দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে নওগাঁ, জয়পুরহাট ও দিনাজপুর জেলার বিভিন্ন এলাকায় গভীর রাতে বাড়িতে প্রবেশ করে নারীদের ওপর ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা আন্তজেলা সিরিয়াল অপরাধী গোলাম মোরশেদ ওরফে মোরশেদ আলমকে (২৭) গ্রেপ্তার করেছে নওগাঁ জেলা পুলিশ। প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং আন্তঃজেলা সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে তাকে শনাক্ত করা হয়। পরে ১০ জুন ভোরে গাজীপুর মহানগরীর বাসন থানার শরিফপুর কোনাপাড়া এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি দিবাগত রাতে নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলার নানাইচ ও জাহানপুর গ্রামে একাধিক বাড়িতে প্রবেশ করে হামলা চালায় এক দুর্বৃত্ত। এ সময় স্থানীয় বাসিন্দা হাসান আলীর কলেজপড়ুয়া মেয়ে উম্মে হাবিবার ঘরে ঢুকে তার মাথায় টিউবওয়েলের হাতল দিয়ে আঘাত করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলে পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। একই রাতে আরও দুটি বাড়িতে অনুরূপ হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ধামইরহাট থানায় হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলা দায়ের করা হয়।
এরপর ৭ ফেব্রুয়ারি ধামইরহাট উপজেলার জাহানপুর গ্রামে শাহিন ইসলামের বাড়িতে প্রবেশ করে তার স্ত্রী সুলতানা বেগমকে মাথায় আঘাত করে গুরুতর জখম করা হয়। একই রাতে আরও কয়েকটি বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে। ধারাবাহিক এসব ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিলে নওগাঁ জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে স্থানীয়দের আশ্বস্ত করেন।
এরই ধারাবাহিকতায় ৭ মে গভীর রাতে বদলগাছী উপজেলার দুর্গাপুর, ঘোয়ালভিটা ও নয়নশহর এলাকায় তিনটি পৃথক বাড়িতে হামলা চালানো হয়। এতে শাহানাজ (২২), নাসরিন (১৩) ও বাকপ্রতিবন্ধী বৃষ্টি (২০) গুরুতর আহত হন। তাদের মাথায় ভোঁতা বস্তু দিয়ে আঘাত করা হয় বলে তদন্তে জানা যায়। এ ঘটনায় বদলগাছী থানায় মামলা দায়ের করা হয়।
পরবর্তীতে ৪ জুন মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত পত্নীতলা উপজেলার শিমুলিয়া ও নান্দাশ গ্রামে আরও দুটি বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে। এ সময় রোজি আক্তার (৩৭), আলতা বানু (৪৫) ও তার মেয়ে আসমা খাতুন (২২)-কে লোহার শাবল ও ভোঁতা অস্ত্র দিয়ে মাথায় আঘাত করে গুরুতর জখম করা হয়। এসব ঘটনায় পুরো জেলায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
একই ধরনের হামলার ঘটনা নওগাঁর পাশাপাশি জয়পুরহাট ও দিনাজপুর জেলার বিভিন্ন এলাকাতেও ঘটেছে বলে তথ্য পায় পুলিশ। বিভিন্ন জেলার ঘটনার ধরন, সময়, ভিকটিম নির্বাচন এবং হামলার কৌশল বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা ধারণা করেন, একই ব্যক্তি এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।
ঘটনাগুলোর গুরুত্ব বিবেচনায় নওগাঁ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) জয়ব্রত পালের নেতৃত্বে একটি বিশেষ তদন্ত টিম গঠন করা হয়। টিমে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি), সাইবার ইউনিট, বিশেষ শাখা এবং সংশ্লিষ্ট সার্কেল কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
তদন্তকালে তথ্যপ্রযুক্তি, সাইবার ট্র্যাকিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে একাধিক ঘটনার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মিল খুঁজে পান তদন্তকারীরা। দীর্ঘ অনুসন্ধানের একপর্যায়ে দিনাজপুর জেলার বিরামপুর উপজেলার পাতহাট গ্রামের বাসিন্দা গোলাম মোরশেদ ওরফে মোরশেদ আলমকে শনাক্ত করা হয়।পরে নওগাঁ জেলা পুলিশের একটি বিশেষ দল জয়পুরহাট, দিনাজপুর ও গাজীপুরে একাধিক অভিযান পরিচালনা করে। সর্বশেষ ১০ জুন ভোর সাড়ে ৬টার দিকে গাজীপুর মহানগরীর বাসন থানার শরিফপুর কোনাপাড়া এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারের পর জেলা গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) তাকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তিনি ধামইরহাটে উম্মে হাবিবার ওপর হামলার কথা স্বীকার করেন। পুলিশ জানায়, আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতেও তিনি ওই ঘটনার দায় স্বীকার করেছেন।এছাড়া ধামইরহাট, বদলগাছী ও পত্নীতলা উপজেলায় সংঘটিত অন্তত আটটি বাড়িতে নারীদের ওপর হামলার ঘটনার সঙ্গেও নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, অভিযুক্ত বিভিন্ন জেলায় অন্তত ১৭ থেকে ১৮ জনের ওপর হামলা চালিয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নওগাঁ জেলার পাশাপাশি দিনাজপুর জেলার বিভিন্ন থানায় সংঘটিত অন্তত পাঁচটি এবং জয়পুরহাট জেলার একটি অনুরূপ ঘটনার সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। এসব ঘটনায় দুই নারীর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। বিষয়গুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ তদন্ত অব্যাহত রেখেছে।নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, “একটি ঘটনার সূত্র ধরে ধারাবাহিকভাবে তদন্ত পরিচালনা করে নওগাঁ জেলা পুলিশ এই আন্তজেলা সিরিয়াল অপরাধীকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং বিভিন্ন জেলার পুলিশের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এই সাফল্য অর্জিত হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “জয়পুরহাট ও দিনাজপুর জেলার সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি মামলায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ দমনে নওগাঁ জেলা পুলিশ সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থানে রয়েছে।”
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এ ঘটনায় নওগাঁ জেলার বিভিন্ন থানায় হত্যা মামলাসহ মোট চারটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। পাশাপাশি জয়পুরহাট ও দিনাজপুরে সংঘটিত অনুরূপ ঘটনাগুলোর সঙ্গেও অভিযুক্তের সম্পৃক্ততা যাচাই করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে এ বিষয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
ডিএস./



















