০২:১৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪

হুমকির মুখে খাদ্য নিরাপত্তা এখন

বিদ্যুতের জাতীয় গ্রিডে আঘাত হানার পর গ্যাস সংকট খুঁজে পেয়েছে নতুন শিকার। এবার দেশের সার উৎপাদনেও প্রভাব পড়েছে সংকটের। ইতোমধ্যেই একটি সার কারখানা প্রায় এক মাস ধরে উৎপাদন করতে পারেনি। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বা আরও বাজে রূপ নিলে- কৃষকরা সময়মতো সার সরবরাহ পাবেন না, এতে করে খাদ্য সংকটের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। জানা গেছে, গ্যাসের সরবরাহ না পেয়ে ইউরিয়া উৎপাদনকারী যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (জেএফসিএল) প্রায় এক মাস ধরে সার উৎপাদন করতে পারছে না। আগামি তিন মাস কারখানাটি চালু হওয়ার কোন সম্ভাবনা দেখছেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এদিকে চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) কোম্পানিকে রেশনিং করে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। শাহজালাল ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি লিমিটেড এবং আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানিও এ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। পেট্রেবাংলার তথ্য বলছে, সার উৎপাদনকারী কারখানাগুলো চালু রাখতে হলে দৈনিক ৩১৬ মিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস দরকার। কিন্তু কারখানাগুলো পাচ্ছে ১৫৯ মিলিয়ন ঘনমিটার। যে কারণে সবগুলো কারখানায় উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব নয়। গত মাস পর্যন্ত দৈনিক ৩,১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করেছে পেট্রোবাংলা, এরমধ্যে ৭৫০ থেকে ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট ছিল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য অস্থিতিশীল হওয়ায় এলএনজি সরবরাহ সীমিত করে সরকার, ফলে দৈনিক সরবরাহ ২,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। বর্তমানে আমদানিকৃত এলএনজি থেকে মাত্র ৪৯০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। জেএফসিএল- এর কর্মকর্তারা জানান, চলতি অর্থবছরে সাড়ে চার লাখ টন সার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু, তিন মাস যদি কারখানা বন্ধ থাকে তাহলে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না। পূর্ণ সক্ষমতায় চললে কারখানাটি দিনে ১,৭০০ টন সার উৎপাদন করতে পারে। গত ২২ জুন থেকে বন্ধ রয়েছে কারখানাটি। তার আগে গ্যাস সরবরাহ কম থাকায় দিনে ১,২৭৫ টন সার উৎপাদন করেছে। যমুনার জেনারেল ম্যানেজার (পরিচালন) ও বিভাগীয় প্রধান (কারিগরি) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ খান বলেন, ‘প্রায় মাসখানেক ধরে গ্যাস সংকটের কারণে কারখানায় উৎপাদন বন্ধ। আমরা আমাদের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে জানিয়েছি, চিঠি দিয়েছি, বারবার মিটিং করছি। কিন্তু এখনো এর কোন সমাধান হয়নি।’জেএফসিএল- এর কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, শিল্প মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাষ্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি) চেষ্টা করছে কারখানাটিতে গ্যাসের সরবরাহ দেওয়ার জন্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাসায়নিক সার আমদানির ব্যয় অনেক বেশি হওয়ায় সরকার এমনিতেই চাপে রয়েছে। তিনগুণ দাম দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে এক কেজি ইউরিয়া সার আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৩২ টাকা। চলতি বছর তা কিনতে হচ্ছে ৯৬ টাকা বা তারও বেশি দাম দিয়ে। এই হিসাবে সরকার প্রতিকেজিতে ভর্তুকি দিচ্ছে ৮২ টাকা। এই অবস্থায় গ্যাসের অভাবে স্থানীয় ইউরিয়া সার উৎপাদন ব্যাহত হলে আমদানির উপর চাপ তৈরি হবে। কোনো কারণে আমদানি করতে না পারলে তার আঘাত আসবে দেশের খাদ্য উৎপাদনে। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. মো জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী এখন জ্বালানি ও খাদ্য সংকট তৈরি হয়েছে। কোনোটারই বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। এর মধ্যে আমাদের বাড়তি খাদ্য উৎপাদন করতে হলে, অবশ্যই সারের যোগান ঠিক রাখতে হবে। কারণ এটা সরাসরি খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত’।’