১১:৪৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬

দীর্ঘমেয়াদি সংকটের মুখে ব্যাংক

করোনা মহামারির কারণে ২০২০ সালের পুরোটা সময় ঋণের কিস্তি পরিশোধে অবকাশ সুবিধা দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। জানুয়ারি থেকে এই সুবিধা রহিত করে পূর্বের বাধ্যবাধকতা বহাল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। স্বাভাবিক সময়ের বিধিনিষেধ আরোপ করলেও বিশ্ব অর্থনীতি কিংবা দেশের অর্থনীতি এখনও স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফেরেনি। করোনার দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাক্কায় বিশ্ব অর্থনীতি এখনও টালমাটাল। বাংলাদেশেও করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা এসে পড়েছে। গত কয়েকদিন ধরে করোনা সংক্রমনের হার এক হাজারের ওপরে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতেই ব্যবসায়ী ও ব্যাংক খাতের জন্য চলমান মার্চ মাসটি ‘আতঙ্ক’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। একই সঙ্গে আতঙ্কিত শেয়ারবাজারের ৩০ লাখ বিনিয়োগকারীও। কারণ, মার্চ মাসের মধ্যে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পারলে অধিকাংশ ব্যবসায়ী খেলাপি হয়ে পড়বেন। অন্যদিকে ব্যাংকগুলো ঋণ গ্রহিতাদের কাছ থেকে কিস্তি আদায় করতে ব্যর্থ হলে বিপুল অংকের প্রভিশন ঘাটতিতে পড়বে। কারণ, ঋণের কিস্তি আদায় করতে না পারলে হঠাৎ করে বিপুল অংকের ঋণ খেলাপিতে পরিণত হবে। আর খেলাপির বিপরীতে মুনাফা থেকে শতভাগ পর্যন্ত প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হবে। এতে অনেক ব্যাংক লোকসানে চলে যেতে পারে যা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত করে তুলছে। কারণ, পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলোর বিপুল পরিমাণ শেয়ার থাকায় ব্যাংকের শেয়ারমূল্যের ওপর ভর করে সূচক ওঠানামা করে।
এদিকে অনেক ব্যবসায়ী নতুন করে খেলাপি হয়ে পড়ায় তারা আর ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে নতুন কোন বিনিয়োগে যেতে পারবে না। এতে একদিকে যেমন ব্যাংকের ওপর ক্রমবর্ধমান অলস অর্থের চাপ আরও বাড়বে অন্যদিকে মুখ থুবড়ে পড়বে দেশের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান। ইতোমধ্যে ব্যাংক খাতে অলস অর্থ বা তারল্যের পরিমাণ ২ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। খেলাপি হওয়ার কারণে অনেক ব্যবসায়ী ঋণ গ্রহণের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলায় ব্যাংকগুলোর নতুন বিনিয়োগের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়বে যা ব্যাংকগুলোর ‘তারল্যবোঝা’ আরও বাড়িয়ে দেবে। পাশাপাশি নতুন করে খেলাপি হয়ে পড়া ব্যবসায়ীরা নতুন কোন বিনিয়োগে যেতে না পারায় মুথ থুবড়ে পড়বে সরকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগও। করোনা মহামারির কারণে ইতোমধ্যে সংকুচিত হয়ে পড়া চাকরির বাজার আরও বেশি সংকুচিত হয়ে পড়বে।
ব্যাংকগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত প্রায় আড়াই মাসে কাঙ্ক্ষিত হারে ঋণ আদায় হচ্ছে না। ব্যবসায়ীদের ওপর ব্যাংকগুলো চাপ প্রয়োগ করলেও তাদের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা না ফেরায় ব্যাংকগুলো কিস্তি ফেরত পাচ্ছে না। এ কারণে ব্যাংক খাতে আবারো খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যাংকাররা। এতে ব্যাংকের বিনিয়োগ স¶মতা ভেঙে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছেন তারা।
অর্থ মন্ত্রণালয়, ব্যাংকার ও ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের পরামর্শেই গত এক বছর ঋণ খেলাপিকরণের ওপর শিথিলতা দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। বলা হয়েছিল কোনো গ্রাহক ঋণ পরিশোধ না করলেও ওই ঋণকে খেলাপি করা যাবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই নীতি সহায়তার ফলে করোনা মহামারির মাঝেও টিকে যায় দেশের আর্থিক খাত ও শিল্প-বাণিজ্য। ঋণ পরিশোধ করতে না পারলেও একদিকে ব্যবসায়ীরা যেমন খেলাপি হননি তেমনি ব্যাংকগুলোও খেলাপির বিশাল চাপ থেকে বেঁচে যায় যা দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বড় ভূমিকা রাখে। কিন্তু ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বরের পর এই সুবিধা রহিত করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
