২০০৩ সালের ওই সময়কার পৌরসভা নির্বাচন যতটা না আলোচিত তার চেয়ে বহুগুণে বেশী ছিল ৮ বছর পরের ২০১১ সালের ৩০ অক্টোবরের ভোট। ওই নির্বাচনে সেলিনা হায়াৎ আইভীর সঙ্গে লড়েন শামীম ওসমান। আওয়ামীলীগ সমর্থন দেন শামীম ওসমানকে কিন্তু বেকে বসেন স্থানীয় নেতারা। ওই সময়ে জেলা আওয়ামী লীগের আহবায়ক এস এম আকরাম দলের সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে মাঠে নামেন আইভীর পক্ষে। ছিনিয়ে আনেন এক দোর্দন্ড বিজয় যেখানে শামীম ওসমানের চেয়ে আইভীর ভোট ছিল এক লাখেরও বেশী। এবার সেই আকরাম নেমেছেন তবে আইভী না; বিএনপি নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকারের পক্ষে।
আগামী ১৬ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত হবে সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের ভোট। বিএনপি এবার এখানে দলীয় প্রতীক দেয়নি। কিন্তু সমর্থন দিয়েছেন তৈমূর আলম খন্দকারকে। তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা।
তৈমূর বলেছেন, সর্বস্তরের নেতৃবৃন্দরা নেমে গেছে। আমাদের চেহারাটাই তো ধানের শীষ। আমাদের চেহারায় সেই নারীর প্রতিচ্ছবি আছে যিনি তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হয়েও বিনা চিকিৎসায় কারারুদ্ধ আছেন। জনগণ আমাদের পাশে আছে।
এরই মধ্যে তিনি এও বলেছেন, সর্বস্তরের লোকজন তাঁর সঙ্গে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি সকলেই আছেন। এ অবস্থায় ১৯ ডিসেম্বর বিকেলে তিনি বন্দরের কদমরসূল দরগায় যান। নাটকীয়ভাবে হাজির হন এস এম আকরাম। বদলে যাচ্ছে দৃশ্যপট। আকরাম এসে এও বলেছেন, আমি পরিবর্তন চাই, নারায়ণগঞ্জবাসী পরিবর্তন চায়। আমি লোক দেখাতে আসি নাই। বরং তৈমূরের পাশে আছি।
আওয়ামীলীগের একাধিক নেতা বলেন, ২০১১ সালের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন এ যাবতকালের নারায়ণগঞ্জের আলোচিত নির্বাচনের একটি। ওই নির্বাচনে আকরামের নেতৃত্বে আইভীর পক্ষে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়। নেমে পড়েন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে। কথা বলেন অপরাজনীতি প্রসঙ্গে। ১৯৯৬ হতে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামীলীগের এমপি থাকলে ছিলেন দাপটহীন। তবে তাঁর কদর বেড়ে যায় নির্বাচনের পরে। করা হয় জেলা আওয়ামীলীগের আহবায়ক। আন্দোলন সংগ্রামে পুরোধা ছিলেন তিনি। গড়ে তুলেন আওয়ামীলীগের একটি শক্ত ভীত।
প্রায় দেড় যুগ পর ২০০৩ সালের ১৬ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত হয় বিলুপ্ত নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার নির্বাচন। সেখানে আওয়ামীলীগের সমর্থন নিয়ে মোমবাতি প্রতীকে চেয়ারম্যান পদে লড়ে জিতে যান আইভী যাঁর প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন বিএনপির ওই সময়ের নেতা নুরুল ইসলাম সরদার। ওই নির্বাচনে আইভীর পক্ষে মুখ্য ভূমিকাতে ছিলেন আকরাম যিনি আবার ২০১১ সালের ৩০ অক্টোবরের নির্বাচনেও আওয়ামীলীগের জেলার আহবায়ক পদে থেকেও দল সমর্থিত শামীম ওসমানকে বাদ দিয়ে আইভীর পক্ষে মেয়র নির্বাচনে নির্বাচন পরিচালনা বোর্ডের প্রধান হিসেবে কাজ করেন। ভোটের পরদিন আকরাম আওয়ামীলীগ ও পদ দুটি হতেই পদত্যাগ করে নাগরিক ঐক্যে যোগ দেন।
আকরাম বলেন, ২০১১ এর নির্বাচনে আমাকে বলা হয়েছিল শামীম ওসমান যাতে মেয়র হতে পারে সেভাবে কাজ করেন। কিন্তু আমি সরাসরি সেটি প্রত্যাখান করে দিয়েছি।
২০০৩ সালের সেই পৌরসভা নির্বাচন প্রসঙ্গে আকরাম বলেন, তখন অনেক বড় বড় নেতারাও পালিয়ে যায়। তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মতিন চৌধুরীকে সুষ্ঠু নির্বাচনের অনুরোধ করেছিলাম। মতিন চৌধুরীকে বললাম একটা ফেয়ার নির্বাচনের জন্য। তিনি আমার কথা বুঝলেন। তিনি কথা দিলেন নির্বাচন সুষ্ঠু হবে, কোনো কারচুপি হবে না। তিনি তার কথা রেখেছিলেন, একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আইভী তখন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেন।
২০১১ সালের পর তিনি নাগরিক ঐক্যে যোগ দিলেও নারায়ণগঞ্জে রয়েছে তার গ্রহণযোগ্যতা। ২০১৪ সালের এপ্রিলে নাসিম ওসমানের মৃত্যু পর তিনি উপ-নির্বাচন করেন আনারস প্রতীকে। ওই নির্বাচনে সেলিম ওসমান জিতলেও টনক নড়িয়ে দিয়েছিলেন আকরম। পরে ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী হন আকরাম। কিন্তু সেখানেও হেরে যান।
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় ঐক্যের প্রার্থী হয়ে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন নাগরিক ঐক্যের উপদেষ্টা এ আসনের সাবেক এমপি এস এম আকরাম। তবে নির্বাচনে তাঁর ভরাডুবি ঘটে। ভোটে নারায়ণগঞ্জ-৫ (শহর ও বন্দর) আসনে ১৭১ ভোটকেন্দ্রে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী বর্তমান সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান পেয়েছেন ২ লাখ ৭৯ হাজার ৫৪৫ ভোট। ধানের শীষ প্রতীকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী নাগরিক ঐক্যের উপদেষ্টা সাবেক এমপি এস এম আকরাম পান ৫২ হাজার ৩৫২ ভোট।
ওই নির্বাচন প্রসঙ্গে আকরাম বলেন, ৩০ তারিখে কোন নির্বাচন হয়নি। যা হওয়ার হয়েছে ২৯ ডিসেম্বর রাতেই। তখনই লোকজন ব্যালট বাক্সে ঢুকিয়ের রেখেছিল। আওয়ামীলীগের লোকজন এমপি হওয়ার জন্য নিজেদের বিবেককে বিক্রি করে দিয়েছে। আওয়ামীলীগ একটি বড় দল। নির্বাচন যদি সুষ্ঠুও করা হতো তবে আওয়ামী লীগ অন্তত ৬২টি আসন পেত। ভাগ্য ভালো যে আওয়ামী লীগ ৩০২ টা সিট পায় নাই। যেভাবে ভোট হয়েছে সে হিসেবে তারা এই পরিমাণের সিটই পেতো।
বিজনেস বাংলাদেশ/বিএইচ

























