০৫:৪৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬

উপকূলে সুপেয় পানির তীব্র সঙ্কট

তীব্র তাপদাহ তার ওপর বৃষ্টি হয়নি প্রায় সাত মাস। চৈত্রের কাঠফাটা রোদে শুকিয়ে গেছে খাবার পানির একমাত্র উৎস পুকুর, জলাশয়। নলকূপের পানি নোনা। মুখে নিলে গাল পুড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। খাবার পানি মিলছে না কোথাও।
এক কলসি পানি সংগ্রহ করতে কয়েক কিলোমিটার দূরে যেয়ে লাইনে দাঁড়াতে হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার পর মেলে এক কলস পানি। কথাগুলো সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপকূলের ধুমঘাট গ্রামের গৃহবধূদের।সরেজমিনে ঘটনাস্থলে যেয়ে দেখা গেছে, শ্যামনগর উপজেলার ধুমঘাট গ্রামের শরিফ ডাক্তারের বাড়ির একটি মাত্র পুকুর এলাবাসীর একমাত্র ভরসা। কঙ্কালসার ও প্রায় শুকিয়ে যাওয়া এই পুকুর থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করেন পুরো গ্রামের মানুষ।

আলাপকালে পানি নিতে আসা গৃহবধূরা জানান, তারা এসেছেন ৩-৪ কিলোমিটার দূর থেকে। কিন্তু পুকুরটিতে যে পানি আছে তা দুই সপ্তাহের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। তারপর যে কি হবে তা কেউ জানে না। এমন চিত্র সাতক্ষীরার উপকূলের গ্রাম গুলোতে।

পানি সংগ্রহে আসা নারী, শিশুসহ স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুই থেকে চার কিলোমিটার পর্যন্ত দূরবর্তী কাছিহারানী, দেওল, কাঠালবাড়িয়া ও খুটিকাটা গ্রাম থেকে এসেছে তারা। নিজেদের গ্রামে পুকুরের পানি ঘোলা ও লবণাক্ত হওয়ায় তা পানের অযোগ্য। আর্সেনিক ও আয়রণ থাকার পাশাপাশি টিউবওয়েলর পানিও লবণাক্ত। এ কারণে জীবন বাঁচানোর তাগিদে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করে দূরবর্তী গ্রাম পাড়ি দিয়ে পুকুরে পানি নিতে আসে।

 

একই চিত্র সাতক্ষীরা দুই উপকূলিয় উপজেলা আশাশুনি ও শ্যামনগরের ৮টি ইউনিয়নে। পানির ফিলটারগুলোতে এক কলসি পানির জন্য মানুষ তিন-চার ঘণ্টা প্রচ- রোদের মধ্যে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছে। সেখানেও পানি স্বল্পতা থাকায় দূর দূরান্তে ছুটছে মানুষ। গোসল ও গবাদি পশুকে খাওয়ানোর মতো পানিও মিলছে না কোথাও কোথাও। অনাবৃষ্টি আর তীব্র তাপদাহে কষ্ট বেড়েছে কয়েক গুন।

 

স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা বারসিকের কর্মী গাজী আল ইমরান জানান, যেখানে নলকূপ রয়েছে সেখানেও উঠছে না ঠিকমত পানি। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পানির জন্য এসব এলাকায় একপ্রকার হা-হা-কা-র অবস্থা। পানি সংকট নিরসনে পুকুর খনন ছাড়া সরকারিভাবে স্থায়ী কোনো উদ্যোগ নেই। তবে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে পানির ট্যাংক বিতরণসহ ফিল্টার স্থাপন করে দিলেও তা পর্যাপ্ত নয়।

গাবুরা ইউপি চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম বলেন, গত বছর সুপার সাইক্লোন আম্পানে উপকূলের বেড়িবাঁধ ভেঙে সর্বত্র নোনা পানি ঢুকে পড়ে। বাড়িঘর, ফসলি জমি, মাছের ঘের ভেসে যায়। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এই এলাকার একমাত্র পানির উৎস পানির আঁধার (পুকুরগুলো)। দ্রুত সময়ের মধ্যে এ অঞ্চলে পানির ব্যবস্থা না করলে মানুষ তীব্র পানি সংকটে পড়বে।

শ্যামনগর উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর প্রধান প্রকৌশলী সাইফুর রহমান বলেন, এই অঞ্চলের মানুষ সুপেয় পানির জন্য বৃষ্টি ও পুকুরে পানির ওপর নির্ভরশীল তবে গত সাত মাস কোনো বৃষ্টি হয়নি। পুকুরগুলো শুকিয়ে গেছে। গত বছর ঘূর্ণিঝড় আম্পানের সময় বেশকিছু সুপেয় পানির প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছু পুকুরে লবণ পানিতে তলিয়ে যায়। এজন্য এ বছর খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সরকারিভাবে এসব এলাকায় একাধিক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। আমরা স্বল্প মেয়াদি কিছু প্রকল্পের মাধ্যেমে পানির সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছি। তবে তা পর্যাপ্ত নয়।

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ’২৬ এ রাজারহাটে শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অধ্যক্ষ প্রধান শিক্ষক শ্রেণি শিক্ষক নির্বাচিত