কয়েকটি ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঋণ আদায়ের শিথিলতার কার্যকারিতা বাতিল হওয়ার প্রায় আড়াই মাস পার হলেও কাঙ্ক্ষিত হারে আদায় হচ্ছে না। অনেক ব্যবসায়ীর হাতে নগদ অর্থ না থাকায় তারা ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না। অনেক রফতানিকারকের বিল দীর্ঘমেয়াদের জন্য বিদেশে আটকে গেছে। এসব রফতানির বিপরীতে এলসি হিসাব লিয়েন করা থাকলেও তারা টাকা আদায় করতে পারছেন না। কারণ বিদেশের ক্রেতারাই রফতানিকারকদের অর্থ পরিশোধ করছেন না। অনেক ব্যবসায়ী করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এখনও কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না। আবার গুটিকয়েক ব্যবসায়ী ইচ্ছাকৃতভাবেও ঋণ আদায় করছেন না। তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন কোন সুবিধা ঘোষণার অপেক্ষায় আছেন।
ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, ঋণ আদায় সন্তোষজনক না হলে ব্যাংকে অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ আবারো বেড়ে যাবে। যেসব ঋণ খেলাপির আগের স্তরে ছিল ওইসব ঋণ এখন খেলাপি ঋণে পরিণত হবে। ফলে সামগ্রিকভাবে বেড়ে যাবে খেলাপি ঋণ। আর বেড়ে গেলে ব্যাংকগুলোকে বর্ধিতহারে প্রভিশন সংর¶ণ করতে হবে। এতে অনেক ব্যাংকই লোকসানের মুখে পড়বে।
একাধিক ব্যাংকার জানিয়েছেন, বর্তমানে ঋণ আদায়ে ধীরগতির প্রভাব কিছু ব্যাংক বাদে বেশির ভাগ ব্যাংকেই পড়ছে না। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে করোনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের জন্য ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের ওপর ৫০ শতাংশ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ করোনার প্রভাবে ¶তিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের তহবিল জোগান দেয়ার জন্য প্যাকেজ থেকে ব্যবসায়ীদের ১০০ টাকা ঋণ বিতরণ করলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ৫০ টাকার তহবিল পাওয়া যাচ্ছে। অপর দিকে আমদানি চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ের মাধ্যমে পাচ্ছে তার একটি অংশ ব্যবহার না হওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে নগদ টাকার জোগান দিচ্ছে। পাশাপাশি চলমান পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোও আর আগের মতো ঋণ বিতরণ করছে না। অর্থাৎ অনেকটা দেখেশুনে বিনিয়োগ করা হচ্ছে। এতে প্রায় প্রতিটি ব্যাংকের হাতেই উদ্বৃত্ত তহবিল রয়েছে। সবমিলেই নগদ আদায় কমে যাওয়ার প্রভাব তেমন পরিল¶িত হচ্ছে না। ইতোমধ্যে ব্যাংকগুলোর হাতে ২ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকার উদ্ধৃত তারল্য জমা হয়েছে। সামনে এই অর্থ বিনিয়োগ করতে না পারলে পরিচালন ব্যয় মিটিয়ে সুদে-আসলে আমানতকারীদের মেয়াদ শেষে অর্থ ফেরত দেওয়া কষ্টকর হবে।
ব্যাংক খাতের আসন্ন সংকট প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক ও অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত আজকের বিজনেস বাংলাদেশকে বলেন, চলতি মার্চ মাসের মধ্যে ব্যবসায়ীরা যদি ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পারেন তাহলে ব্যাংক খাতের জন্য বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছে। ব্যাংকগুলোকে যেমন ঋণ আদায়ে মাঠে নামতে হবে তেমনি যেসব ব্যবসায়ী প্রকৃত কারণেই ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না তাদের জন্য কোন নীতি সহায়তা দেওয়া যায় কি না সেটাও নীতি নির্ধারনি পর্যায়ে ভাবতে হবে। কারণ, করোনা পরিস্থিতির শিকার হওয়ার কারণে যেসব ব্যবসায়ীর ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ফেরেনি তারা খেলাপি হয়ে পড়লে দেশের সার্বিক অর্থনীতির জন্যই মঙ্গলজনক হবে না।
