০৫:৫৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
পানিবন্দী কয়েক হাজার মানুষ

টানা বৃষ্টিতে চরফ্যাশনে দুর্ভোগ, বিপর্যস্ত জনজীবন

মৌসুমি নিম্নচাপ ও মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে টানা ৬ দিনের ভারী বৃষ্টিতে চরফ্যাশনের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিপাকে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষরা। শনিবারও ভোর থেকে সূর্যের দেখা মেলেনি। দিনভর বৃষ্টি ছিল। জীবন ও জীবিকার তাগিদে বৃষ্টি উপেক্ষা করেই ঘর থেকে বের হয়েছেন মানুষ।

ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ৪ থানা—চরফ্যাশন, শশীভূষণ, দুলারহাট ও দক্ষিণ আইচা এলাকার ২১টি ইউনিয়নের মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর তীরবর্তী গ্রামগুলোতে জোয়ারের পানি ঢুকে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। তলিয়ে গেছে আমনের বীজতলা, বিভিন্ন সবজিক্ষেত ও মাছের ঘের। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ, কৃষক ও মৎস্যচাষীরা।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। অনেক কাঁচা রাস্তা কাদাময় হয়ে পড়ায় শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষ ও রোগীদের চলাচলে বেড়েছো দুর্ভোগ। বসতবাড়ির আঙিনায় পানি জমে থাকায় ভোগান্তিতে রয়েছেন নিম্নআয়ের পরিবারগুলো।

কৃষকেরা জানান, অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে আমনের বীজতলা ও সবজিক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। দীর্ঘদিন পানি জমে থাকলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। একইভাবে মাছের ঘেরে বৃষ্টির পানি প্রবেশ করায় মাছ ভেসে বেরিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

চর মানিকা ইউনিয়নের কৃষক হালিম বলেন, টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে আমার আমনের বীজতলা ও বিভিন্ন সবজির ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। বিশেষ করে শশা, করলা ও কাঁচামরিচের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এভাবে বৃষ্টি চলতে থাকলে আরও বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে।

চর মাদ্রাজ ইউনিয়নের মৎস্যচাষী মোহাম্মদ ফোরকান বলেন, গত সাত বছর ধরে মাছ চাষ করছি। কিন্তু এবারের মতো এমন বিপর্যয়ের মুখে কখনো পড়িনি। ভারী বৃষ্টিতে আমার তিনটি মাছের খামার পানির নিচে তলিয়ে গেছে। খামার থেকে প্রায় ৮ থেকে ৯ লাখ টাকার মাছ ভেসে বেরিয়ে গেছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাজমুল হুদা জানান, জমিতে পানি জমে থাকায় ১ হাজার ২১০ হেক্টর জমির শাকসবজি এবং ১৭০ হেক্টর জমির আমন ধানের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, টানা ভারী বর্ষণে চরফ্যাশন উপজেলায় প্রাথমিকভাবে ২ হাজার ৩৬০ জন মৎস্যচাষী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। উপজেলার ৩ হাজার ৬৭১টি ছোট-বড় মৎস্য খামার, যার মোট আয়তন প্রায় ২১৮ হেক্টর, পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় ২৭২ মেট্রিক টন মাছ ও পোনা ভেসে গেছে। প্রাথমিক হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ ও হালনাগাদের কাজ চলমান রয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুমানা আফরোজ বলেন, উপজেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। যেসব এলাকায় বৃষ্টির পানি জমেছিল, সেসব স্থানে ধীরে ধীরে পানি নেমে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে টানা বর্ষণে কৃষক ও মৎস্যচাষীরা কিছুটা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তাদের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি মূল্যায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোথাও জলাবদ্ধতা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা দ্রুত নিশ্চিত করা হবে।”

তিনি আরও জানান, উপজেলার বেতুয়া থেকে হাজারীগঞ্জ পর্যন্ত বেড়িবাঁধের ঢালে বসবাসরত ছিন্নমূল ও অসহায় পরিবারের মধ্যে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চাল ডাল লবণ চিনি তেল হলুদ মরিচ ও জিরার গুঁড়া বিতরণ করা হয়েছে। এ সময় তিনি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্দশার কথা শোনেন এবং ভবিষ্যতে আরও সহায়তার আশ্বাস দেন। উপজেলা প্রশাসনের খাদ্য সহায়তা পেয়ে অসহায় মানুষদের মুখে স্বস্তির হাসি ফুটেছে।

তবে আবহাওয়া অনুকূলে না এলে এবং বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে কৃষি ও মৎস্য খাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত পানি নিষ্কাশন ও প্রয়োজনীয় সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।

ডিএস./

 

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ার বালুয়াকান্দিতে উদ্বোধন হল ন্যাচার লাউঞ্জ

