ঢাকা দুপুর ২:৩৬, শনিবার, ২৫শে জুন, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

বন্যায় কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও সড়কের বিপুল ক্ষতি

ভেসে উঠছে বন্যার ক্ষতচিহ্ন

‘বন্যা সব নিয়ে গেছে। ঘরে গরু ও মুরগি ছিল, এগুলোও ভাসিয়ে নিয়েছে। ঘরের আসবাবপত্রও স্রোতে ভেসে গেছে। কিছুই রক্ষা করতে পারিনি। কেবল নিজেরা জীবন নিয়ে কোনোমতে আছি।’তিনি বলেন, ‘আগের মাসে বন্যায় ফসল গেছে। এবার গরুও চলে গেলো। এখন আমি সংসার চালাবো কী দিয়ে?’কেবল এরশাদ মিয়াই নন। বন্যায় জীবন-জীবিকা নিয়ে সঙ্কটে পড়েছেন এমন অনেক কৃষক ও খামারি। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে, বুধবার পর্যন্ত সিলেট জেলায় হাঁস-মুরগিসহ তিন হাজারের বেশি গবাদিপশু বন্যায় মারা যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে; আর ডুবে গেছে গবাদিপশুর ৭১০টি খামার। কেবল প্রাণিসম্পদের নয়, এই বন্যায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে সড়ক, কৃষি, অবকাঠামো ও মৎস্য সম্পদের। সিলেটে বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে। পানি নামতে শুরু করার সাথে সাথে ভেসে উঠছে এসব ক্ষতচিহ্ন, ভেসে উঠছে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র।

কৃষিতে ক্ষতি ৫০০ কোটি: মে মাসের বন্যায় বোরো ধান তলিয়ে গিয়েছিলো গোয়াইনঘাট উপজেলার রাধানগর এলাকার কৃষক পরীন্দ্র দাসের। এবার তলিয়ে গেছে তার আউশের ক্ষেত। পরীন্দ্র বলেন, ‘বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ার ক্ষতি পোষাতে ঋণ করে চার একর জায়গায় আউশের ক্ষেত করেছিলাম। এখন এটিও তলিয়ে গেলো। না খেয়ে মরা ছাড়া এখন আর আমার সামনে কোন পথ নেই।’গত মাসে পানিতে নেমে বোরো ধান কেটে ঘরে তুলেছিলেন এই এলাকারই কৃষক মটু মিয়া। অক্লান্ত পরিশ্রমে সে যাত্রা ধান রক্ষা করতে পেরেছিলেন তিনি। তবে শেষরক্ষা আর হলো না। ঘরে মজুদ রাখা ধান ভেসে গেছে বানের জলে। মটু আক্ষেপ করে বলেন, ‘পানি আমার সব নিয়ে গেছে। এতো কষ্ট করে, এতো টাকা ব্যয় করে ধান তুলেছিলাম। চোখের পলকেই ঢল এসে তা ভাসিয়ে নিয়ে গেলো। এখন চাষবাস ফেলে আমারে দিনমজুর হতে হবে।

‘কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের হিসাব মতে, পানিতে বিভাগের আউশ ধান ৫৫ হাজার হেক্টর, বোনা আমন ২৫ হাজার হেক্টর ও সবজি ৬ হাজার হেক্টর তলিয়ে গেছে। সবমিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। বিভাগের চার জেলায়ই কৃষির ক্ষতি হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সিলেট জেলায়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, সিলেটের অতিরিক্ত পরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন খান বলেন, ‘মাঠে আমাদের প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া কৃষকের গোলায় থাকা অনেক ধানও তলিয়ে গেছে। এগুলোর প্রকৃত হিসেব পাওয়া সম্ভব নয়। পেলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তো।’সড়কে ক্ষতি শতকোটি টাকা ছাড়াবে: বন্যার পানি নামলেও এখন পর্যন্ত সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ মহাসড়কে যান চলাচল শুরু হয়নি। পানিতে সড়কের তেলিখালে একটি সেতুতে ফাটল ধরেছে এবং কোম্পানীগঞ্জ থানা বাজার এলাকায় আরেকটি সেতুর এপ্রোচ সড়ক দেবে গেছে।

এতে ওই সড়ক দিয়ে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। বন্যায় তলিয়ে যায় সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কও। পানি নেমে যাওয়ায় বুধবার থেকে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কে যান চলাচল শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয় বাস চলাচল। তবে পানির তোড়ে এই সড়কে দেখা দিয়েছে খানাখন্দ ও বড় বড় গর্তের। এবারের বন্যায় সিলেটে সড়ক ও জনপথ বিভাগের ১২৫ কিলোমিটার সড়ক তলিয়ে যায়। এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ শতকোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিস্টরা। সড়ক ও জনপথ বিভাগ, সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বন্যার পানিতে সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ সড়কের একটি সেতু ও আরেকটি সেতুর এপ্রোচ সড়ক ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই এই সড়কে যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, এই সেতুগুলো সংস্কারে সেনাবাহিনী ও সড়ক বিভাগ কাজ করছে।