এ প্রসঙ্গে প্রিমিয়ার সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক বিজনেস বাংলাদেশকে বলেন, ‘যেহেতু করোনা মহামারি এখনও শেষ হয়নি, তাই কমপক্ষে আরও ছয় মাস ঋণের কিস্তি পরিশোধে বাধ্যবাধকতার স্থগিতাদেশ সুবিধা বহাল রাখা খুবই জরুরী। এটা বড় শিল্পগুলোকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত টিকে থাকতে সহায়তা করবে।’
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সহ-সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, করোনার কারণে দেশের ব্যবসায়ীরা এখন সবচেয়ে বেশি বিপদগ্রস্ত। এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীমহল আশা করছিল বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যবসায়ীদের কষ্টের কথা বুঝবে। কিন্তু, দেখা যাচ্ছে ব্যাংকারদের কথায় ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা আর বাড়ানো হচ্ছে না। আরও অন্তত এক বছর ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানো উচিত বলে আমরা মনে করি।’
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৪ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৯৮ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা ছিল বেসরকারী ব্যাংকগুলোর। সরকারী খাতের ব্যাংকগুলোর কাছে অতিরিক্ত তারল্য ছিল ৮৩ হাজার ৭৮৯ কোটি টাকা। আর ২২ হাজার ১৯৩ কোটি টাকার অতিরিক্ত তারল্য জমা হয় বিদেশী ব্যাংকগুলোর হাতে। চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ আরও বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, নতুন ঋণ নেয়ার মতো পরিস্থিতিতে তারা এখনও আসেননি। ফলে বিনিয়োগ না হওয়ায় পুঞ্জীভূত এই অর্থ ব্যাংকগুলোকে ভোগান্তিতে ফেলেছে। এ প্রসঙ্গে এফবিসিসিআই’র সহ-সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘বিনিয়োগ না করে শুধু ব্যাংকে টাকা জমা করে লাভ নেই। আগে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ব্যবসায়ীদের টাকা ফেরত দেয়ার মতো সুযোগ দিতে হবে।’
##

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

দীর্ঘমেয়াদি সংকটের মুখে ব্যাংক

প্রকাশিত : ১২:০১:৪৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৪ মার্চ ২০২১

করোনা মহামারির কারণে ২০২০ সালের পুরোটা সময় ঋণের কিস্তি পরিশোধে অবকাশ সুবিধা দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। জানুয়ারি থেকে এই সুবিধা রহিত করে পূর্বের বাধ্যবাধকতা বহাল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। স্বাভাবিক সময়ের বিধিনিষেধ আরোপ করলেও বিশ্ব অর্থনীতি কিংবা দেশের অর্থনীতি এখনও স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফেরেনি। করোনার দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাক্কায় বিশ্ব অর্থনীতি এখনও টালমাটাল। বাংলাদেশেও করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা এসে পড়েছে। গত কয়েকদিন ধরে করোনা সংক্রমনের হার এক হাজারের ওপরে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতেই ব্যবসায়ী ও ব্যাংক খাতের জন্য চলমান মার্চ মাসটি ‘আতঙ্ক’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। একই সঙ্গে আতঙ্কিত শেয়ারবাজারের ৩০ লাখ বিনিয়োগকারীও। কারণ, মার্চ মাসের মধ্যে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পারলে অধিকাংশ ব্যবসায়ী খেলাপি হয়ে পড়বেন। অন্যদিকে ব্যাংকগুলো ঋণ গ্রহিতাদের কাছ থেকে কিস্তি আদায় করতে ব্যর্থ হলে বিপুল অংকের প্রভিশন ঘাটতিতে পড়বে। কারণ, ঋণের কিস্তি আদায় করতে না পারলে হঠাৎ করে বিপুল অংকের ঋণ খেলাপিতে পরিণত হবে। আর খেলাপির বিপরীতে মুনাফা থেকে শতভাগ পর্যন্ত প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হবে। এতে অনেক ব্যাংক লোকসানে চলে যেতে পারে যা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত করে তুলছে। কারণ, পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলোর বিপুল পরিমাণ শেয়ার থাকায় ব্যাংকের শেয়ারমূল্যের ওপর ভর করে সূচক ওঠানামা করে।