পানিবন্দী কয়েক হাজার মানুষ

টানা বৃষ্টিতে চরফ্যাশনে দুর্ভোগ, বিপর্যস্ত জনজীবন

প্রকাশিত : ০৫:০২:২৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

মৌসুমি নিম্নচাপ ও মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে টানা ৬ দিনের ভারী বৃষ্টিতে চরফ্যাশনের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিপাকে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষরা। শনিবারও ভোর থেকে সূর্যের দেখা মেলেনি। দিনভর বৃষ্টি ছিল। জীবন ও জীবিকার তাগিদে বৃষ্টি উপেক্ষা করেই ঘর থেকে বের হয়েছেন মানুষ।

ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ৪ থানা—চরফ্যাশন, শশীভূষণ, দুলারহাট ও দক্ষিণ আইচা এলাকার ২১টি ইউনিয়নের মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর তীরবর্তী গ্রামগুলোতে জোয়ারের পানি ঢুকে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। তলিয়ে গেছে আমনের বীজতলা, বিভিন্ন সবজিক্ষেত ও মাছের ঘের। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ, কৃষক ও মৎস্যচাষীরা।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। অনেক কাঁচা রাস্তা কাদাময় হয়ে পড়ায় শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষ ও রোগীদের চলাচলে বেড়েছো দুর্ভোগ। বসতবাড়ির আঙিনায় পানি জমে থাকায় ভোগান্তিতে রয়েছেন নিম্নআয়ের পরিবারগুলো।

কৃষকেরা জানান, অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে আমনের বীজতলা ও সবজিক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। দীর্ঘদিন পানি জমে থাকলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। একইভাবে মাছের ঘেরে বৃষ্টির পানি প্রবেশ করায় মাছ ভেসে বেরিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

চর মানিকা ইউনিয়নের কৃষক হালিম বলেন, টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে আমার আমনের বীজতলা ও বিভিন্ন সবজির ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। বিশেষ করে শশা, করলা ও কাঁচামরিচের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এভাবে বৃষ্টি চলতে থাকলে আরও বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে।

চর মাদ্রাজ ইউনিয়নের মৎস্যচাষী মোহাম্মদ ফোরকান বলেন, গত সাত বছর ধরে মাছ চাষ করছি। কিন্তু এবারের মতো এমন বিপর্যয়ের মুখে কখনো পড়িনি। ভারী বৃষ্টিতে আমার তিনটি মাছের খামার পানির নিচে তলিয়ে গেছে। খামার থেকে প্রায় ৮ থেকে ৯ লাখ টাকার মাছ ভেসে বেরিয়ে গেছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাজমুল হুদা জানান, জমিতে পানি জমে থাকায় ১ হাজার ২১০ হেক্টর জমির শাকসবজি এবং ১৭০ হেক্টর জমির আমন ধানের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, টানা ভারী বর্ষণে চরফ্যাশন উপজেলায় প্রাথমিকভাবে ২ হাজার ৩৬০ জন মৎস্যচাষী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। উপজেলার ৩ হাজার ৬৭১টি ছোট-বড় মৎস্য খামার, যার মোট আয়তন প্রায় ২১৮ হেক্টর, পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় ২৭২ মেট্রিক টন মাছ ও পোনা ভেসে গেছে। প্রাথমিক হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ ও হালনাগাদের কাজ চলমান রয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুমানা আফরোজ বলেন, উপজেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। যেসব এলাকায় বৃষ্টির পানি জমেছিল, সেসব স্থানে ধীরে ধীরে পানি নেমে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে টানা বর্ষণে কৃষক ও মৎস্যচাষীরা কিছুটা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তাদের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি মূল্যায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোথাও জলাবদ্ধতা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা দ্রুত নিশ্চিত করা হবে।”

তিনি আরও জানান, উপজেলার বেতুয়া থেকে হাজারীগঞ্জ পর্যন্ত বেড়িবাঁধের ঢালে বসবাসরত ছিন্নমূল ও অসহায় পরিবারের মধ্যে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চাল ডাল লবণ চিনি তেল হলুদ মরিচ ও জিরার গুঁড়া বিতরণ করা হয়েছে। এ সময় তিনি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্দশার কথা শোনেন এবং ভবিষ্যতে আরও সহায়তার আশ্বাস দেন। উপজেলা প্রশাসনের খাদ্য সহায়তা পেয়ে অসহায় মানুষদের মুখে স্বস্তির হাসি ফুটেছে।

তবে আবহাওয়া অনুকূলে না এলে এবং বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে কৃষি ও মৎস্য খাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত পানি নিষ্কাশন ও প্রয়োজনীয় সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।

ডিএস./