আমরা যদি আগে থেকে এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতাম তাহলে হয়তো স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনায় যাওয়া যেত। কিন্তু, এখন যে অবস্থা তাতে সার উৎপাদক কারখানা বন্ধ করা মোটেও যু্ক্তিযুক্ত সমাধান নয়। ব্যয় সংকোচনের জন্য স্থানীয়ভাবে সারের উৎপাদন বাড়ানোই এখন মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত’- যোগ করেন তিনি। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত চিটাগং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) কোম্পানির সূত্রগুলি জানিয়েছে, তাদের রেশনিং করে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ইউরিয়া ও অ্যামোনিয়া সার উৎপাদনে প্রাকৃতিক গ্যাস প্রধান কাঁচামাল হওয়ায়, উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখতে হলে সিইউএফএল- এর দৈনিক ৪১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দরকার। সিইউএফএল- এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের উৎপাদনে এখন পর্যন্ত গ্যাস সংকটের কোনো প্রভাব পড়েনি। তবে চলমান গ্যাস সংকট মোকাবিলায় সরকারিভাবে আমাদের রেশনিংয়ের মাধ্যমে কারখানা সচল রাখতে বলা হয়েছে। কিন্তু, আমরা এখনও রেশনিং শুরু করিনি’। ‘আমাদের বর্তমান উৎপাদন দৈনিক ১,১৫০ থেকে ১,২০০ মেট্রিক টন, রেশনিং শুরু হলে তা প্রায় ১,০০০ মেট্রিক টনে নেমে দাঁড়াবে’- যোগ করেন তিনি। এদিকে শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লি. এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘আমরা গত অর্থবছরে ৪ লাখ ২৩ হাজার টন সার উৎপাদন করেছি। এবছর আরও বেশি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এ ধারাবাহিকতায় আমরা এখনও উৎপাদন করে যাচ্ছি। এখনও কোনো সংকট হয়নি’। সরকারি তথ্যানুসারে, চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬৭ লাখ টন রাসায়নিক সারের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে শুধু ইউরিয়ার চাহিদাই আছে ২৬ লাখ টন। দেশের চারটি কারখানায় সাড়ে ১০ লাখ মেট্রিক টনের মত ইউরিয়া উৎপাদন হচ্ছে। অর্থাৎ, বাকি ১৬ লাখ মেট্রিক টন আমদানি করতে হবে। আমদানিও ব্যয়বহুল হবে কারণ বিশ্বব্যাপী সার উৎপাদনকারীরা একই ধরনের গ্যাস সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে এবং দাম বাড়াচ্ছে। সস্তায় রাশিয়ান গ্যাস সরবরাহের উপর নির্ভরশীল কিছু ইউরোপীয় সার প্রস্তুতকারক এমনকি গ্যাসের অভাবে উৎপাদন বন্ধ করতেও বাধ্য হয়েছিল। গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি ভারতে সার উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে এবং সেখানে খারিপ ফসলকে হুমকির মুখে ফেলছে। ভারতের কৃষি ভর্তুকি বেড়েছে এবং গত বছরের দামে সারের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা সরকারের জন্য একটি বড় উদ্বেগ বলে জানাচ্ছে সেদেশের গণমাধ্যমের প্রতিবেদন। ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশগুলোর জন্য একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি গত এপ্রিলে তাদের একটি ব্লগপোস্টে জানায়, সারের দাম বৃদ্ধি এবং প্রাপ্যতা নিয়ে উদ্বেগ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলিতে দীর্ঘ সময়ের জন্য ভবিষ্যতের ফসল এবং খাদ্য নিরাপত্তার উপর ছায়া ফেলবে। বাংলাদেশের মতো দেশে সারে উচ্চ ভর্তুকি ব্যবস্থা কৃষকদের দামের ধাক্কা থেকে মুক্তি দিতে পারে, কিন্তু এতে বাজেটের উপর প্রচণ্ড আর্থিক চাপ সৃষ্টি হবে বলেও সেখানে সতর্ক করা হয়েছে। সরকার আগে যেখানে সারে ভর্তুকি দিত ৮-৯ হাজার কোটি টাকা, সেখানে গত অর্থবছর আমদানিতে ২৮ হাজার কোটি টাকা খরচের কথা জানিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। সারের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় গত অর্থবছরের মে পর্যন্ত ১১ মাসে বাংলাদেশকে ৪০০ কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করতে হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ২২৩ শতাংশ বেশি। খাদ্য উৎপাদনের চেষ্টা ব্যাহত: বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের সময়ে দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয় সরকার, যা এখন আসন্ন সার সংকটে হুমকির মধ্যে পড়েছে। আমদানির বড় দুই উৎস দেশ- রাশিয়া ও বেলারুশ থেকে সার আমদানি বন্ধ হয়ে গেছে। কানাডা, সৌদি আরব, চীন, মরক্কো, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তিউনিশিয়া-সহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানির ‍সুযোগ রয়েছে, কিন্তু এসব উৎসেও সারের দাম বেড়েছে। বাড়তি দামের চাপ পড়বে ইতোমধ্যে দৌদুল্যমান বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে। এদিকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সৌদি আরব, কাতার ও দুবাইয়ের সঙ্গে চুক্তি রয়েছে। যেখান থেকে নিয়মিত সার আমদানি করা হয়। বিসিআইসির পরিচালক (যুগ্মসচিব, বাণিজ্যিক) কাজী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এখন তিনটি কারখানা উৎপাদনে আছে। গ্যাসের কারণে একটা বন্ধ। তবে এগুলো নিয়ে আমরা আলোচনা করছি কীভাবে কারখানাগুলো চালু রাখা যায়। আমরা যেসব দেশ থেকে ইউরিয়া আমদানি করি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। কথা বলে রাখছি, প্রয়োজন হলে যাতে দ্রুত আমদানি করা যায়।’বালাই কৃষ্ণ হাজারা, কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সার ব্যবস্থাপনা ও উপকরণ ইউনিট) বলেন, বলেন, ‘ইউরিয়ার চাহিদা আমাদের ২৬ লাখ মেট্রিক টন, একইসঙ্গে এক বছরের জন্য নিরাপত্তা মজুদ রাখতে হয় ৮ লাখ টন। সবমিলে ইউরিয়া লাগে ৩৪ লাখ টন। ডিসেম্বর পর্যন্ত আমাদের ইউরিয়ার কোনো ঘাটতি নেই। অর্থাৎ, আমন মৌসুমে সংকট নেই। তবে যদি এই অবস্থা চলতে থাকলে এর পরে গিয়ে সংকটের সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান তিনি। ‘তবে তারা (কারখানাগুলি) আমাদের কথা দিয়েছে, যেভাবেই হোক তারা সারের যোগান ঠিক রাখবে। আমন মৌসুমে সাড়ে সাত লাখ টন ইউরিয়া সারের প্রয়োজন হবে। এরপর আসবে সবচেয়ে বড় ফসল- বোরো উৎপাদনের মৌসুম, তখন মোট সার সরবরাহের ৬০ শতাংশ ব্যবহারের চাহিদা থাকবে।

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

হুমকির মুখে খাদ্য নিরাপত্তা এখন

প্রকাশিত : ১২:০০:১২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ জুলাই ২০২২

বিদ্যুতের জাতীয় গ্রিডে আঘাত হানার পর গ্যাস সংকট খুঁজে পেয়েছে নতুন শিকার। এবার দেশের সার উৎপাদনেও প্রভাব পড়েছে সংকটের। ইতোমধ্যেই একটি সার কারখানা প্রায় এক মাস ধরে উৎপাদন করতে পারেনি। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বা আরও বাজে রূপ নিলে- কৃষকরা সময়মতো সার সরবরাহ পাবেন না, এতে করে খাদ্য সংকটের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। জানা গেছে, গ্যাসের সরবরাহ না পেয়ে ইউরিয়া উৎপাদনকারী যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (জেএফসিএল) প্রায় এক মাস ধরে সার উৎপাদন করতে পারছে না। আগামি তিন মাস কারখানাটি চালু হওয়ার কোন সম্ভাবনা দেখছেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এদিকে চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) কোম্পানিকে রেশনিং করে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। শাহজালাল ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি লিমিটেড এবং আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানিও এ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। পেট্রেবাংলার তথ্য বলছে, সার উৎপাদনকারী কারখানাগুলো চালু রাখতে হলে দৈনিক ৩১৬ মিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস দরকার। কিন্তু কারখানাগুলো পাচ্ছে ১৫৯ মিলিয়ন ঘনমিটার। যে কারণে সবগুলো কারখানায় উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব নয়। গত মাস পর্যন্ত দৈনিক ৩,১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করেছে পেট্রোবাংলা, এরমধ্যে ৭৫০ থেকে ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট ছিল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য অস্থিতিশীল হওয়ায় এলএনজি সরবরাহ সীমিত করে সরকার, ফলে দৈনিক সরবরাহ ২,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। বর্তমানে আমদানিকৃত এলএনজি থেকে মাত্র ৪৯০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। জেএফসিএল- এর কর্মকর্তারা জানান, চলতি অর্থবছরে সাড়ে চার লাখ টন সার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু, তিন মাস যদি কারখানা বন্ধ থাকে তাহলে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না। পূর্ণ সক্ষমতায় চললে কারখানাটি দিনে ১,৭০০ টন সার উৎপাদন করতে পারে। গত ২২ জুন থেকে বন্ধ রয়েছে কারখানাটি। তার আগে গ্যাস সরবরাহ কম থাকায় দিনে ১,২৭৫ টন সার উৎপাদন করেছে। যমুনার জেনারেল ম্যানেজার (পরিচালন) ও বিভাগীয় প্রধান (কারিগরি) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ খান বলেন, ‘প্রায় মাসখানেক ধরে গ্যাস সংকটের কারণে কারখানায় উৎপাদন বন্ধ। আমরা আমাদের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে জানিয়েছি, চিঠি দিয়েছি, বারবার মিটিং করছি। কিন্তু এখনো এর কোন সমাধান হয়নি।’জেএফসিএল- এর কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, শিল্প মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাষ্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি) চেষ্টা করছে কারখানাটিতে গ্যাসের সরবরাহ দেওয়ার জন্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাসায়নিক সার আমদানির ব্যয় অনেক বেশি হওয়ায় সরকার এমনিতেই চাপে রয়েছে। তিনগুণ দাম দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে এক কেজি ইউরিয়া সার আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৩২ টাকা। চলতি বছর তা কিনতে হচ্ছে ৯৬ টাকা বা তারও বেশি দাম দিয়ে। এই হিসাবে সরকার প্রতিকেজিতে ভর্তুকি দিচ্ছে ৮২ টাকা। এই অবস্থায় গ্যাসের অভাবে স্থানীয় ইউরিয়া সার উৎপাদন ব্যাহত হলে আমদানির উপর চাপ তৈরি হবে। কোনো কারণে আমদানি করতে না পারলে তার আঘাত আসবে দেশের খাদ্য উৎপাদনে। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. মো জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী এখন জ্বালানি ও খাদ্য সংকট তৈরি হয়েছে। কোনোটারই বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। এর মধ্যে আমাদের বাড়তি খাদ্য উৎপাদন করতে হলে, অবশ্যই সারের যোগান ঠিক রাখতে হবে। কারণ এটা সরাসরি খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত’।’আমরা যদি আগে থেকে এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতাম তাহলে হয়তো স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনায় যাওয়া যেত। কিন্তু, এখন যে অবস্থা তাতে সার উৎপাদক কারখানা বন্ধ করা মোটেও যু্ক্তিযুক্ত সমাধান নয়। ব্যয় সংকোচনের জন্য স্থানীয়ভাবে সারের উৎপাদন বাড়ানোই এখন মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত’- যোগ করেন তিনি। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত চিটাগং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) কোম্পানির সূত্রগুলি জানিয়েছে, তাদের রেশনিং করে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ইউরিয়া ও অ্যামোনিয়া সার উৎপাদনে প্রাকৃতিক গ্যাস প্রধান কাঁচামাল হওয়ায়, উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখতে হলে সিইউএফএল- এর দৈনিক ৪১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দরকার। সিইউএফএল- এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের উৎপাদনে এখন পর্যন্ত গ্যাস সংকটের কোনো প্রভাব পড়েনি। তবে চলমান গ্যাস সংকট মোকাবিলায় সরকারিভাবে আমাদের রেশনিংয়ের মাধ্যমে কারখানা সচল রাখতে বলা হয়েছে। কিন্তু, আমরা এখনও রেশনিং শুরু করিনি’। ‘আমাদের বর্তমান উৎপাদন দৈনিক ১,১৫০ থেকে ১,২০০ মেট্রিক টন, রেশনিং শুরু হলে তা প্রায় ১,০০০ মেট্রিক টনে নেমে দাঁড়াবে’- যোগ করেন তিনি। এদিকে শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লি. এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘আমরা গত অর্থবছরে ৪ লাখ ২৩ হাজার টন সার উৎপাদন করেছি। এবছর আরও বেশি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এ ধারাবাহিকতায় আমরা এখনও উৎপাদন করে যাচ্ছি। এখনও কোনো সংকট হয়নি’। সরকারি তথ্যানুসারে, চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬৭ লাখ টন রাসায়নিক