এদিকে অনেক ব্যবসায়ী নতুন করে খেলাপি হয়ে পড়ায় তারা আর ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে নতুন কোন বিনিয়োগে যেতে পারবে না। এতে একদিকে যেমন ব্যাংকের ওপর ক্রমবর্ধমান অলস অর্থের চাপ আরও বাড়বে অন্যদিকে মুখ থুবড়ে পড়বে দেশের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান। ইতোমধ্যে ব্যাংক খাতে অলস অর্থ বা তারল্যের পরিমাণ ২ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। খেলাপি হওয়ার কারণে অনেক ব্যবসায়ী ঋণ গ্রহণের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলায় ব্যাংকগুলোর নতুন বিনিয়োগের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়বে যা ব্যাংকগুলোর ‘তারল্যবোঝা’ আরও বাড়িয়ে দেবে। পাশাপাশি নতুন করে খেলাপি হয়ে পড়া ব্যবসায়ীরা নতুন কোন বিনিয়োগে যেতে না পারায় মুথ থুবড়ে পড়বে সরকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগও। করোনা মহামারির কারণে ইতোমধ্যে সংকুচিত হয়ে পড়া চাকরির বাজার আরও বেশি সংকুচিত হয়ে পড়বে।
ব্যাংকগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত প্রায় আড়াই মাসে কাঙ্ক্ষিত হারে ঋণ আদায় হচ্ছে না। ব্যবসায়ীদের ওপর ব্যাংকগুলো চাপ প্রয়োগ করলেও তাদের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা না ফেরায় ব্যাংকগুলো কিস্তি ফেরত পাচ্ছে না। এ কারণে ব্যাংক খাতে আবারো খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যাংকাররা। এতে ব্যাংকের বিনিয়োগ স¶মতা ভেঙে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছেন তারা।
অর্থ মন্ত্রণালয়, ব্যাংকার ও ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের পরামর্শেই গত এক বছর ঋণ খেলাপিকরণের ওপর শিথিলতা দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। বলা হয়েছিল কোনো গ্রাহক ঋণ পরিশোধ না করলেও ওই ঋণকে খেলাপি করা যাবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই নীতি সহায়তার ফলে করোনা মহামারির মাঝেও টিকে যায় দেশের আর্থিক খাত ও শিল্প-বাণিজ্য। ঋণ পরিশোধ করতে না পারলেও একদিকে ব্যবসায়ীরা যেমন খেলাপি হননি তেমনি ব্যাংকগুলোও খেলাপির বিশাল চাপ থেকে বেঁচে যায় যা দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বড় ভূমিকা রাখে। কিন্তু ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বরের পর এই সুবিধা রহিত করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
কয়েকটি ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঋণ আদায়ের শিথিলতার কার্যকারিতা বাতিল হওয়ার প্রায় আড়াই মাস পার হলেও কাঙ্ক্ষিত হারে আদায় হচ্ছে না। অনেক ব্যবসায়ীর হাতে নগদ অর্থ না থাকায় তারা ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না। অনেক রফতানিকারকের বিল দীর্ঘমেয়াদের জন্য বিদেশে আটকে গেছে। এসব রফতানির বিপরীতে এলসি হিসাব লিয়েন করা থাকলেও তারা টাকা আদায় করতে পারছেন না। কারণ বিদেশের ক্রেতারাই রফতানিকারকদের অর্থ পরিশোধ করছেন না। অনেক ব্যবসায়ী করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এখনও কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না। আবার গুটিকয়েক ব্যবসায়ী ইচ্ছাকৃতভাবেও ঋণ আদায় করছেন না। তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন কোন সুবিধা ঘোষণার অপেক্ষায় আছেন।
ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, ঋণ আদায় সন্তোষজনক না হলে ব্যাংকে অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ আবারো বেড়ে যাবে। যেসব ঋণ খেলাপির আগের স্তরে ছিল ওইসব ঋণ এখন খেলাপি ঋণে পরিণত হবে। ফলে সামগ্রিকভাবে বেড়ে যাবে খেলাপি ঋণ। আর বেড়ে গেলে ব্যাংকগুলোকে বর্ধিতহারে প্রভিশন সংর¶ণ করতে হবে। এতে অনেক ব্যাংকই লোকসানের মুখে পড়বে।
