ম্যাচের আগে সাকিবেই তটস্থ ছিলো আফগানরা। ছক কষেছিল যেভাবেই হোক সাকিবকে থামাতে হবে। সাকিবকে আফগানরা থামাতে তো পারেইনি উল্টো তার অলরাউন্ড নৈপুন্যে তাসের ঘরের মতো উড়ে গেলো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি। এ নিয়ে বিশ্বকাপে তারা সাত ম্যাচের সাতটিতেই পরাজিত হলো। এই জয়ের ফলে সেমিফাইনালে খেলার আশা উজ্জ্বল হলো মাশরাফি বিন মুর্তজাদের।
সাত ম্যাচ খেলে সাত পয়েন্ট নিয়ে পয়েন্ট টেবিলে বাংলাদেশ এখন পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে। লিগ পর্বে বাংলাদেশের বাকি দুইটি ম্যাচ ভারত ও পাকিস্তানের বিপক্ষে। ২ জুলাই ভারত ও ৫ জুলাই পাকিস্তানের মুখোমুখি হবে টাইগাররা। অন্যদিকে, ইতোমধ্যে বিদায় নিশ্চিত হয়ে যাওয়া আফগানিস্তান সাত ম্যাচ খেলে শূন্য পয়েন্ট নিয়ে সবার নিচে অবস্থান করছে।
সাউদাম্পটনের রোজ বোল টস জিতে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন আফগান অধিনায়ক গুলবাদিন নাইব। মুশফিকুর রহিম এবং সাকিব আল হাসানের জোড়া ফিফটিতে ৭ উইকেটে ২৬২ রানের চ্যালেঞ্জিং স্কোর গড়ে বাংলাদেশ।
টার্গেট তাড়া করতে নেমে সাকিবের অফ স্পিনে বিভ্রান্ত হয়ে ২০০ রানে অলআউট হয় আফগানিস্তান। দলের হয়ে সর্বোচ্চ ৪৯ রান করেন সামিউল্লাহ সেনওয়ারি, ৪৭ রান করেন অধিনায়ক গুলবাদিন নাইব। এছাড়া ২৪ রান করেন রহমত শাহ।
টস হেরে ব্যাটিংয়ে নেমে দলীয় ২৩ রানে লিটনকে হারায় বাংলাদেশ। শর্ট কভারে হাসমতউল্লাহ শহীদি ক্যাচটা নেয়ার পরও লিটন ক্রিজে দাঁড়িয়ে ছিলেন। টিভি আম্পায়ার আলিম দারও নিশ্চিত হতে পারছিলেন না ক্যাচটা আসলে মাটিতে লেগেছে কিনা। একবার মনে হচ্ছিল, বলের নিচে আঙুল আছে। আরেক দিক থেকে মনে হচ্ছিল, মাটিতে বলের ছোঁয়া লেগেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আউটের সিদ্ধান্তই দিলেন। মুজিব উর রহমানের শিকার হয়ে সাজঘরে ফেরেন লিটন।
কিন্তু দলীয় ৮২ রানে মোহাম্মদ নবীর ঘূর্ণিতে বিভ্রান্ত হয়ে বোল্ড হয়ে বিদায় নেন তামিম ইকবাল। তার আগে ৫৩ বলে ৩৬ রান করেন দেশসেরা এ ওপেনার। এরপর সাকিব আর মুশফিক মিলে দলকে টেনে নিয়ে যান। তৃতীয় উইকেটে মুশফিককে সঙ্গে নিয়ে ৬১ রানের জুটি গড়েন সাকিব। আর এই জুটিতেই ফিফটির পর মুজিব-উর-রহমানের বলে এলবিডব্লিউ হয়ে সাজঘরে ফেরেন সাকিব। তার আগে ৬৯ বলে ৫১ রান করেন তিনি।
চলতি বিশ্বকাপে নিজের তৃতীয় ও সবমিলিয়ে ৪৫তম ওয়ানডে ফিফটির দেখা পেয়েছেন এই বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার। আর এই রান করার মধ্য দিয় এবারের বিশ্বকাপে ছয় ম্যাচে ৪৭৬ রান নিয়ে শীর্ষে উঠে যান বিশ্বসেরা এ অলরাউন্ডার। সেই সঙ্গে বিশ্বকাপে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এক হাজার রান করার গৌরব অর্জন করেন তিনি। সাকিব এখন বিশ্বকাপ ইতিহাসের ১৯তম এক হাজার রান সংগ্রাহক।
দলের পক্ষে সর্বোচ্চ ৮৩ রান করেন মুশফিকুর রহিম। এর আগের ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেঞ্চুরি করেছিলেন তিনি। শেষদিকে ২৪ বলে ৩৫ রান করেন মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত। যার কল্যাণে বাংলাদেশ ৫০ ওভারে ৭ উইকেটে ২৬২ রান করতে সক্ষম হয়।
