গত বছরের শুরুর দিকে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হলে বিশ্বব্যাপী ধীরে ধীরে কমতে থাকে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিধি। বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও তার প্রভাব পড়ে। ওই বছরের মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হলে অবস্থা আরও জটিল হয়। সরকার দীর্ঘ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করলে স্থবিরতা নেমে আসে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে। বিশেষ করে রফতানির প্রধান খাত তৈরি পোশাকশিল্প পড়ে নিদারুণ বিপদে। হাতছাড়া হতে থাকে ক্রয়াদেশ। তবে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে এগোতে থাকেন পোশাকশিল্প সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। এখন করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে যখন দেশের সার্বিক পরিস্থিতি টালমাটাল, তখনও ভরসা যোগাচ্ছে সেই পোশাকশিল্প। এই শিল্পের পণ্যের ওপর ভর করে এগিয়ে যাচ্ছে দেশের রফতানিখাত।
আর পোশাকশিল্পে নতুন করে বাংলাদেশের সামনে সুযোগ দেখা দিয়েছে পার্শ্ববর্তী দুই দেশের বিরুপ পরিস্থিতি। একদিকে মিয়ানমারের গভীরতর রাজনৈতিক সঙ্কট এবং ভারতের মারাত্মক করোনাভাইরাস পরিস্থিতি। যা আন্তর্জাতিক খুচরা বিক্রেতাদের এবং ব্র্যান্ডগুলিকে সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের স্থিতিশীলতা এবং এর প্রভাবে বাংলাদেশে কাজের আদেশ বাড়ার সম্ভাবনা বা সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলিতে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার বাড়ায় সরকার দেশজুড়ে পরিবহনসহ সর্বাত্মক লকডাউন দেয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে কিছু সীমাবদ্ধতা ছাড়া কঠোরভাবেই এটি বাস্তবায়ন করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। আর এরই ফলস্বরুপ বাংলাদেশ এখন ভারতসহ এ অঞ্চলের অনেক দেশের তুলনায় করোনা মহামারি থেকে অনেকটা ভালো পরিস্থিতিতে আছে। এছাড়া দীর্ঘদিন থেকে বিরাজমান রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক খুচরা বিক্রেতাদের এবং কম দামে পণ্য উৎপাদনের ব্র্যান্ডগুলোর জন্য নিরাপদ স্থানে পরিণত হয়েছে।
এদিকে গত ১ ফেব্রুয়ারি সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ দখল করার পর থেকে মিয়ানমারজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ চলছে। নির্বাচিত নেতা অং সান সু চি এবং তার দলের সদস্যরা আটক রয়েছেন। শিশুসহ অনেক মানুষ নিহত হয়েছেন। অপরদিকে ভারতে, করোনা মহামারি একটি ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতিতে পৌঁছেছে। ভারতের হাসপাতাল এবং শ্মশানগুলি লাশে ভরে গেছে। অক্সিজেন ও ওষুধের ব্যাপক সংকট দেখা দিয়েছে। এর পরিস্থিতিতে চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিলের মধ্যে প্রতিবেশী দেশ দুটি তৈরি পোশাকের কার্যাদেশ বাংলাদেশে স্থানান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজেএমইএ বলছে, গত বছরের মার্চ থেকে পরবর্তী কয়েক মাসে হাতছাড়া হয় প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ক্রয়াদেশ। নতুন অর্থবছরে ইতিবাচক ধারায় ফিরতে শুরু করেছে দেশের পোশাক রফতানি। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে ২ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি হয়েছে। বিশেষ করে পোশাক খাতের বড় বাজার পশ্চিমা দেশেগুলো করোনা কাটিয়ে কিছুটা স্বচ্ছন্দে ফেরার প্রভাব ছিল মার্চ মাসে। যা এপ্রিল মাসে আরও বেড়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় রফতানি পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া এপ্রিল মাসেও অব্যাহত ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় অর্থনীতি পুনরায় খোলার কারণে এপ্রিলের রফতানি আয় গতবছরের এপ্রিলের তুলনায় ৬ গুণ বেড়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয় হয়েছে বাংলাদেশের।
এদিকে ধীরে ধূরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় অর্থনীতি করোনার প্রভাব কাটিয়ে অনেকটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। এসব দেশের খুচরা বিক্রেতা এবং ব্র্যান্ডগুলো খুলে যাওয়ায় গত মার্চ মাস থেকে ওই সব দেশে বেড়েছে পোশাক রফতানি।
করোনার মধ্যে দেশের রফতানির প্রবৃদ্ধি ভালোই হচ্ছে বলে মনে করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য সচিব ড. মো. জাফর উদ্দিন বলেন, করোনার মধ্যেও আমরা রফতানিতে ভালো করছি। মার্চ মাসেও প্রায় সাড়ে ১২ শতাংশের মতো রফতানি প্রবৃদ্ধি ছিল। তিনি বলেন, লকডাউন চললেও কলকারখানাগুলো খোলা আছে। এর ফলে চলমান করোনা পরিস্থিতিতে রফতানি আয়ে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা কম।
ড. জাফর উদ্দিন বলেন, তৈরি পোশাকের প্রচুর অর্ডার আছে। মায়ানমারে সহিংস পরিস্থিতি এবং ভারতে করোনার মারাত্মক প্রভাবের কারণে ওদের অনেক অর্ডার বাংলাদেশে আসছে। আশা করি সামনে রফতানি আয় আরও বাড়বে।
করোনার মধ্যে রফতানির এ ধরনের প্রবৃদ্ধিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তৈরি পোশাকশিল্প উদ্যোক্তা এবং বিকেএমইএর পরিচালক ফজলে শামীম এহসান। তিনি বলেন, খারাপ সময়ের মধ্যে আমরা সামান্য হলেও ভালো করছি। এটা ইতিবাচক।
করোনায় নিট পোশাকের রফতানি বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, করোনায় মানুষ ঘরবন্দি। আর বাসায় পরার পোশাকগুলো সাধারণত নিটের তৈরি। অফিস আদালত না হওয়ায় মানুষ ক্যাজুয়াল ড্রেস পরে বের হচ্ছে। এ ড্রেসগুলো সাধারণত নিটেরই। সারাবিশ্বে এ ধরনের পোশাকের চাহিদা বাড়ায় আমাদের তৈরি পোশাক তুলনামূলক ভালো করছে। ফজলে শামীম এহসান বলেন, চলতি বছরে রফতানি আয় গত বছরের তুলনায় বাড়বে। ২০২১ সাল আগের বছর থেকে কিছুটা ভালো যাচ্ছে। সেই হিসাবে রফতানি আয় বাড়বে। বিকেএমইএ’র এই পরিচালক বলেন, খারাপ সময়ে আমাদের রফতানি ভালো করছে। তবে পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য মানুষ বিপদ বা মহামারির সময় বেশি কেনে। খাবারের পরই দরকার হয় পোশাকের, সে কারণেই হয়তো তৈরি পোশাক একটা অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে এই কঠিন সময়ে।
০৯:৫৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম :
রফতানিতে বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনা
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - প্রকাশিত : ১২:০১:৫৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ মে ২০২১
- 59
ট্যাগ :
জনপ্রিয়




















