রূপকথার গল্পকেও হার মানিয়ে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে এক সময়ের দিনমজুর এখন অর্ধশত কোটি টাকার মালিক। রয়েছে বিলাসবহুল একাধিক বাড়ী এবং অসংখ্য প্লট। চলেন দামি গাড়ি দিয়ে। সাধারণ একজন দিনমজুর থেকে এত বিশাল বিত্ত-বৈভব ও অর্থ-সম্পদের মালিক বনে যাওয়া ওই গুণধর ব্যক্তি হলেন আটি ওয়াপদা কলোনি বৌ-বাজার এলাকার মৃত মাইন উদ্দিনের ছেলে আব্দুল হাই। আলোচিত সাত খুন মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনের কল্যাণে একটি চুনা কারখানার মালিক হয়ে আলাদিনের চেরাগ পাওয়া আব্দুল হাইয়ের বিস্ময়কর উত্থানে এলাকাবাসীর মাঝে নানা প্রশ্নের জন্ম নিলেও তিনি রয়ে গেছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের দৃষ্টির আড়ালেই।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আটি ওয়াপদা কলোনী এলাকার আব্দুল জলিল মোল্লার বাড়িতে একটানা পাঁচ বছর দিনমজুরের কাজ করছেন আব্দুল হাই। পরে দিনমজুরের কাজ করেন স্থানীয় একটি ইট ভাটায়। আর্থিক সংকটে পরিবারের দিন কাটতো কষ্টে। নব্বই দশকে দিনমজুর হিসেবে যোগ দেন আটি এলাকার মনোয়ারা জুট মিলে। পরে ৯৮ সালে মনোয়ারা জুট মিল বন্ধ হলে তিনি শুরু করেন বালুবাহী ট্রাকের হেলপারী। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর স্থানীয় সংসদ সদস্যের ছত্রছায়ায় শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে শুরু করেন বালুর ব্যবসা। যা চলে ২০০৭ সাল নাগাদ।
মূলত সরকারি জায়গা দখল করে অবৈধভাবে বালু ব্যবসার মাধ্যমেই তার উত্থান শুরু। ১/১১-এ ফখরুদ্দিন এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দেশব্যাপী সন্ত্রাস-দুর্নীতি বিরোধী যৌথ বাহিনীর অভিযানে গ্রেপ্তার হয়ে বেশ কিছুদিন জেলে ছিলেন আব্দুল হাই। পরে জেল থেকে জামিনে বের হয়ে আশ্রয় নেয় তৎকালিন নাসিক ৪নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ভয়ঙ্কর নূর হোসেনের ছায়াতলে। ওই সময় আটি আউলাবন এলাকার মেঘনা লাইমস্ নামক চুনা কারখানার মালিক জালাল উদ্দিনের মৃত্যুর পর কারখানাটি দখল করে নেয় নূর হোসেনের সন্ত্রাসী বাহিনীর কমান্ডার শাহজাহান ওরফে কালা শাহজাহান। আলোচিত সাত খুনের পর নূর হোসেন ও শাহজাহানসহ তার বাহিনী এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেলে শাহজাহানের প্রতিনিধি হিসেবে মেঘনা লাইমস্ দেখভাল করেন আব্দুল হাই। কয়েক বছর পর নিজেই বনে যান মালিক। তখন থেকেই তিনি পেয়ে যান আলাদিনের চেরাগ। চুনা কারখানায় গ্যাস চুরি ও সরকারি কর ফাঁকি দিয়ে বনে যান টাকার কুমির।
গত ২০২১ সালের মাঝামাঝি গ্যাস চুরির অভিযোগে তিতাস কর্তৃপক্ষ আব্দুল হাইকে ৩ কোটি টাকা জরিমানা করেন। তবু বন্ধ হচ্ছেনা তার গ্যাস চুরি। নারায়ণগঞ্জ-আদমজী-শিমরাইল সড়কের পূর্ব পাশে সরকারি জায়গা দখল করে কারখানার সমানেই স্তুপ করে রাখা হয় চুনা পাথর। এতে একদিকে জনচলাচলের প্রতিবন্ধকতা, অপর দিকে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। কারখানাটির পরিবেশ ছাড়পত্র এমনকি ড্রেট লাইসেন্স না থাকার পরও অদৃশ্য শক্তি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে অবৈধভাবে চলছে কারখানাটি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আটি ওয়াপদা কলোনি এলাকায় পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া ২ শতাংশ জমির পাশে আরো ৪ শতাংশ জমি কিনে ৬ শতাংশ জমিতে আব্দুল হাই নির্মাণ করেছেন ৬ তলা একটি বিলাসবহুল ভবন। যার মূল্য প্রায় ৪ কোটি টাকা। একই এলাকায় সোহরাব ওয়েল মিলের পাশে সাড়ে ৪ শতাংশ জমির উপরে একটি টিনসেট বাড়ী রয়েছে তার। যার মূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা। পানি উন্নয়ন বোর্ড স্কুলের পশ্চিম পাশে ৬ শতাংশ জমির একটি প্লট। যার মূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা। আটি হাউজিং এলাকায় আলো ভবনের পাশে সাড়ে ৪ শতাংশের একটি প্লট। যার মূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা। হাউজিংয়ের ভিতরে রয়েছে ৫ শতাংশের আরেকটি প্লট। যার মূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা। এছাড়াও বর্তমানে নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক আব্দুল হাই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক এলাকাবাসী জানান, সাধারণ একজন দিনমজুর অবৈধ উপায়ে এত সম্পদের মালিক হলেও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দৃষ্টির আড়ালে রয়ে গেছেন। তার সম্পদ অর্জনের উৎস ও হিসেবে চাইলে বেড়িয়ে আসবে থলের বিড়াল। তাই দুদকের অনুসন্ধান প্রত্যাশা করছেন সচেতন মহল।
এবিষয়ে আব্দুল হাই’র সাথে মোবাইল ফোনে কথা হলে তিনি অসুস্থ আছেন বলে এড়িয়ে যান।





















