোষ করবে না, সৎ পথে থেকে পথ চলবে প্রত্যেকটি প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবে। মুজিবনগরে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলা সরকারের প্রথম পত্রিকা সাপ্তাহিক জয় বাংলার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী দীর্ঘ ৮৮ বছরের জীবন পাড়ি দিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
নিঃসন্দেহে বাঙালি জাতির জন্য স্বস্তির বিষয় সরকার ব্যবস্থা করেছেন এবং তাঁর পরিবার রাজি হয়েছেন স্বদেশভূমিতে চির নিদ্রায় শায়িত করতে। আবারও কাকতালীয় ঘটনা। ২৭ মে শুক্রবার আমার একমাত্র পুত্র সাদমান সাকিব আলমের কারণে ঢাকা যাই। রাত ১০টায় হঠাৎ আমার নিকুঞ্জ-২ ভাড়া বাসায় এসে হাজির হন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক তথ্য বিষয়ক উপদেষ্টা দেশ বরেণ্য সাংবাদিক ইকবাল সোবহান চৌধুরী। তিনি নিকুঞ্জ-১ এ বসবাস করেন। এত কাছে থাকি তবু আসা হয়নি তোমার বাসায়, ছেলে কেমন লেখাপড়া করছে খোঁজ নিতে চলে আসলাম। প্রায় এক ঘন্টা অবস্থানে অনেক কথার ফাঁকে জানিয়ে দিলেন আমাগীকাল (শনিবার) আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর মরদেহ দেশে আসছে, সেইসঙ্গে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য জাতীয় প্রেসক্লাবে আনা হবে। তুমি অবশ্যই উপস্থিত থাকিও। শ্রদ্ধেয় ইকবাল ভাই বিদায় নিতেই দেশের আরেক প্রখ্যাত সাংবাদিক মনজুরুল আহসান বুলবুল ভাই মোবাইল করলেন। তিনি জানালেন, আপনি তো ঢাকায় আছেন, আগামীকাল বিকাল ৩টায় জাতীয় প্রেসক্লাবে চলে আসেন। আমাদের সঙ্গে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীকে শ্রদ্ধা জানাবেন। এই সুযোগ পাওয়া আমার জন্য গৌরবের মনে হলো। মন থেকে কৃতজ্ঞতা জানান দিতে শুরু করলাম শ্রদ্ধেয় ইকবাল ভাই ও মনজরুল আহসান বুলবুল ভাইয়ের প্রতি। ২৮ মে সকাল থেকেই কোন কাজ রাখিনি। মনের অজান্তেই গুন গুন করে বের হয়ে আসছে আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো গানটির শব্দগুলো। ছোট বেলা সারা রাত জেগে ফুল চুরি করে সবাই মিলে বেড়ি নিজ হাতে তৈরী করে খুব ভোরে খালি পায়ে শহীদ মিনার যেতাম। এই কালজয়ী গানটি গাইতে গাইতে। আজ সে সব আর নেই, কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে। এখন দোকান থেকে বেড়ি কিনে ফুল নিয়ে শহিদ মিনার যাই। তিনটার মধ্যেই জাতীয় প্রেসক্লাবে হাজির হয়ে দেখি ভিআইপি লাউঞ্জে জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন, বুলবুল ভাই, আব্দুল জলিল ভুইয়া, বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার সম্পাদক নঈম নিজামসহ সকলে বসে আছেন। সবাই আমার পরিচিত। তাই আমাকে দেখে খুশি হলো। একে একে সবাই আসছেন, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীকে চির বিদায় জানাতে। এরই মধ্যে আমাদের মাঝে এসে পৌঁছালেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, বাহাউদ্দিন নাছিম, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম হেলাল, ইত্তেফাকের সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, ঢাকা দৈনিক আনন্দ বাজার পত্রিকার সম্পাদক মুফদী আহমেদ প্রমুখ। মনজুরুল আহসান বুলবুল ভাই জাতীয় প্রেসক্লাবের কর্মকর্তাকে শ্রদ্ধা নিবেদনের তালিকায় দিনাজপুর সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবে আমার নাম লিপিবদ্ধ করার জন্য বললেন। ঠিক বিকাল ৪টায় জাতীয় প্রেসক্লাবে এসে পৌঁছালো আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর মরদেহবাহী এ্যাম্বুলেন্সটি। ইতিমধ্যেই প্রেসক্লাব চত্বরে প্যান্ডেল করা হয়েছে তাঁর মরদেহ রাখার জন্য। আমরা সবাই একত্রে ছুটে চললাম মরদেহ গ্রহণ করার জন্য। আমরা প্যান্ডেলে পৌঁছানোর পরে এ্যাম্বুলেন্স থেকে জাতীয় পতাকা মোড়ানো আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর মরদেহ তাঁর অতি পরিচিত প্রিয় প্রেসক্লাবে নামানো হলো। এখানেই সাক্ষাত হলো গাফ্ফার চৌধুরীর ছেলে অনুপম আহমেদ রেজা চৌধুরীর সাথে। তিনি সাংবাদিকদের জানালেন, বাবা জানতেন এদেশের মানুষ তাঁকে ভালোবাসে। এ কারণেই তাঁর অন্তিম ইচ্ছা ছিলো দেশের মাটিতেই সমাহিত হবেন। তাঁর শেষ ইচ্ছা পুরনের জন্য বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর বোন শেখ রেহেনাকে আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানাই। সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিনও সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান সর্বজন শ্রদ্ধেয় আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর মরদেহ দেশে আনার ব্যবস্থা করার জন্য। এরপর তৃতীয় ও শেষ জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। জানাযা শেষে ফুলে ফুলে সিক্ত হন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর মরদেহ। নিমিষের মধ্যে ফুলে ঢেকে যায় তাঁর কফিন। শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত হন। তাঁর কফিনের সামনে দাঁড়িয়ে মনজুরুল আহসান বুলবুল ভাইয়ের নেতৃত্বে সাংবাদিক সমাজের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানাতে আমিও আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়ি। গানের একটি কলি মনে পড়ে “তোর মরণকালে আসবে যে জন সেই তো তোর আপনজন”। সত্যই আজ আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর আপনজন নিজেকে ভাবতে গর্ববোধ করছি। প্রথম সাক্ষাত চিরবিদায় মনকে ভারি করছে। সবার কাথ থেকে নিঃশব্দে বিদায় নিয়ে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন, মিরপুর শহিদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে। কালজয়ী গান আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি ? এ গানের মধ্য দিয়ে সারা বিশ্বের বাঙালির কাছে অমর হয়ে থাকবেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মহান আল্লাহ’র কাছে দোয়া করি তিনি যেন তাঁকে জান্নাতবাসী করেন।
লেখক : দিনাজপুর সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও দৈনিক তিস্তার সম্পাদক।


























