টানা কয়েক দিনের অতিবৃষ্টিতে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা ভয়াবহ জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে। পৌরসভাসহ উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের বিভিন্ন নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে গিয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরসমান পানি জমে থাকায় সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়িতে পানি প্রবেশ করেছে। একই সঙ্গে পাহাড়ঘেঁষা এলাকাগুলোতে ভূমিধসের ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় উপজেলা প্রশাসন সতর্কতা জারি করেছে।
উপজেলা সদর ও সীতাকুণ্ড পৌরসভার নামার বাজার, কলেজ রোড, থানা রোডসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে পানি জমে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীরা চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। অনেক এলাকায় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মসজিদ এবং ঘরের ভেতরে পানি ডুকে আসবাবপত্র, খাদ্যসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় মালামাল নষ্ট হয়েছে। বাজার এলাকায় দোকানপাটে পানি ঢুকে ব্যবসায়ীদেরও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে।
এদিকে উপজেলার সৈয়দপুর, সোনাইছড়ি, ভাটিয়ারী, কুমিরা, বাড়বকুণ্ড, বারৈয়াঢালা, মুরাদপুর, বাঁশবাড়িয়া ও সলিমপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে পানি জমে বসতবাড়ি ও স্থানীয় সড়ক তলিয়ে গেছে। অনেক এলাকায় ড্রেন ও খাল দিয়ে পানি দ্রুত নিষ্কাশন না হওয়ায় জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকার বাজার, অলিগলি ও সংযোগ সড়ক পানিতে ডুবে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। অনেক স্থানে রিকশা ও মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী এবং শ্রমজীবী মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।
এদিকে অতিবৃষ্টির কারণে কৃষিজমি ও সবজিক্ষেত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন। মাছের ঘের ও পুকুর উপচে মাছ বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
জলাবদ্ধতার কারণে শুধু চলাচল নয়, জনস্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ সময় জমে থাকা পানিতে ময়লা-আবর্জনা মিশে পরিবেশ দূষিত হয়। এতে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয় এবং মশার উপদ্রব বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
স্থানীয়রা জানান, বৃষ্টির পানি জমে থাকার পাশাপাশি যদি নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা না করা হয়, তাহলে বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্ক মানুষদের জন্য অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে একই চিত্র দেখা গেলেও স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল ও নালা দখল এবং নিয়মিত পরিষ্কার না করায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারছে না। ফলে অল্প সময়ের ভারী বর্ষণেই বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে।
বারৈয়াঢালা ইউনিয়নের বাসিন্দা সৈকত বলেন, “সারারাত বৃষ্টির পর সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি ঘরের ভেতরে পানি। শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে চরম কষ্টে আছি।”
সীতাকুণ্ড পৌর এলাকার ব্যবসায়ী জসিম বলেন, “দোকানে পানি ঢুকে অনেক মালামাল নষ্ট হয়েছে। কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই ব্যবসা বন্ধ রাখতে হয়েছে।”
সৈয়দপুর ইউনিয়নের কৃষক কামরুল হাসান বলেন, “সবজি ক্ষেত পানির নিচে চলে গেছে। দ্রুত পানি না নামলে পুরো ফসল নষ্ট হয়ে যাবে।”
এদিকে টানা বর্ষণে উপজেলার পাহাড়ঘেঁষা এলাকাগুলোতে ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়েছে। এরই মধ্যে গতকাল বুধবার জঙ্গল সলিমপুর ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের খেজুরতলা সংলগ্ন সমাজবাগান বাড়ি এলাকায় পাহাড় ধসে মাটি চাপা পড়ে আশরাফুল ইসলাম তানভীর (১০ মাস) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই ঘটনায় আহত হয়েছেন তার মা লামিয়া বেগম। এরই মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের সতর্ক থাকতে এবং নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় অপ্রয়োজনে যাতায়াত না করারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে দুর্ভোগে ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয়রা বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ছাড়া এ সমস্যার সমাধান হবে না। খাল-নালা পুনঃখনন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত উদ্যোগ কামনা করেছেন তারা।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সীতাকুণ্ডের জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল-নালা পুনঃখনন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের বিকল্প নেই। অন্যথায় প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে একই দুর্ভোগে পড়তে হবে সাধারণ মানুষকে।
আবহাওয়া সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, আগামী কয়েক দিনও বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাই অপ্রয়োজনে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় যাতায়াত না করার পাশাপাশি পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের বিশেষ সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ ফখরুল ইসলাম বলেন, ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ার পর থেকেই গত তিন দিন ধরে বিভিন্ন এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সেই সাথে ভূমিধসের আশঙ্কায় পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে। বর্তমানে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে।
ডিএস./





