একাধিক ব্যাংকার জানিয়েছেন, বর্তমানে ঋণ আদায়ে ধীরগতির প্রভাব কিছু ব্যাংক বাদে বেশির ভাগ ব্যাংকেই পড়ছে না। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে করোনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের জন্য ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের ওপর ৫০ শতাংশ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ করোনার প্রভাবে ¶তিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের তহবিল জোগান দেয়ার জন্য প্যাকেজ থেকে ব্যবসায়ীদের ১০০ টাকা ঋণ বিতরণ করলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ৫০ টাকার তহবিল পাওয়া যাচ্ছে। অপর দিকে আমদানি চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ের মাধ্যমে পাচ্ছে তার একটি অংশ ব্যবহার না হওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে নগদ টাকার জোগান দিচ্ছে। পাশাপাশি চলমান পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোও আর আগের মতো ঋণ বিতরণ করছে না। অর্থাৎ অনেকটা দেখেশুনে বিনিয়োগ করা হচ্ছে। এতে প্রায় প্রতিটি ব্যাংকের হাতেই উদ্বৃত্ত তহবিল রয়েছে। সবমিলেই নগদ আদায় কমে যাওয়ার প্রভাব তেমন পরিল¶িত হচ্ছে না। ইতোমধ্যে ব্যাংকগুলোর হাতে ২ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকার উদ্ধৃত তারল্য জমা হয়েছে। সামনে এই অর্থ বিনিয়োগ করতে না পারলে পরিচালন ব্যয় মিটিয়ে সুদে-আসলে আমানতকারীদের মেয়াদ শেষে অর্থ ফেরত দেওয়া কষ্টকর হবে।
ব্যাংক খাতের আসন্ন সংকট প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক ও অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত আজকের বিজনেস বাংলাদেশকে বলেন, চলতি মার্চ মাসের মধ্যে ব্যবসায়ীরা যদি ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পারেন তাহলে ব্যাংক খাতের জন্য বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছে। ব্যাংকগুলোকে যেমন ঋণ আদায়ে মাঠে নামতে হবে তেমনি যেসব ব্যবসায়ী প্রকৃত কারণেই ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না তাদের জন্য কোন নীতি সহায়তা দেওয়া যায় কি না সেটাও নীতি নির্ধারনি পর্যায়ে ভাবতে হবে। কারণ, করোনা পরিস্থিতির শিকার হওয়ার কারণে যেসব ব্যবসায়ীর ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ফেরেনি তারা খেলাপি হয়ে পড়লে দেশের সার্বিক অর্থনীতির জন্যই মঙ্গলজনক হবে না।
এ প্রসঙ্গে প্রিমিয়ার সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক বিজনেস বাংলাদেশকে বলেন, ‘যেহেতু করোনা মহামারি এখনও শেষ হয়নি, তাই কমপক্ষে আরও ছয় মাস ঋণের কিস্তি পরিশোধে বাধ্যবাধকতার স্থগিতাদেশ সুবিধা বহাল রাখা খুবই জরুরী। এটা বড় শিল্পগুলোকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত টিকে থাকতে সহায়তা করবে।’
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সহ-সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, করোনার কারণে দেশের ব্যবসায়ীরা এখন সবচেয়ে বেশি বিপদগ্রস্ত। এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীমহল আশা করছিল বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যবসায়ীদের কষ্টের কথা বুঝবে। কিন্তু, দেখা যাচ্ছে ব্যাংকারদের কথায় ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা আর বাড়ানো হচ্ছে না। আরও অন্তত এক বছর ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানো উচিত বলে আমরা মনে করি।’
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৪ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৯৮ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা ছিল বেসরকারী ব্যাংকগুলোর। সরকারী খাতের ব্যাংকগুলোর কাছে অতিরিক্ত তারল্য ছিল ৮৩ হাজার ৭৮৯ কোটি টাকা। আর ২২ হাজার ১৯৩ কোটি টাকার অতিরিক্ত তারল্য জমা হয় বিদেশী ব্যাংকগুলোর হাতে। চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ আরও বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, নতুন ঋণ নেয়ার মতো পরিস্থিতিতে তারা এখনও আসেননি। ফলে বিনিয়োগ না হওয়ায় পুঞ্জীভূত এই অর্থ ব্যাংকগুলোকে ভোগান্তিতে ফেলেছে। এ প্রসঙ্গে এফবিসিসিআই’র সহ-সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘বিনিয়োগ না করে শুধু ব্যাংকে টাকা জমা করে লাভ নেই। আগে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ব্যবসায়ীদের টাকা ফেরত দেয়ার মতো সুযোগ দিতে হবে।’
##