সনাতন হিন্দু সম্প্রদায়ের পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুভ আবির্ভাব তিথি ও ধর্মীয় উৎসব ‘শুভ জন্মাষ্টমী’ আজ।শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদা, ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে দেশব্যাপী উদযাপিত হচ্ছে দিনটি। এ উপলক্ষে আজ দেশজুড়ে সরকারি ছুটি।
সনাতন শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, আজ থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে দ্বাপর যুগে ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের রোহিণী নক্ষত্রযুক্ত অষ্টমী তিথিতে ধরাধামে আবির্ভূত হন শ্রীভগবান শ্রীকৃষ্ণ। সেই সময় শূরসেন রাজ্যের রাজধানী মথুরায় অত্যাচারী রাজা কংসের নিষ্ঠুর শাসনে সাধারণ মানুষ ও সাধু-সন্ন্যাসীদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। কংসের ভগিনী দেবকীর বিবাহের পর এক দৈববাণী হয় যে, দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তানের হাতেই নিহত হবেন দুরাচারী কংস।
মৃত্যুভয়ে ভীত হয়ে কংস তার ভগিনী দেবকী ও ভগ্নিপতি বাসুদেবকে লৌহকঠিন কারাগারে বন্দি করেন এবং একে একে তাদের প্রথম সাতটি নবজাতক সন্তানকে নৃশংসভাবে হত্যা করেন। অবশেষে ভাদ্রের এক ঘোর অন্ধকার দুর্যোগপূর্ণ রাতে বন্দিশালায় অষ্টম সন্তান হিসেবে পরমেশ্বর রূপ নিয়ে আবির্ভূত হন মহাবতার শ্রীকৃষ্ণ।
অলৌকিক নির্দেশে বাসুদেব নবজাতক শ্রীকৃষ্ণকে মাথার ঝুড়িতে তুলে নিয়ে উত্তাল যমুনা নদী পাড়ি দিয়ে নিরাপদে পৌঁছে দেন বৃন্দাবনের গোকুলে, যেখানে নন্দরাজ ও মাতা যশোদার স্নেহে গোপনে ও নির্বিঘ্নে বড় হয়ে ওঠেন তিনি।
শৈশবে ননীচোর ও রাখাল বালক ‘গোপাল’ রূপে লীলা করলেও পরিণত বয়সে তিনি কংস বধের মধ্য দিয়ে অত্যাচারী শক্তির বিনাশ সাধন করেন। পরবর্তীতে মহাভারতের কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধে পাণ্ডববীর অর্জুনের রথের সারথি হয়ে শ্রীকৃষ্ণ দান করেন মানবতার শ্রেষ্ঠ দিকদর্শন ‘শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা’।
গীতার বিখ্যাত শ্লোকে তিনি স্পষ্ট ঘোষণা করেন “যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত, অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্” অর্থাৎ যখনই ধর্মের অবক্ষয় ঘটে এবং অধর্মের প্রাবল্য দেখা দেয়, তখনই শিষ্টের লালন, দুষ্টের দমন ও সত্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠায় তিনি মর্ত্যে আবির্ভূত হন।
শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণীতে সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ সমগ্র দেশবাসীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারসহ বিভিন্ন বেসরকারি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার করছে এবং জাতীয় দৈনিকগুলো প্রকাশ করেছে তথ্যবহুল বিশেষ নিবন্ধ।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলার মঠ, মন্দির ও পূজামণ্ডপগুলোতে আজ দিনব্যাপী শোভাযাত্রা, গীতাযজ্ঞ, শ্রীকৃষ্ণের পূজা-অর্চনা, কীর্তন, আরতি, প্রসাদ বিতরণ ও ধর্মীয় আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।
মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির উদ্যোগে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির প্রাঙ্গণে আজ থেকে শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী কেন্দ্রীয় জন্মাষ্টমী উৎসব। উৎসবের প্রথম দিন শুক্রবার সকাল ৮টায় দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনায় অনুষ্ঠিত হয় গীতাযজ্ঞ, যা পরিচালনা করছে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের শংকর মঠ ও মিশন।
বেলা ৩টায় ঢাকেশ্বরী মন্দিরসংলগ্ন পলাশীর মোড় থেকে শুরু হবে ঐতিহাসিক কেন্দ্রীয় জন্মাষ্টমীর বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। মিছিলটি পুরান ঢাকার বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে বাহাদুর শাহ পার্কে গিয়ে শেষ হবে। রাতে অনুষ্ঠিত হবে বিশেষ শ্রীকৃষ্ণ পূজা।
আজও শ্রীকৃষ্ণের প্রেম, ভক্তি, নিষ্কাম কর্মের তত্ত্ব এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর শিক্ষা বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সনাতন ধর্মাবলম্বীর জীবনদর্শন ও বিশ্বাসের মূল ভিত্তি হিসেবে চির অম্লান হয়ে রয়েছে।
ডিএস./
