আফগানিস্তানের বোলারদের মধ্যে স্পিনার মুজিব উর রহমান ৩টি উইকেট শিকার করেন। এছাড়া দৌলত জাদরান ১টি, গুলবদিন নাইব ২টি ও মোহাম্মদ নবী ১টি করে উইকেট শিকার করেন।
টাইগারদের দেয়া ২৬৩ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে শুরুটা ভালো করে আফগানরা। দুই ওপেনার গুলবাদিন নাইব আর রহমত শাহ গড়েন ৪৯ রানের জুটি। ১০ ওভার শেষ, সাকিব তখনও আসেননি বোলিংয়ে। যেই না আসলেন, তুলে নিলেন উইকেট। নিজের প্রথম ওভারের পঞ্চম বলে রহমতকে ফিরিয়ে স্বস্তি ফেরান সাকিব।
এর পরেরটা ইতিহাস। সাকিবের টপাটপ উইকেট, দিশেহারা করে দেয় আফগানিস্তানকে। করলেন ক্যারিয়ার সেরা বোলিং। ১০ ওভারে ১ মেডেন সহ মাত্র ২৯ রানে তুলে নিলেন ৫ উইকেট! যা একদিনের ক্রিকেটে তার ক্যারিয়ার সেরা বোলিং।
আফগান মিডল অর্ডার সামিউল্লাহ শেনওয়ারীর অপরাজিত ৪৯ রান কারন হয়ে দাঁড়ায়নি বাংলাদেশের মাথা ব্যথার কারণ। এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে সামিউল্লাহ শুধু দেখে গেলেন সতীর্থদের যাওয়া আসার খেলা।
৪৭ ওভারেই ২০০ রানে শেষ হয়ে যায় দশ উইকেট। বাকি ৬২ রান আর করা হলো না তাদের। অস্ট্রেলিয়ার কাছে ৪৮ রানে হারের পর আফগানিস্তানের বিপক্ষে দুর্দান্ত জয়ে আবারও বেঁচে রইলো সেমিফাইনালে খেলার স্বপ্ন।
সাকিব আল হাসান নেন ২৯ রানে ৫ উইকেট। ২ উইকেট নেন মোস্তাফিজুর রহমান আর ১টি করে উইকেট নেন সাইফউদ্দিন ও মোসাদ্দেক।
ব্যাটিং ও বোলিংয়ে দুর্দান্ত পারফর্মেন্সের কল্যাণে প্লেয়ার অব দ্যা ম্যাচ হন সাকিব। এসময় তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, এ ম্যাচের জয় ভারত ও পাকিস্তানের বিপক্ষে আমাদের আরও আত্মবিশ্বাসী করবে।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
বাংলাদেশ ইনিংস: ৫০ ওভার ২৬২/৭ রান (লিটন দাস ১৬, তামিম ইকবাল ৩৬, সাকিব আল হাসান ৫১, মুশফিকুর রহিম ৮৩, সৌম্য সরকার ৩, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ২৭, মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত ৩৫, মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন ২*; মুজিব উর রহমান ৩/৩৯, দৌলৎ জাদরান ১/৬৪, মোহাম্মদ নবী ১/৪৪, গুলবদিন নাইব ২/৫৬, রশীদ খান ০/৫২, রহমত শাহ ০/৭)
আফগানিস্তান ইনিংস: ৪৭ ওভার ২০০ রান (গুলবদিন নাইব ৪৭, রহমত শাহ ২৪, হাশমতউল্লাহ শহীদি ১১, আসগার আফগান ২০, মোহাম্মদ নবী ০, সামিউল্লাহ শেনওয়ারি ৪৯*, ইকরাম আলী খিল ১১, নাজিবউল্লাহ জাদরান ২৩, রশীদ খান ২, দৌলৎ জাদরান ০, মুজিব উর রহমান ০; মাশরাফি বিন মর্তুজা ০/৩৭, মোস্তাফিজুর রহমান ২/৩২, মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন ১/৩৩, সাকিব আল হাসান ৫/২৯, মেহেদী হাসান মিরাজ ০/৩৭, মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত ১/২৫)
ফল: ৬২ রানে জয়ী বাংলাদেশ
ম্যাচ সেরা: সাকিব আল হাসান (বাংলাদেশ)
বিবি/জেজে

