সারের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে শুধু ইউরিয়ার চাহিদাই আছে ২৬ লাখ টন। দেশের চারটি কারখানায় সাড়ে ১০ লাখ মেট্রিক টনের মত ইউরিয়া উৎপাদন হচ্ছে। অর্থাৎ, বাকি ১৬ লাখ মেট্রিক টন আমদানি করতে হবে। আমদানিও ব্যয়বহুল হবে কারণ বিশ্বব্যাপী সার উৎপাদনকারীরা একই ধরনের গ্যাস সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে এবং দাম বাড়াচ্ছে। সস্তায় রাশিয়ান গ্যাস সরবরাহের উপর নির্ভরশীল কিছু ইউরোপীয় সার প্রস্তুতকারক এমনকি গ্যাসের অভাবে উৎপাদন বন্ধ করতেও বাধ্য হয়েছিল। গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি ভারতে সার উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে এবং সেখানে খারিপ ফসলকে হুমকির মুখে ফেলছে। ভারতের কৃষি ভর্তুকি বেড়েছে এবং গত বছরের দামে সারের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা সরকারের জন্য একটি বড় উদ্বেগ বলে জানাচ্ছে সেদেশের গণমাধ্যমের প্রতিবেদন। ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশগুলোর জন্য একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি গত এপ্রিলে তাদের একটি ব্লগপোস্টে জানায়, সারের দাম বৃদ্ধি এবং প্রাপ্যতা নিয়ে উদ্বেগ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলিতে দীর্ঘ সময়ের জন্য ভবিষ্যতের ফসল এবং খাদ্য নিরাপত্তার উপর ছায়া ফেলবে। বাংলাদেশের মতো দেশে সারে উচ্চ ভর্তুকি ব্যবস্থা কৃষকদের দামের ধাক্কা থেকে মুক্তি দিতে পারে, কিন্তু এতে বাজেটের উপর প্রচণ্ড আর্থিক চাপ সৃষ্টি হবে বলেও সেখানে সতর্ক করা হয়েছে। সরকার আগে যেখানে সারে ভর্তুকি দিত ৮-৯ হাজার কোটি টাকা, সেখানে গত অর্থবছর আমদানিতে ২৮ হাজার কোটি টাকা খরচের কথা জানিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। সারের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় গত অর্থবছরের মে পর্যন্ত ১১ মাসে বাংলাদেশকে ৪০০ কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করতে হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ২২৩ শতাংশ বেশি। খাদ্য উৎপাদনের চেষ্টা ব্যাহত: বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের সময়ে দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয় সরকার, যা এখন আসন্ন সার সংকটে হুমকির মধ্যে পড়েছে। আমদানির বড় দুই উৎস দেশ- রাশিয়া ও বেলারুশ থেকে সার আমদানি বন্ধ হয়ে গেছে। কানাডা, সৌদি আরব, চীন, মরক্কো, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তিউনিশিয়া-সহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানির ‍সুযোগ রয়েছে, কিন্তু এসব উৎসেও সারের দাম বেড়েছে। বাড়তি দামের চাপ পড়বে ইতোমধ্যে দৌদুল্যমান বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে। এদিকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সৌদি আরব, কাতার ও দুবাইয়ের সঙ্গে চুক্তি রয়েছে। যেখান থেকে নিয়মিত সার আমদানি করা হয়। বিসিআইসির পরিচালক (যুগ্মসচিব, বাণিজ্যিক) কাজী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এখন তিনটি কারখানা উৎপাদনে আছে। গ্যাসের কারণে একটা বন্ধ। তবে এগুলো নিয়ে আমরা আলোচনা করছি কীভাবে কারখানাগুলো চালু রাখা যায়। আমরা যেসব দেশ থেকে ইউরিয়া আমদানি করি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। কথা বলে রাখছি, প্রয়োজন হলে যাতে দ্রুত আমদানি করা যায়।’বালাই কৃষ্ণ হাজারা, কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সার ব্যবস্থাপনা ও উপকরণ ইউনিট) বলেন, বলেন, ‘ইউরিয়ার চাহিদা আমাদের ২৬ লাখ মেট্রিক টন, একইসঙ্গে এক বছরের জন্য নিরাপত্তা মজুদ রাখতে হয় ৮ লাখ টন। সবমিলে ইউরিয়া লাগে ৩৪ লাখ টন। ডিসেম্বর পর্যন্ত আমাদের ইউরিয়ার কোনো ঘাটতি নেই। অর্থাৎ, আমন মৌসুমে সংকট নেই। তবে যদি এই অবস্থা চলতে থাকলে এর পরে গিয়ে সংকটের সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান তিনি। ‘তবে তারা (কারখানাগুলি) আমাদের কথা দিয়েছে, যেভাবেই হোক তারা সারের যোগান ঠিক রাখবে। আমন মৌসুমে সাড়ে সাত লাখ টন ইউরিয়া সারের প্রয়োজন হবে। এরপর আসবে সবচেয়ে বড় ফসল- বোরো উৎপাদনের মৌসুম, তখন মোট সার সরবরাহের ৬০ শতাংশ ব্যবহারের চাহিদা থাকবে।