পূর্বের অর্থবছরগুলোর অসমাপ্ত প্রকল্পের চাপে পড়েছে আগামি ২০২১-২২ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি। গত ২০১৯-২০ অর্থবছরের সমাপ্তির জন্য নির্ধারিত প্রকল্প তালিকায় ছিল এমন ১৫টি প্রকল্প চলতি অর্থবছরেও শেষ না হওয়ায় আগামী অর্থবছরের এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে সমাপ্তির জন্য নির্ধারিত ৪৪১ প্রকল্পের ৫৭টি প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় আগামী অর্থবছরের এডিপিতে আবারও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে অর্থবছর শেষে এ সংখা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা রয়েছে। জানা গেছে, করোনা মহামারির কারণে চলতি অর্থবছরে ও গত অর্থবছরে অসমাপ্ত প্রকল্পের সংখ্যা পূর্বের তুলনায় বেড়েছে। পরিকল্পনা কমিশন বলছে, সীমিত অর্থায়নের ভিত্তি করে এডিপিতে প্রকল্প নেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয় না বলে মেয়াদের সঙ্গে সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয়ও বাড়ে। সমাপ্তির জন্য নির্ধারিত প্রকল্প সময়মতো শেষ করা গেলে এডিপির ওপর বরাদ্দের চাপও কমে। অন্যান্য চলমান প্রকল্পে পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হয়। নতুন নতুন প্রকল্পও নেওয়া যায় না। অন্যদিকে শেষ মুহূর্তে কাজ আটকে থাকায় প্রকল্পের সুফলও সময় মতো পাওয়া যায় না।এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, করোনাভাইরাসের কারণে ২০২০ সালের প্রথম দিকে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞরা আটকে পড়েছিলেন। পরে অনেকে ফিরে এসে কাজেও যোগ দিয়েছেন। এ মধ্যে পদ্মা সেতু, পদ্মা রেল সংযোগ, মেট্রোরেলের মতো বড় বড় প্রকল্পও রয়েছে। অন্যদিকে, যেসব প্রকল্পে বিদেশি বিশেষজ্ঞ নেই- এমন সমাপ্তির জন্য নির্ধারিত প্রকল্পও শেষ হচ্ছে না বলে জানান পরিকল্পনা কমিশনের কর্তকর্তারা। জানা গেছে, চট্টগ্রামের মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে ১৫০ মেগাওয়াট ডুয়েল ফুয়েল বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ কাজের বাস্তবায়ন মেয়াদ এক বছর বাড়নোর পর ২০২০ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। এ কারণে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) সমাপ্তির জন্য নির্ধারিত প্রকল্প তালিকায় রাখা হয়। কিন্তু ওই সময় প্রকল্পের কাজ শতভাগ শেষ না হওয়ায় চলতি অর্থবছরের (২০২০-২১) এডিপিতেও সমাপ্তির জন্য নির্ধারিত প্রকল্পের তালিকায় রাখা হয় এটি। কিন্তু এ প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি এবং উৎপাদনেও যেতে পারেনি প্রকল্পটি। ফলে আগামী অর্থবছরের (২০২১-২২) এডিপিতেও প্রকল্পটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এমন ১৫টি প্রকল্প চলতি অর্থবছরেও শেষ না হওয়ায় আগামী অর্থবছরের এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বোচ্চ চারটি প্রকল্প রয়েছে। প্রকল্পগুলো হলো- শহীদ এম. মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণ, শেখ সায়েরা খাতুন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ইউনিভার্সেল নার্সিং ইনস্টিটিউট স্থাপন এবং সেফ মাদারহুড প্রোমোশন অপারেশনস রিসার্চ অন সেইফ মাদারহুড অ্যান্ড নিউবর্ন সার্ভাইভাল প্রজেক্ট। সংশ্লিষ্টারা জানান, এ প্রকল্পগুলো গত বছরই শেষ হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু হয়নি। সময়মতো কাজ শেষ হলে এসব প্রকল্প মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা আরও সম্প্রসারণ হতো এবং কোভিড পরিস্থিতিতে জনভোগান্তি অনেকাংশে কমানো যেত। স্বাস্থ্য খাতের এসব প্রকল্প ছাড়াও বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডে (বিআরডিবি), ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ বেতারের দুটি প্রকল্প রয়েছে। একটি করে প্রকল্প রয়েছে বিআরপাওয়ার জেন, বিআইডব্লিউটিএ, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড, মহিলা বিষক অধিদপ্তর এবং শ্রম অধিদপ্তরের।
চলতি অর্থবছরের এডিপিতে সমাপ্তির জন্য নির্ধারিত প্রকল্প তালিকায় ছিল, কিন্তু শেষ হয়নি- এ তালিকায়ও সবচেয়ে বেশি প্রকল্প স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের। এ মধ্যে চারটি আগের অর্থবছরে শেষ হওয়ার কথা ছিল। আর চলতি অর্থবছরের দুটি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও হয়নি। ফলে মোট ছয়টি প্রকল্প আগামী অর্থবছরের এডিপিতে আবারও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
