জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রেসিডিয়াম সদস্য ও রংপুর জেলার সাধারণ সম্পাদক ফখর-উজ-জামান জাহাঙ্গীর বলেন, ‘আমরা ওয়েটিং লিস্টের প্রার্থী। মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা নেই প্রায় ৯০ শতাংশ। তবু ১০ শতাংশ আশা নিয়ে ফরম সংগ্রহ করেছি। দল মনোনয়ন দিলে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত রয়েছি। তবে চারদিকে যা শুনছি, তাতে মনে হয় রংপুর সদর আসনের মনোনয়ন দলের কাউকে নয়, এরশাদ পরিবারের সদস্যরাই পাচ্ছেন। এটি দলের জন্য মঙ্গল হবে না। পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুতে শূন্য ঘোষণা করা হয় রংপুর-৩ আসনটি। আগামী ১ সেপ্টেম্বর আসনে উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণার কথা রয়েছে।
লাঙল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে চান মহানগর জাপার সাধারণ সম্পাদক ইয়াসির আহমেদও। তবে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘১৯৯০ সালে এরশাদের মুক্তির আন্দোলন করেছে রংপুরের মানুষ। তার পরিবারের কেউ মাঠে নামেননি। দীর্ঘদিন থেকে জাতীয় পার্টি করি। এর পরও দল যদি আমাকে মূল্যায়ন না করে পরিবারের সদস্যকে মনোনয়ন দেয়, তা রংপুরবাসী মেনে নেবে না। এটি দলের জন্যও মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনবে। আসলে এরশাদের পরিবার রংপুরের মানুষকে কৃতদাস ভাবছে। তারা মনে করছে, যাকেই মনোনয়ন দেবে সেই বিজয়ী হবে। কিন্তু এবার তা হবে না। রংপুরের মানুষ এরশাদ পরিবারের কাউকে আর মেনে নেবে না।’
স্থানীয় নেতাদের হতাশা ও ক্ষোভ থেকে এটি নিশ্চিত যে, রংপুর-৩ আসনের উপনির্বাচনের প্রার্থী নিয়ে ভালোই বেকায়দায় রয়েছেন জাপার শীর্ষ নেতারা। এরশাদের মৃত্যুর পর তার আসনে পরিবারের চার সদস্যের পাশাপাশি দলের অন্তত তিনজন নেতা নির্বাচন করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বিষয়টি নিয়ে পার্টির বর্তমান চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মাদ (জিএম) কাদের ও ভাবি সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান বেগম রওশন এরশাদের মধ্যে এক প্রকার দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। শেষমেশ তাদের মধ্যে সমঝোতা হলেও ছাড় দিতে রাজি নন স্থানীয় নেতারা।
জাপার একাধিক নেতার মতে, আসনটি এরশাদ পরিবার নিজেদের মধ্যে রাখতে চায়। এরশাদ-রওশন দম্পতির সন্তান রাহগীর আল মাহি সাদ এরশাদই এ ক্ষেত্রে এগিয়ে। মা রওশন এরশাদ বাবার আসনে সাদকে মনোনয়ন দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাকে প্রার্থী দেওয়ার ক্ষেত্রে জিএম কাদের ও বিরোধীদলীয় উপনেতা রওশন এরশাদের মধ্যে সমঝোতাও হয়েছে বলে জানা গেছে। অনেকে অবশ্য মনে করেন, সাদকে মনোনয়ন দেওয়া হলে দেবর-ভাবির দূরত্বও কমবে। তবে এ ক্ষেত্রেও রয়েছে বিপত্তি। কেননা পরিবারের অন্যতম সদস্য এরশাদের ছোট ভাইয়ের ছেলে সাবেক সংসদ সদস্য আসিফ শাহরিয়ারও মনোনয়নপ্রত্যাশী। দলীয় মনোনয়ন না পেলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তিনি ওই আসনে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন। এ ছাড়া এরশাদের মামাতো ভাইয়ের ছেলে মেজর (অব) খালেদ আখতারও নির্বাচন করতে চান। তিনি দীর্ঘদিন চাচা এরশাদের একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। মনোনয়নপ্রত্যাশী এরশাদের বোন সাবেক সংসদ সদস্য মেরিনা রহমানের মেয়ে মেহেজেবুন্নেছা রহমান টুম্পাও। পার্টির সাবেক মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুর স্ত্রী তিনি। মনোনয়ন দৌড়ে রয়েছেন জিএম কাদেরের স্ত্রী শরীফা কাদেরও। তবে ২৯ ২৯ আগস্ট পর্যন্ত জাপার মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন জাপা নেতা এসএম ইয়াসির আহমেদ, শিল্পপতি ফখর উজ জামান জাহাঙ্গীর ও মেহেজেবুন নেছা টুম্পা।
এদিকে এরশাদের ভাগ্নি টুম্পা মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করায় খুশি হতে পারেননি রংপুরের তৃণমূল নেতাকর্মীরা। তারা মনে করেন, দলের এবং স্থানীয় নেতাদের বাইরে এ আসনে এরশাদ পরিবারের কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হলে দলের ভাঙন আর কেউ ঠেকাতে পারবে না। সেই সঙ্গে আসনটি হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে আওয়ামী লীগও। তাই রংপুর সদর আসনে প্রার্থী মনোনয়নকে ঘিরে দলে কোন্দল প্রকোট হয়ে উঠছে। তা ঠেকাতে না পারলে খোদ রংপুরেই জাপা তার অস্তিত্ব হারাবে। এ বিষয়ে রংপুর-৩ আসনের জাপা নেতাকর্মীসহ দল থেকে নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র ও একাধিক কাউন্সিলর স্বাক্ষরিত একটি আবেদন কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে। উপনির্বাচনে রংপুর মহানগর জাপার সাধারণ সম্পাদক এসএম ইয়াসিরকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে সেই আবেদনে।
এর মধ্যেই সাবেক সাংসদ আসিফ শাহরিয়ার বিশাল শোডাউন দিয়ে নিজেকে জাপা প্রার্থী হিসেবে জানান দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘স্থানীয় ছাড়া অন্য কাউকে প্রার্থী করলে জাপার তৃণমূল নেতাকর্মীরা তা মেনে নেবে না। বারবার ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, এবার আর ভুল সিদ্ধান্ত নিতে দেওয়া হবে না। যাকে কেউ চিনেই না, তাকে কেন মানুষ ভোট দেবে।’ তিনি মনোনয়ন না পেলেও নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়বেন বলে ঘোষণা দেন।
জাপার কেন্দ্রীয় যুগ্ম দপ্তর সম্পাদক এমএ রাজ্জাক খান সরাসরি না বললেও ইঙ্গিত দিয়ে জানান, এরশাদ পরিবারের সদস্যই এ আসনে মনোনয়ন পেতে পারেন। তিনি অবশ্য বলেন, ‘মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় দলের কোনো ক্ষতি হবে না। তবে সদর এ আসনটি জাতীয় পার্টির হাত ছাড়া হতে পারে। কারণ এখানে এবার সরকারদলীয় প্রার্থীও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।’
সিটি করপোরেশনের ২৫টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত রংপুর-৩ আসন। মোট ভোটার চার লাখ ৪২ হাজার ১৪৯ জন। এদের মধ্যে নারী ভোটার দুই লাখ ২০ হাজার ৭১৫ এবং পুরুষ ভোটার দুই লাখ ২১ হাজার ৪৩৪ জন। ১৭৫টি কেন্দ্রের মাধ্যমে এসব ভোটার ইভিএমে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার কথা রয়েছে ১ সেপ্টেম্বর।
বিজনেস বাংলাদেশ-/এমএ


























