ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিদেশ ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে যাচ্ছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুরোধের প্রেক্ষিতে নতুন পাসপোর্ট আইনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই বিধান সংযুক্ত করতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে এই বিধান সংযুক্ত করে পাসপোর্ট আইন ২০২১-এর খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। একই বিধান সংযুক্ত করে ব্যাংক কোম্পানি আইনের সংশোধিত খসড়াও প্রস্তুত করে রেখেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এই দুই খসড়া পাশ হয়ে আইনে পরিণত হলেই ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিরা আর দেশ ত্যাগ করতে পারবেন না।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা বাংলাদেশ ‘পাসপোর্ট আইন, ২০২১’ এর খসড়ার ৯(৩) ধারায় বলা হয়েছে, ‘যদি কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং, ব্যাংক ঋণ খেলাপির অভিযোগ, মানবপাচার কিংবা মুদ্রাপাচার, মাদকদ্রব্য বা অস্ত্রপাচার, উগ্রপন্থী সন্ত্রাসী কর্মকান্ড, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন বা অন্য কোন আইনগতভাবে নিষিদ্ধ ব্যবসায় জড়িত রয়েছেন বলে যুক্তিসঙ্গত প্রমাণ থাকে, তাহলে সরকার তার বিদেশ ভ্রমণে বাধা দিতে পারবে।’
খেলাপি সংস্কৃতিতে লাগাম টানতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ব্যাংক কোম্পানি আইন, ফাইন্যান্স কোম্পানি অ্যাক্ট, অর্থঋণ আদালত আইন ও দেউলিয়া আইন সংশোধনের জন্য খসড়া তৈরি করেছে। এখানেও ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞাসহ বাড়ি-গাড়ি ও সম্পত্তি নিবন্ধন করতে না দেওয়া, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের সদস্য পদ পাওয়ার অযোগ্য ঘোষণা ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার অযোগ্য ঘোষণার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া, খেলাপি ঋণ বিক্রির জন্য একটি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করপোরেশন প্রতিষ্ঠার নতুন একটি আইনের খসড়া তৈরি করা হয়েছে। এই করপোরেশন ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ কিনে নিয়ে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করবে। কিন্তু কোম্পানি হবে, নাকি করপোরেশন-এই প্রশ্নে দুই বছর ধরে আইনটি চূড়ান্ত করতে পারছে না আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। দীর্ঘদিন ধরে অকেজো থাকা দেউলিয়া আইন সংশোধন করতেও খসড়া তৈরি করা হয়েছে।
এদিকে সরকার কঠোর আইন তৈরির উদ্যোগ নিলেও ব্যাংকার, কোম্পানি আইনজীবী ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিদ্যমান বিভিন্ন আইনে খেলাপি ঋণ আদায়ে যথেষ্ট কঠোর হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু প্রভাবশালী ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে তার প্রয়োগ হচ্ছে না। বিদ্যমান অর্থঋণ আদালত ও ব্যাংক কোম্পানি আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করেই খেলাপি ঋণ কমানো সম্ভব।
সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এসব আইন করে কোন লাভ হবে না বলে জানান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ও ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, ‘প্রভাবশালীরা ঋণ খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হন না। তারা ঋণ খেলাপি হয়েও নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের লোকদের সঙ্গে বিদেশ ভ্রমণ করেন। সরকার রাজনৈতিকভাবে খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার সিদ্ধান্ত না নিয়ে যতো আইন-ই করুক, তা কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।’
গত ডিসেম্বর পর্যন্ত অর্থঋণ আদালতে প্রায় ৭৪ হাজার মামলা বিচারাধীন রয়েছে, যার বিপরীতে প্রায় আটকে রয়েছে এক লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ। হাইকোর্টে রিট করে এ ধরণের প্রায় ২২ হাজার মামলায় স্থগিতাদেশ পেয়েছে ঋণ খেলাপিরা। অর্থঋণ আদালত ও উচ্চ আদালতে আটকে থাকা ঋণ খেলাপি সংক্রান্ত প্রায় এক লাখ মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য রেট্রোপেসটিভ ইফেক্ট পদ্ধতি চালু করা ও হাইকোর্টে পৃথক বেঞ্চ গঠনের জন্য অর্থমন্ত্রী থাকাকালে আবুল মাল আবদুল মুহিত বিভিন্ন সময় উদ্যোগ নিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
এদিকে শুধু বিদেশে যেতে নিষেধাজ্ঞা নয়, ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা ঋণ পরিশোধের পর খেলাপি তালিকা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পাঁচ বছর পর্যন্ত কোন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হতে পারবেন না বলে ব্যাংক কোম্পানি আইনের সংশোধিত খসড়ায় নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
সংশোধিত খসড়ায় বলা হয়েছে, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের তালিকা বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কমিটি ওই তালিকা চূড়ান্ত করার ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে পারবে এবং এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে। এই খসড়া মন্ত্রীপরিষদে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
০৫:৩৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম :
ঋণ খেলাপিদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আসছে
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - প্রকাশিত : ১২:০০:৩৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ এপ্রিল ২০২১
- 55
ট্যাগ :
জনপ্রিয়





