এ তালিকায় রয়েছে বিআরডিবি, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন, কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের তিনটি করে প্রকল্প। এছাড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, বাংলাদেশ বেতার, শ্রম অধিদপ্তর, বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন, বিআইডব্লিউটিএ’র দুটি করে প্রকল্প রয়েছে এ তালিকায়। একটি করে প্রকল্প রয়েছে বেশ কিছু বাস্তবায়নকারী সংস্থার। সংশ্লিষ্টরা জানান, সমাপ্তের জন্য নির্ধারিত প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ার প্রবণতা ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। এদিকে আগামী অর্থবছরে এডিপিতে ৩৫৬টি প্রকল্প সমাপ্তির জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত কয়টা প্রকল্প শেষ হবে তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। কারণ এখন কোভিড পরিস্থিতির কারণে ছোট একটি অংশের কারণেও অনেক সময় প্রকল্পের কাজ শেষ করা যাচ্ছে না। আবার অনেকে প্রকল্প পরিচালক করোনা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েও প্রকল্পের কাজ শেষ করছেন না। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে সমাপ্তির জন্য নির্ধারিত প্রকল্প ছিল ৩০৫টি। এর মধ্যে ১৬৪টি প্রকল্প ওই অর্থবছরে শেষ হয়নি। ১৪১ প্রকল্প শেষ হলেও এর মধ্যে অনেক প্রকল্পের কাজ শেষ না করেই সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে ৩৪৬ প্রকল্প ২০১৯ সালের জুনের মধ্যে সমাপ্তির জন্য নির্ধারিত ছিল। এর মধ্যে ২৪৫টি প্রকল্পের সমাপ্ত ঘোষণা হয়েছে। এর মধ্যে অনেক প্রকল্পের কাজই শতভাগ শেষ না করে প্রকল্প সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়ছে। সমাপ্ত হয়নি ১০১টি প্রকল্প। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের সমাপ্তির জন্য নির্ধারিত ছিল ২৯২ প্রকল্প। সমাপ্ত ঘোষণা হয়েছে ১৮৮টি। বাকি প্রকল্পগুলো পরের অর্থবছরের এডিপিতে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ১০৪ প্রকল্পের শেষ কাজ শেষ হয়নি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে নির্ধারিত ৩১৫ প্রকল্পের মধ্যে সমাপ্ত হয়েছে ২৪৩টি। বাকিগুলো সমাপ্ত না হওয়ায় পরের বছর এডিপিতে যোগ হয়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের ২৮১ প্রকল্পের মধ্যে সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে ২০৩টি। ওই অর্থবছর ৭৮ প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত হয়নি। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের ২৫২ প্রকল্পের ৩২ প্রকল্প সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়নি।
পরিকল্পনা বিভাগের সচিব জয়নুল বারী বলেন, সমাপ্তির জন্য নির্ধারিত প্রকল্পে চাহিদা অনুযায়ী এডিপিতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়। সক্ষমতার অভাবে অনেক সময় কাজ শেষ হয় না। এ ধরনের প্রকল্প কাজ দ্রুত শেষ করতে নানা ধরনের নির্দেশনাও দেওয়া হয়। তারপরও বাস্তবায়ন সংস্থাগুলো বছর পর বছর কাজ শেষ করছে না। এ সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। তবে এ বিষয়ে এবার আরও কঠোর হচ্ছে সরকার। ইতোমধ্যে বলে দেওয়া হয়েছে, সমাপ্তের জন্য নির্ধারিত প্রকল্পের মেয়াদও ব্যয় কোনো অবস্থায় বাড়ানো হবে না।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, একটি প্রকল্প সময়মতো শেষ করা গেলে এর থেকে অনেক সুফল পাওয়া যায়। কম অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায়। প্রকল্প বাস্তবায়ন সময় যত দীর্ঘ হবে, বাস্তবায়ন ব্যয়ও তত বাড়ে। সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলে এর সুফল পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। তিনি বলেন, বাস্তবায়ন কাজে বিলম্বের জন্য প্রকল্প পরিচালকদের শাস্তির আওতায় আনা উচিত। আবার যেসব প্রকল্প সময়মতো কাজ করতে পারবে, তাদের জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা রাখাত হবে। তাহলে তারা কাজে উৎসাহী হবেন এবং সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করবেন।
০৯:৩৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম :
এডিপি’তে অসমাপ্ত প্রকল্পের চাপ
-
সাইফুল ইসলাম মাসুম - প্রকাশিত : ১২:০১:৩৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৬ মে ২০২১
- 72
ট্যাগ :
জনপ্রিয়




