উপকূলে সুপেয় পানির তীব্র সঙ্কট

প্রকাশিত : ১২:০১:৫৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ এপ্রিল ২০২১

তীব্র তাপদাহ তার ওপর বৃষ্টি হয়নি প্রায় সাত মাস। চৈত্রের কাঠফাটা রোদে শুকিয়ে গেছে খাবার পানির একমাত্র উৎস পুকুর, জলাশয়। নলকূপের পানি নোনা। মুখে নিলে গাল পুড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। খাবার পানি মিলছে না কোথাও।
এক কলসি পানি সংগ্রহ করতে কয়েক কিলোমিটার দূরে যেয়ে লাইনে দাঁড়াতে হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার পর মেলে এক কলস পানি। কথাগুলো সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপকূলের ধুমঘাট গ্রামের গৃহবধূদের।সরেজমিনে ঘটনাস্থলে যেয়ে দেখা গেছে, শ্যামনগর উপজেলার ধুমঘাট গ্রামের শরিফ ডাক্তারের বাড়ির একটি মাত্র পুকুর এলাবাসীর একমাত্র ভরসা। কঙ্কালসার ও প্রায় শুকিয়ে যাওয়া এই পুকুর থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করেন পুরো গ্রামের মানুষ।

আলাপকালে পানি নিতে আসা গৃহবধূরা জানান, তারা এসেছেন ৩-৪ কিলোমিটার দূর থেকে। কিন্তু পুকুরটিতে যে পানি আছে তা দুই সপ্তাহের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। তারপর যে কি হবে তা কেউ জানে না। এমন চিত্র সাতক্ষীরার উপকূলের গ্রাম গুলোতে।

পানি সংগ্রহে আসা নারী, শিশুসহ স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুই থেকে চার কিলোমিটার পর্যন্ত দূরবর্তী কাছিহারানী, দেওল, কাঠালবাড়িয়া ও খুটিকাটা গ্রাম থেকে এসেছে তারা। নিজেদের গ্রামে পুকুরের পানি ঘোলা ও লবণাক্ত হওয়ায় তা পানের অযোগ্য। আর্সেনিক ও আয়রণ থাকার পাশাপাশি টিউবওয়েলর পানিও লবণাক্ত। এ কারণে জীবন বাঁচানোর তাগিদে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করে দূরবর্তী গ্রাম পাড়ি দিয়ে পুকুরে পানি নিতে আসে।

 

একই চিত্র সাতক্ষীরা দুই উপকূলিয় উপজেলা আশাশুনি ও শ্যামনগরের ৮টি ইউনিয়নে। পানির ফিলটারগুলোতে এক কলসি পানির জন্য মানুষ তিন-চার ঘণ্টা প্রচ- রোদের মধ্যে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছে। সেখানেও পানি স্বল্পতা থাকায় দূর দূরান্তে ছুটছে মানুষ। গোসল ও গবাদি পশুকে খাওয়ানোর মতো পানিও মিলছে না কোথাও কোথাও। অনাবৃষ্টি আর তীব্র তাপদাহে কষ্ট বেড়েছে কয়েক গুন।

 

স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা বারসিকের কর্মী গাজী আল ইমরান জানান, যেখানে নলকূপ রয়েছে সেখানেও উঠছে না ঠিকমত পানি। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পানির জন্য এসব এলাকায় একপ্রকার হা-হা-কা-র অবস্থা। পানি সংকট নিরসনে পুকুর খনন ছাড়া সরকারিভাবে স্থায়ী কোনো উদ্যোগ নেই। তবে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে পানির ট্যাংক বিতরণসহ ফিল্টার স্থাপন করে দিলেও তা পর্যাপ্ত নয়।

গাবুরা ইউপি চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম বলেন, গত বছর সুপার সাইক্লোন আম্পানে উপকূলের বেড়িবাঁধ ভেঙে সর্বত্র নোনা পানি ঢুকে পড়ে। বাড়িঘর, ফসলি জমি, মাছের ঘের ভেসে যায়। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এই এলাকার একমাত্র পানির উৎস পানির আঁধার (পুকুরগুলো)। দ্রুত সময়ের মধ্যে এ অঞ্চলে পানির ব্যবস্থা না করলে মানুষ তীব্র পানি সংকটে পড়বে।

শ্যামনগর উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর প্রধান প্রকৌশলী সাইফুর রহমান বলেন, এই অঞ্চলের মানুষ সুপেয় পানির জন্য বৃষ্টি ও পুকুরে পানির ওপর নির্ভরশীল তবে গত সাত মাস কোনো বৃষ্টি হয়নি। পুকুরগুলো শুকিয়ে গেছে। গত বছর ঘূর্ণিঝড় আম্পানের সময় বেশকিছু সুপেয় পানির প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছু পুকুরে লবণ পানিতে তলিয়ে যায়। এজন্য এ বছর খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সরকারিভাবে এসব এলাকায় একাধিক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। আমরা স্বল্প মেয়াদি কিছু প্রকল্পের মাধ্যেমে পানির সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছি। তবে তা পর্যাপ্ত নয়।