করোনা মহামারি প্রলম্বিত হওয়া এবং সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে বিপরীতমুখী দাবি তৈরি হয়েছে জাতীয় অর্থনীতিতে। করোনার অভিঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো করের চাপ কমানোর জন্য সরকারের কাছে শক্ত দাবি তুলেছে। অর্থনীতিবিদরাও মহামারির এই সময়ে বাড়তি চাপ না দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে দ্রুত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য বাড়তি বরাদ্দের দাবি তুলেছে মন্ত্রণালয়গুলো। এই বিপরীতমুখী দাবিতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে আগামি ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন। কারণ, কর হার কমে গেলে সরকারের রাজস্ব আয় কমে যাবে। অন্যদিকে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকারের প্রয়োজন আরও বেশি অর্থ। জাতীয় বাজেট প্রণয়নের দায়িত্বে থাকা অর্থমন্ত্রণালয় এই চ্যালেঞ্জ কিভাবে মোকাবেলা করে সেটার দিকে তাকিয়ে আছেন ব্যবসায়ী, নাগরিক সমাজ ও নীতিনির্ধারকগণ। দুই পক্ষেরই দাবি মানতে গেলে বড় অংকের ঋণের দিকে ঝুঁকতে হতে পারে সরকারকে। অর্থনীতিবিদগণও বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় ঘাটতি অর্থায়নে জোর দিয়েছেন। সেক্ষেত্রে বাড়তি ঋণের সংস্থান ও ঋণের চাপ মোকাবেলা করাও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেবে। গত এক যুগ ধরে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে দেশের অর্থনীতিকে সফলভাবে সঠিক পথ দেখিয়ে যাওয়া বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার কিভাবে এই নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সেটাই এখন দেখার বিষয়।
এদিকে করোনা মহামারিসৃষ্ট অর্থনৈতিক অচলাবস্থার কারণে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয়নি জাতীয় রাজস্বা বোর্ডের (এনবিআর) পক্ষে। ইতোমধ্যে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ চলে এসেছে। চলতি অর্থবছরের ঘাটতি পুষিয়ে আগামি অর্থবছরেও রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব আদায় করে দিতে হবে সরকারকে। এ কারণে এনবিআর-এর সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। ব্যবসায়ীদের দাবি পূরণে ব্যবসা সম্প্রসারণে শুল্ক-কর কমানোর উপায় খুঁজে বের করতে হবে রাজস্ব বোর্ডকে। পাশাপাশি সরকারের বাজেট লক্ষ্যমাত্রা পূরণে পরবর্তী অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের জন্য সম্ভাব্য প্রক্রিয়া অনুসন্ধান করতে হবে। আগামি বছরের এই লক্ষ্যমাত্রা হবে চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ৫৩ হাজার কোটি টাকা বেশি। চলতি অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু অর্থমন্ত্রণালয় মনে করছে, চলতি অর্থবছরে লক্ষ্যামাত্রার থেকে প্রায় ৯৫ হাজার কোটি টাকা কম আদায় হতে পারে। এই পরিস্থিতিতেই বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বাড়তি বরাদ্দ চাহিদা মেটাতে আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য ৫ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে অর্থমন্ত্রণালয়। এই বাজেটের মধ্যে ৩ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকাই সংস্থান করতে হবে রাজস্ব বোর্ডকে।
অর্থনৈতিক কার্যক্রম পুনরায় চালু হলেও আমদানি-রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি এখনও ফেরেনি। টিকাদান কর্মসূচি শুরুর পর বিভিন্ন খাতের উৎপাদন, বিপণন কার্যক্রম প্রাক-মহামারি পর্যায়ে পৌঁছালেও গত প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে দেশে করোনার সংক্রমণ বাড়তে থাকায় এবং সরকারের পক্ষ থেকে লকডাউনের ঘোষণা আসায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন করে শঙ্কা জেগেছে। আগামী বাজেট নিয়ে রাজস্ব বোর্ডের চলমান প্রাক-বাজেট বৈঠকগুলোতে শুল্ক-কর আরও কমানোর বিষয়ে শক্ত দাবি তুলেছে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো। গার্মেন্ট মালিকরা কর শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করেছেন। তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ আগামী পাঁচ বছরের জন্য পোশাক খাতের বিদ্যমান করপোরেট ট্যাক্স ১২ শতাংশ ও গ্রিন ফ্যাক্টরির করপোরেট ট্যাক্স ১০ শতাংশ অব্যাহত রাখার অনুরোধ জানিয়েছে। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) হার বিদ্যমান ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭ শতাংশ নির্ধারণ করা এবং টার্নওভার ট্যাক্সের সীমা ৮০ লাখ থেকে বাড়িয়ে ১.২০ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করেছে। এনবিআরের সঙ্গে প্রাক-বাজেট সভায় কোভিড পরিস্থিতি বিবেচনায় চলতি অর্থবছর দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে যে কর ছাড় দেওয়া হয়েছে, তা আরও এক বছর অব্যাহত রাখার প্রস্তাব করেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