আশা করছি আজকের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ চালু হবে। বন্যায় সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রায় ১২৫ কিলোমিটার সড়ক তলিয়ে গেছে জানিয়ে এই প্রকৌশলী বলেন, সিলেটে বন্যায় সড়কে ক্ষতির পরিমাণ ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কানাইঘাট, গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায়। তবে পানি পুরো নামলে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে বলে জানান তিনি। বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনও নির্ধারণ করা হয়নি জানিয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি) সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইনামুল কবির বলেন, ‘আমাদের বেশিরভাগ সড়কই পানিতে তলিয়ে গেছে। সড়কগুলো থেকে এখনো পানি নামেনি। পানি না নামলে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা যাবে না।’প্রাণিসম্পদের ব্যাপক ক্ষতি: প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের হিসেব অনুযায়ী, পানির তোড়ে ভেসে গিয়ে জেলায় এখন পর্যন্ত ৩ হাজার ১৮৯টি গবাদিপশু মারা গেছে।

আর জেলা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় সিলেট জেলায় ৭১০টি খামার ডুবে গেছে। পানিতে ভেসে গেছে ১ হাজার ৯৯১ টন খড় ও ২ হাজার ৯৫৯ টন ঘাস। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত জেলায় প্রাণিসম্পদের ক্ষতির পরিমাণ ১১ কোটি ৬৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। চলমান বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা। তবে এ উপজেলার ক্ষয়ক্ষতির কোনো তথ্য নেই প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কাছে। অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, পানিতে কোম্পানী উপজেলা পরিষদ ভবন তলিয়ে যাওয়া, বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় এই উপজেলার তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সিলেটের পরিচালক ড. মোঃ জাকির হোসেন বলেন, ‘এই ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াও পুরো জেলায় গোখাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। গোচারণ ভূমি পানিতে তলিয়ে গেছে। সহজেই এ সঙ্কট কাটবে না। বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে বন্যা নিয়ে জরুরি সভায়ও গোখাদ্যের ব্যবস্থা করার ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। আমরাও মন্ত্রণালায়ে চাহিদা পাঠিয়েছি।

‘তিনি আরও বলেন, ‘বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনো পাওয়া যায়নি। মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় সুনামগঞ্জের সাথে আমরা কোনো যোগাযোগই করতে পারছি না। একই অবস্থা সিলেটের কোম্পানীগঞ্জেরও। পানি সম্পূর্ণ নেমে গেলে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যাবে।’ এই অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় সোমবার পর্যন্ত ২২টি গরু মারা গেছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ১১টি, জৈন্তাপুরে ৪টি ও গোয়াইনঘাটে ৭টি। মহিষ মারা গেছে ৭টি। সবগুলোই গোয়াইনঘাটে। ছাগল মারা গেছে ২১টি। এরমধ্যে ২টি জৈন্তাপুরে ও ১৯টি গোয়াইনঘাটে। বন্যায় এ পর্যন্ত ভেড়া মারা গেছে ১৩টি। এর মধ্যে কানাইঘাটে ৩টি, গোয়াইনঘাট ৮টি ও জৈন্তাপুরে ২টি। বন্যায় সবচেয়ে বেশি মারা গেছে মুরগী।

এ পর্যন্ত এর সংখ্যা ২ হাজার ৭১৫। হাঁস মারা গেছে মোট ৩৯১টি। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোঃ রুস্তম আলী বলেন, ‘আমরা আপাতত বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেয়া গবাদিপশুকে চিকিৎসা দিচ্ছি। পানি নেমে গেলে যাতে সংক্রামক রোগ দেখা না দেয়, এজন্য ভ্যাকসিন কার্যক্রম শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। প্লাবিত এলাকায় গোখাদ্য সরবরাহেরও চেষ্টা করছি আমরা।’১৪০ কোটি টাকার মৎস্যসম্পদের ক্ষতি: মৎস্য অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, চলমান বন্যায় সিলেটে মাছচাষে ১৪০ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে। সুনামগঞ্জের খামারিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সিলেটে মৎস্য অধিদপ্তরের বিভাগীয় উপপরিচালক ড. মো. মোতালেব হোসেন বলেন, ‘সুনামগঞ্জের সব মৎস্য খামারই ভেসে গেছে।

কিন্তু এই জেলার পূর্ণাঙ্গ তথ্য আমরা এখনো পাইনি। পূর্ণাঙ্গ তথ্য পেলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।’তিনি বলেন, সিলেটে প্রায় ৩২ হাজার ৮০২ জন খামারি ৫ হাজার ২৫৮ হেক্টর জমিতে কার্পজাতীয় মাছের চাষ করছিলেন। কার্পের পাশাপাশি তেলাপিয়া ও পাঙ্গাশ মাছেরও অনেক খামার রয়েছে এখানে। বন্যায় যার বেশিরভাগই ভেসে গেছে। এই কর্মকর্তা আরও বলেন, বন্যার কারণে খামারে সৃষ্ট ক্ষতি একইসঙ্গে খামারি ও ভোক্তা উভয়কেই প্রভাবিত করবে। সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার বাসিন্দা আলী আহমদ বলেন, ‘উপজেলার হরিপুরে আমার একটি মৎস্যখামার। পানিতে আমার প্রায় ২০ লাখ টাকার মাছ ভেসে গেছে।’খামারের চারপাশে জাল দিয়েও মাছ আটকানো যায়নি বলে জানান তিনি।

এ বিভাগের আরও সংবাদ