‘রাখিব নিরাপদ, দেখাব আলোর পথ’- কেন্দ্রীয় কারাফটকের সামনে প্রদর্শিত এই স্লোগানটি এখন শুধু কাগজে কলমে নয়, চলছে বাস্তবে রূপ দেয়ার চেষ্টাও। দেশের ৬৮টি কারাগারকে সংশোধনাগারে রূপ দিতে আন্তরিকভাবে কাজ করছে সরকার। তারই অংশ হিসেবে ৩৯টি ট্রেডে বন্দিদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলে আসছে। সেই প্রশিক্ষণের উৎপাদিত পণ্য বিক্রির টাকায় স্বাবলম্বী হচ্ছেন বন্দি শ্রমিকরা। তবে কারাগারের রোজগারে সবার অংশগ্রহণ নেই। যারা শুধু সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত, তারাই এই রোজগার করতে পারছেন। রোজগারের অর্ধেক টাকা সরকারি কোষাগারে আর বাকি অর্ধেক পাচ্ছেন বন্দি শ্রমিকরা। সাজাভোগ শেষে কারাবন্দিদের দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষে কারাগারগুলোতে হস্তশিল্পের পাশাপাশি ডিজিটাল প্রিন্টিং, পাওয়ারলুম, চামড়াজাত দ্রব্য তৈরি, টাইলস লেইং, প্লাম্বার, হাউজহোল্ড ইলেকট্রিক ওয়ারিং, ফ্রিজ ও এয়ারকন্ডিশনার মেরামত, মহিলা বন্দিদের জন্য বিউটিফিকেশন, গার্মেন্টস পণ্য, রেডিমেড পোশাক, জামদানি তৈরিসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু আছে। সেই প্রশিক্ষণের উৎপাদিত পণ্য গেল তিন বছর ধরে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় বাংলাদেশ জেল কর্তৃপক্ষের ‘কারা পণ্য‘ স্টলে প্রদর্শিত হচ্ছে। পরম মমতা আর যত্নে বোনা বেতের মোড়া কিংবা শোপিস আকৃষ্ট করবে যে কাউকেই। একে তো আগ্রহ অন্যদিকে নিখুঁত ডিজাইনের দেশীয় এসব পণ্য দেখতেও বাণিজ্য মেলায় ভিড় করে ক্রেতা-দর্শনার্থীরা। কয়েদিদের তৈরি পণ্য গুণে-মানে উন্নত হওয়ায় বেচাকেনাও ভালো হয়। কারাবন্দিদের তৈরি পণ্যসামগ্রীর মধ্যে রয়েছে- কাঠের তৈরি চেয়ার, বেতের চেয়ার, বাঁশের চেয়ার, টেবিল, মোড়া, খাবারের ঢাকনা, ব্যাগ, পাটের ব্যাগ, পাটের ফাইল, ভ্যানিটি ব্যাগ, চায়ের টেবিল, আলমারি, ড্রেসিং টেবিল, পুঁতির তৈরি মানিব্যাগ, জুতা, বিছানার চাদর, কাপড়, পাপোশ, টি-শার্ট ও নকশি কাঁথা। শুধু তা-ই নয়, হস্তশিল্পের মধ্যে রয়েছে- পুঁতিদানার ব্যাগ, পার্স ব্যাগ, ফুলদানি, টিস্যু বক্স, শোপিসসহ বিভিন্ন উপহারসামগ্রী। এসব কারাপণ্য তৈরিতে কাজ করছেন দেশের প্রায় ৩০ হাজার সশ্রম দণ্ডপ্রাপ্ত কারাবন্দি। এতে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখছেন কয়েদিরা। এ বিষয়ে কারা মহাপরিদর্শক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল মো. মোমিনুর রহমান মামুন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায় কারাগার এখন আর কারাগার নয়, একটা সংশোধনাগার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষিত এই বন্দিরা যখন মুক্তি পাবেন, তখন যেন তারা সমাজের মূল ধারার সঙ্গে পুনর্বাসিত হতে পারেন সেই প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। বাংলাদেশ জেল কর্তৃপক্ষ বলছে, কয়েদিরা যাতে জেল থেকে বেরিয়ে স্বাবলম্বী হয়ে জীবনযাপন করতে পারেন, সে লক্ষেই তাদের হাতের কাজ শেখানো হয়। দেশের প্রত্যেকটি জেলখানায় বিভিন্ন অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত কয়েদিরা তৈরি করছেন জামদানি শাড়ি ও তৈরি পোশাকসহ নানা পণ্য। এসব পণ্য তৈরির মাধ্যমে পরিবারকে আর্থিক সহায়তা করছেন তারা। পাশাপাশি জেল থেকে বেরিয়ে স্বাবলম্বী জীবনযাপন করারও স্বপ্ন দেখেন তারা। বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে কেউ আছেন যাবজ্জীবন দণ্ড মাথায় নিয়ে। দীর্ঘ কারা জীবনে এসব বন্দি এখন বনে গেছেন নানা কাজের কাজিতে। তারা বলছেন, সাজা যখন হয়েছে জেল তো খাটতেই হবে। দীর্ঘ কারাবাসে কাজের মধ্যে থেকে বিষণ্ণতা যেমন দূর হচ্ছে তেমনি টাকাও আয় হচ্ছে। এটি তাদের জন্য বাড়তি পাওয়া। বন্দিরা আরও বলেন, আগে কারাগারে বন্দিদের দিয়ে যেমন কাজ করানো হতো, এখনও করানো হয়। তবে অতীত এবং বর্তমানের মধ্যে পার্থক্য হলো- আগে কাজ করালেও দেয়া হতো না কোনো টাকা। আর বর্তমানে কাজ করালে টাকা দেয়া হয়। কারা কর্তৃপক্ষের এমন উদ্যোগে খুশি বন্দিরা। স্বজনদের বিচ্ছেদের কষ্টের মধ্যে কারা কর্তৃপক্ষের নানা উদ্যোগে কিছুটা হলেও স্বস্তি পান বলে জানান তারা। কারাবন্দি মো. মিলন (২৪)। হত্যা ও অপহরণ মামলায় ৪৫ বছরের সাজাপ্রাপ্ত তিনি। বছর দুয়েক আগে গ্রেফতার হয়ে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২ এ আছেন। কয়েক মাস শুয়ে-বসে সময় পার করেছেন। বছর দেড়েক ধরে তিনি কাজ করছেন বেকারিতে। পাশাপাশি কাজের বিনিময়ে যে টাকা পান, তা দিয়ে ভালো-মন্দ কিনতে পারছেন আবার বাড়িতেও টাকা পাঠাচ্ছেন। একই কথা বললেন কাগজ বাঁধাইয়ের কাজে জড়িত এক বন্দি। তিনি বিডিআর বিদ্রোহ মামলার আসামি। ১১ বছর ধরে জেল খাটছেন। যদিও তিনি ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত। তবে আইনি জটিলতায় এখনও কারাগারে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই বন্দি জানান, কারাগারে আসার পর কাগজ বাঁধাইয়ের কাজ করছেন। কাজে মনোযোগী হওয়ায় সাজার মেয়াদ কীভাবে পার হয়েছে তিনি বুঝতেই পারেননি। তিনি বলেন, আগে বাড়ি থেকে টাকা আনা লাগতো, তবে গেল কয়েক বছর টাকা আনতে হয় না। এই দুই বন্দির মতো অনেকেই কারাগারে কাজের মাধ্যমে টাকা আয় করছেন। স্ত্রী হত্যায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত মো. মিজান। ১৮ বছর ধরে কাশিমপুর কারাগারেই আছেন। এখন রান্নার কাজে সময় কাটছে তার। নিজেকে বাবুর্চি হিসেবেই গড়ে তুলেছেন। তিনি বলেন, আমার ৩০ বছরের সাজা। তবে ২২-২৩ বছর খাটলে সরকার ৫৬৯ ধারায় হয়তো মুক্তি দেবে। মুক্ত জীবনে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা করব ভাবছি। কারণ, কারাগারে থেকে সব ধরনের রান্না শিখেছি। এটা খুব কাজে দেবে। গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এর সিনিয়র জেল সুপার মো. আবদুল জলিল বলেন, গেল এক বছরে এই কারাগারের কারখানাগুলোতে ২২ লাখ ৪৬ হাজার ৭৬ টাকার বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করেছেন বন্দিরা। যার লাভ এসেছে ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৬৯২ টাকা। অর্ধেক লভ্যাংশ ভাগ করে দেয়া হয়েছে বন্দি শ্রমিকদের। এই নিয়ম আগে ছিল না। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এটি করা হচ্ছে। লাভের টাকা বন্দিরা নিজস্ব চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাড়িতেও পৌঁছে দেয়। এটি কারাগারকে সংশোধনাগার হিসেবে রূপান্তরের একটি প্রচেষ্টা। শুধু কাশিমপুর কারাগারেই নয়, দেশের অন্যান্য বৃহৎ কারাগারগুলোতেও চালু হয়েছে এ নিয়ম। সেসব কারাগারেও প্রশিক্ষণ দেয়ার পাশাপাশি কীভাবে আলোর পথে ফিরতে পারবেন বন্দিরা, সেসব বিষয় নিয়ে কাজ করছে কারা কর্তৃপক্ষ। এদিকে প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদে কারাবন্দিদের জন্য ব্যতিক্রম আয়োজন ও বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা করেছিল কারা কর্তৃপক্ষ। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই বন্দিদের সঙ্গে স্বজনদের সাক্ষাৎ বন্ধ রয়েছে। তবে টাকা দিয়ে সপ্তাহে ১০ মিনিট স্বজনদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দিচ্ছে কারা কর্তৃপক্ষ। এবার ঈদ উপলক্ষে ৩ মিনিট বাড়িয়ে ১৩ মিনিট কথা বলার সুযোগ দেয়া হয়েছে। তবে বাড়তি ৩ মিনিট বিনামূল্যে কথা বলতে পেরেছেন বন্দিরা। ঢাকার কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মাহবুবুল ইসলাম বলেন, করোনার কারণে এবার জামাতে ঈদের নামাজ পড়তে পারেননি বন্দিরা। তবে নিজেদের সেলে পড়েছেন। ঈদের নামাজ শেষে বন্দিদের খেতে দেয়া হয়েছে পায়েস ও মুড়ি। দুপুরে ছিল পোলাও ভাত, মুরগি, গরুর মাংস, মিষ্টি, কোক ও পান-সুপারি। আর রাতে সাদা ভাত, আলুর দম ও রুই মাছ। করোনা মহামারি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ। এরই মধ্যে গত ১১ এপ্রিল চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে আবদুর রহমান নামে এক বন্দি করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। আর অন্যান্য কারাগারে এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে ৩৫ বন্দি। এর মধ্যে কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি বহুল আলোচিত গোলাম কিবরিয়া শামীমও (জি কে শামীম) করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। বুকের ব্যথা ও শ্বাসকষ্টের সমস্যা বেড়ে গেলে গত ৪ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) করোনা ইউনিটে ভর্তি করা হয়। উল্লেখ্য, ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের সময় ২০১৯ সালের ২০ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার হন জি কে শামীম। বিদেশি মদ ও বিপুল পরিমাণ নগদ টাকাসহ তাকে তার নিকেতনের বাসা থেকে গ্রেফতার করে র্যাব। এরপর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
০৪:৪৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম :
কারাগারের রোজগারে স্বাবলম্বী বন্দিরা
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - প্রকাশিত : ১২:০১:৩৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ মে ২০২১
- 55
ট্যাগ :
জনপ্রিয়




















