গাজীপুরের কালীগঞ্জে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন নতুন মাত্রা পেয়েছে। শুক্রবার (৩ জুলাই) সকাল থেকে ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওতে কালীগঞ্জ পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের তুমলিয়া গ্রামের কথিত মাদক কারবারি অহিদের স্ত্রীর মুখে শোনা যায়, “আমাদের মাদক বিক্রির টাকা সবার রক্তের সঙ্গে মিশে গেছে।” স্থানীয় যুবসমাজকে উদ্দেশ্য করে দেওয়া তাঁর হুঁশিয়ারিমূলক বক্তব্য ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের লক্ষ্য নিয়ে তুমলিয়া গ্রামের তরুণরা কয়েকদিন ধরেই সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন। এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) বিকেলে তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাদক ব্যবসা বন্ধ করার আহ্বান জানান। এ সময় কথিত মাদক কারবারি অহিদের বাড়িতে গিয়ে তাঁকে না পেয়ে তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন। অভিযোগ রয়েছে, তখন তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে ওই বিতর্কিত মন্তব্য করেন এবং উপস্থিত তরুণদের উদ্দেশে হুমকিসূচক ভাষায় কথা বলেন।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন যুবক মোবাইল ফোনে কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও ধারণ করেন। পরে সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। ভিডিওটি প্রকাশের পর নেটিজেনরা ওই বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন। একই সঙ্গে মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া স্থানীয় যুবসমাজের উদ্যোগকে স্বাগত জানান অনেকেই।
একই দিন সন্ধ্যায় কালীগঞ্জ পৌর এলাকার কাপাসিয়া মোড়ে স্থানীয় যুবসমাজ মাদকবিরোধী কর্মসূচি পালন করে। তারা রাজপথে নেমে বিভিন্ন স্লোগানের মাধ্যমে মাদক নির্মূলের দাবি জানায় এবং সমাজকে মাদকমুক্ত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে।
ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর শুক্রবার (৩ জুলাই) জুম্মার নামাজের পর পরিস্থিতি কিছুটা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিক্ষুব্ধ যুবকরা কথিত মাদক কারবারি অহিদের বাড়ির দিকে এগিয়ে গেলে গ্রামের মুরব্বিরা হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি শান্ত করেন। পরে যুবসমাজের ১০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলকে সঙ্গে নিয়ে তাঁরা অহিদের বাড়িতে যান এবং ভবিষ্যতে মাদক ব্যবসা না করার জন্য কঠোরভাবে সতর্ক করেন।
পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও তুমলিয়া গ্রামের বাসিন্দা মো. আফসার হোসেন বলেন, “এ ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ঘটনার পর স্থানীয় যুবসমাজ আরও উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল। তবে গ্রামের মুরব্বিদের মধ্যস্থতায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা হয়েছে। মাদক কারবারি অহিদ ও তাঁর পরিবার আর কখনও মাদক ব্যবসা করবে না বলে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা নেওয়া হবে।”
তুমলিয়া গ্রামের তরুণ বুলবুল, পায়েল ও সৌরভ জানান, “আমরা গ্রামের যুবসমাজ মিলে অনেক দিন ধরে মাদক কারবারিদের অনুরোধ করে আসছি, তারা যেন এই ব্যবসা ছেড়ে দেয়। বৃহস্পতিবার বিকেলে অহিদের বাড়িতে গিয়ে তাঁকে না পেয়ে তাঁর স্ত্রীকে বিষয়টি জানানো হলে তিনি আমাদের উদ্দেশে ওই মন্তব্য করেন। তখন উপস্থিত কয়েকজন মোবাইলে ভিডিও ধারণ করেন। পরে সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়।”
তারা আরও বলেন, “শুক্রবার জুমার পর কিছু যুবক অহিদের বাড়িতে যেতে চাইলে গ্রামের মুরব্বিরা তাদের নিবৃত্ত করেন। পরে প্রতিনিধিদল নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে গিয়ে মাদক ব্যবসা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়।”
এর আগে গত ৩০ জুন অনুষ্ঠিত কালীগঞ্জ উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এটিএম কামরুল ইসলাম মাদক প্রতিরোধে সামাজিক সম্পৃক্ততার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় তিনি বলেন, “সামাজিক আন্দোলন ছাড়া মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়। অনেক বেকার যুবক-যুবতী নিজেকে পরিবার ও সমাজের বোঝা মনে করে হতাশা থেকে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে মাদকাসক্তি অনেকাংশে কমে আসবে। বর্তমান সরকার বেকারদের কর্মসংস্থানের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এছাড়া মাদক ব্যবসা, সেবন ও পরিবহন নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, সাংবাদিক, শিক্ষকসহ সমাজের সচেতন ব্যক্তিদের সমন্বয়ে প্রতি মাসে ইউনিয়নভিত্তিক মাদকবিরোধী সভা ও সেমিনার আয়োজন প্রয়োজন।”
