‘দিন যায় কথা থাকে’, আমার এ দুটি চোখ পাথর তো নয়’, ‘পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেই’, ‘আমি বৃষ্টির কাছ থেকে কাঁদতে শিখেছি’র মত বহু গান শ্রোতার হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবে। অর্ধশতকের সংগীত জীবনে বাংলা গানের ভুবনে উল্লেখিত এমন অনেক জনপ্রিয় গান উপহার দিয়ে চিরবিদায় নিলেন কণ্ঠশিল্পী সুবীর নন্দী।
সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এই শিল্পীকে বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা।
৬৬ বছর বয়সী এই শিল্পী দীর্ঘদিন ধরে কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন। নিয়মিতভাবে তার ডায়ালাইসিস করতে হত। এর মধ্যে হৃদরোগে আক্রান্ত হলে গত ১৪ এপ্রিল তাকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচে) ভর্তি করা হয়। ১৮ দিন পর তাকে নেওয়া হয় সিঙ্গাপুরে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটের সমন্বয়ক সামন্ত লাল সেন বলেন, “সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে আইসিইউতে থাকা অবস্থায় তার ফের হার্ট অ্যাটাক হয়। তাকে চারটি রিংও পড়ানো হয়েছিল। কিন্তু আজ ভোরে সব শেষ হয়ে গেল।”
এই শিল্পীর মৃত্যুর খবর পৌঁছানোর পর দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। একুশে পদকপ্রাপ্ত ও দেশ বরেণ্য জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পীর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।
মঙ্গলবার রাষ্ট্রপতি এক শোকবার্তায় প্রয়াত শিল্পী সুবীর নন্দীর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন। পাশাপাশি শিল্পীর শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের জন্য গভীর সমবেদনা জানান।
সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ এক বিবৃতিতে সুবীর নন্দীর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেন।
বরেণ্য সংগীতশিল্পী সুবীর নন্দীর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী।
এক শোকবাণীতে স্পিকার বলেন, সুবীর নন্দী ছিলেন সংগীতজগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের সংগীতজগতের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হলো।
স্পিকার সুবীর নন্দীর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা ও তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।
সুবীর নন্দীর মৃত্যুতে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া এবং চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
২০১৯ সালের ২০ ফ্রেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে একুশে পদক নেন সুবীর নন্দী ২০১৯ সালের ২০ ফ্রেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে একুশে পদক নেন সুবীর নন্দী ১৯৫৩ সালের ১৯ নভেম্বর হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলার নন্দীপাড়ায় সুবীর নন্দীর জন্ম। বাবার চাকরি সূত্রে তার শৈশব কেটেছে চা বাগানে। পরিণত বয়সে গানের পাশাপাশি চাকরি করেন ব্যাংকে।
প্রাইমারিতে পড়ার সময় মা পুতুল রানীর কাছে সংগীতের হাতেখড়ির পর ওস্তাদ বাবর আলী খানের কাছে শাস্ত্রীয় সংগীতে তালিম নেন সুবীর নন্দী। সিলেট বেতারে তিনি প্রথম গান করেন ১৯৬৭ সালে।
এরপর ঢাকা রেডিওতে সুযোগ পান ১৯৭০ সালে। রেডিওতে তার প্রথম গান ‘যদি কেউ ধূপ জ্বেলে দেয়’। বেতার থেকে টেলিভিশন, তারপর চলচ্চিত্রে গেয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় গান।
১৯৭৬ সালে আব্দুস সামাদ পরিচালিত ‘সূর্যগ্রহণ’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্লেব্যাকে আসেন সুবীর । ১৯৭৮ সালে মুক্তি পায় আজিজুর রহমান অশিক্ষিত। সেই সিনেমায় সাবিনা ইয়াসমিন আর সুবীর নন্দীর কণ্ঠে ‘মাস্টার সাব আমি নাম দস্তখত শিখতে চাই’ গানটি তুমুল জনপ্রিয়তা পায়।
ধীরে ধীরে তার কণ্ঠের রোমান্টিক আধুনিক গান ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মুখে মুখে। এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি।
‘আশা ছিল মনে মনে’, ‘হাজার মনের কাছে প্রশ্ন রেখে’, ‘বন্ধু তোর বরাত নিয়া’, ‘তুমি এমনই জাল পেতেছ’, ‘বন্ধু হতে চেয়ে তোমার’, ‘কতো যে তোমাকে বেসেছি ভালো’, ‘পাহাড়ের কান্না দেখে’, ‘কেন ভালোবাসা হারিয়ে যায়’, একটা ছিল সোনার কইন্যা’, ‘ও আমার উড়াল পঙ্খীরে’র মত গানগুলো সুবীর নন্দীকে পৌঁছে দিয়েছে ভক্ত-শ্রোতাদের হৃদয়ে।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে আড়াই হাজারের বেশি গানে কণ্ঠ দেয়া সুবীর নন্দী চারবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও চারবার বাচসাচ পুরস্কার পেয়েছেন। সংগীতে অবদানের জন্য এ বছরই তাকে একুশে পদকে ভূষিত করে সরকার।
তার প্রথম একক অ্যালবাম ‘সুবীর নন্দীর গান’ বাজারে আসে ১৯৮১ সালে। ‘প্রেম বলে কিছু নেই’, ‘ভালোবাসা কখনো মরে না’, সুরের ভুবনে, ‘গানের সুরে আমায় পাবে’ ছাড়াও ‘প্রণামাঞ্জলী’ নামে একটি ভক্তিমূলক গানের অ্যালবাম রয়েছে তার।
বিবি/জেজে


