এই পরিস্থিতিতে করের হার না বাড়িয়ে আদায় বাড়ানোর বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম। গত ১০ মার্চ সিপিডির সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় তিনি বলেছেন, ‘রাজস্ব আদায়ে আমরা এখনও প্রতিবেশি দেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছি। তাই আদায় বাড়ানোর জন্য সকল ধরনের কর আদায়ে ডিজিটাল পদ্ধতি চালুর চেষ্টা করছি। তবে কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে জমি অধিগ্রহণ ও গাড়ি কেনা বন্ধ রাখা, ভ্রমণ ব্যয় ও প্রশিক্ষণ ব্যয় কমানো এবং উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করায় বাজেট ঘাটতির পরিমাণ জিডিপির ৬ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকবে বলে আশা করছি।’
এদিকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য আগামি অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রণালয়ের কাছে বাড়তি বরাদ্দ দাবি করেছে মন্ত্রণালয়গুলো। বাড়তি বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে অর্থসচিব মো. আব্দুর রউফ তালুকদারকে চিঠি পাঠাচ্ছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণি সম্পদ মন্ত্রণালয়সহ প্রায় ৩৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে বাড়তি বরাদ্দ চেয়ে চিঠি এসেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ে।
বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় ঘাটতি অর্থায়নে জোর দিয়েছেন অর্থনীতিবিদগণ। জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘কোভিডের কারণে চলতি অর্থবছর অনেক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ থমকে ছিল। সেগুলো সম্পন্ন করতে মন্ত্রণালয়গুলো অধিক বরাদ্দ চাইতে পারে। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়ার মতো রাজস্ব সরকার আদায় করতে পারবে না। সেক্ষেত্রে ঘাটতি অর্থায়ন করে সরকারকে ব্যয় করতে হবে। কোভিডের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে হলে বাড়তি ব্যয়েরও বিকল্প নেই।’
৯ লক্ষ্যে বাজেট প্রণয়ন:
বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণে ৯টি লক্ষ্য সামনে রেখে আগামি ২০২১-২১ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। বাজেটে দারিদ্র্য নিরসন কার্যক্রম জোরালো করা, রাজস্ব আদায় বাড়ানো, উন্নয়ন প্রকল্পগুলো এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে। আগামি অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার হতে পারে ৫ লাখ ৯৩ হাজার ৩১৩ কোটি টাকা। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরের জন্য ডিজিপির প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ দশমিক ৭ শতাংশ। নতুন বাজেটে ঘাটতি ধরা হতে পারে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৩ শতাংশের মধ্যেই আটকে রাখার চেষ্টা করবে সরকার। চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার বাজেটে সরকারের ৯টি লক্ষ্য হলো: ১। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকারের অগ্রাধিকার খাতগুলোতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করা। ২। কোভিড-১৯ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজগুলো বাস্তবায়ন করা। ৩। কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্যখাতে অতিরিক্ত বরাদ্দ, প্রণোদনা এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়া। ৪। অধিক খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ সেচ ও বীজ প্রণোদনা দেওয়া, কৃষি পুনর্বাসন, সারে ভর্তুকি প্রদান অব্যাহত রাখা। ৫। ব্যাপক কর্মসৃজন ও পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা। ৬। সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের আওতা বাড়ানো। ৭। গৃহহীন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য গৃহনির্মাণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা। ৮। নিম্ন আয়ের মানুষের মাঝে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থা চালু রাখা। ৯। শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নসহ সার্বিক মানবসম্পদ উন্নয়ন করা।
০৭:৩৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম :
দ্বিমুখী চাপে চ্যালেঞ্জিং বাজেট
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - প্রকাশিত : ১২:০০:৪০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ এপ্রিল ২০২১
- 57
ট্যাগ :
জনপ্রিয়





