স্থানীয় তরুণদের ভাষ্য, নতুন প্রজন্মকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে তারা দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক আন্দোলন চালিয়ে যেতে চান। সচেতনতা বৃদ্ধি, জনমত গঠন এবং প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ আরও জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
কালীগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাবের সেক্রেটারি আব্দুর রহমান আরমান বলেন, “মাদকের দৌরাত্ম্যে পুরো কালীগঞ্জ আজ বিপর্যস্ত। একজন গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে নিয়মিত সংবাদ প্রকাশ করা হলেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এখনও আসেনি। স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চেষ্টা চালিয়ে গেলেও কোনো এক অজ্ঞাত কারণে মাদকের বিস্তার কমছে না। তবে শিক্ষক, গণমাধ্যমকর্মী, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ একসঙ্গে কাজ করলে ইতিবাচক ফল পাওয়া সম্ভব।”
পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ভাদার্ত্তী দক্ষিণপাড়া জামে মসজিদের খতিব ও ইমাম মুফতি আরিফুল ইসলাম বলেন, “মাদক শুধু একজন মানুষকে নয়, একটি পরিবার ও পুরো সমাজকে ধ্বংস করে দেয়। তাই মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া প্রত্যেক সচেতন নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। যুবসমাজের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।”
স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মো. মাশহুদুর রহমান সাজেদ বলেন, “যুবসমাজের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান প্রমাণ করেছে, মানুষ এখন মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে চায়। প্রশাসনের পাশাপাশি সামাজিক ও পারিবারিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারলেই মাদক নিয়ন্ত্রণ আরও কার্যকর হবে।”
গাজীপুর জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাড. মো. আতিকুর রহমান বলেন, “মাদক ব্যবসা ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধ আইনে দণ্ডনীয়। কেউ প্রকাশ্যে এমন বক্তব্য দিয়ে অপরাধকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করলে বিষয়টি আইনগতভাবে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। একই সঙ্গে মাদকবিরোধী সামাজিক সচেতনতা আরও বাড়াতে হবে।”
কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জাকির হোসেন বলেন, “ভিডিওটির বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। মাদকসংক্রান্ত যেকোনো অপরাধের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশ সর্বদা কঠোর অবস্থানে রয়েছে। সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলনের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এটিএম কামরুল ইসলাম বলেন, “মাদক নির্মূলে প্রশাসনের পাশাপাশি জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় যুবসমাজের ইতিবাচক উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। সবাই একসঙ্গে কাজ করলে একটি সুস্থ, নিরাপদ ও মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।”
এদিকে গাজীপুর-৫ আসনের স্থানীয় সংসদ সদস্য একেএম ফজলুল হক বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা সভা, রাজনৈতিক কর্মসূচি, সামাজিক অনুষ্ঠান এবং দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে একাধিকবার মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিয়েছেন।
তিনি বলেন, “কালীগঞ্জে মাদকের ব্যাপারে কোনো আপস নয়। যারা মাদক বিক্রি করে এবং যারা মাদক গ্রহণ করে, তারা সমাজ ধ্বংস করে। তাদের কাউকেই কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স।”
স্থানীয় সচেতন মহলের প্রত্যাশা, প্রশাসনের কঠোর অবস্থান এবং যুবসমাজের চলমান সামাজিক আন্দোলন একসঙ্গে এগিয়ে গেলে কালীগঞ্জে মাদকের বিস্তার রোধে কার্যকর পরিবর্তন আসবে এবং একটি নিরাপদ, সুস্থ ও মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের পথ আরও সুগম হবে।
ডিএস





















