০৭:৪০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬

ব্যাংকার ও খেলাপিদের যোগসাজশে আড়াই গুণ বাড়লো ঋণ অবলোপন

করোনা মহামারির বছরে দেশের ব্যাংক খাতে আড়াই গুণ বাড়লো ঋণ অবলোপন। আইনের শিথিলতার সুযোগ নিয়ে ব্যাংকগুলো বিপুল অংকের খেলাপি ঋণ অবলোপন করেছে। ২০২০ সালে অবলোপনের মাধ্যমে ৬ হাজার ৫৯০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ ব্যাংকের ব্যালেন্স শিট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এই অঙ্ক আগের বছরের তুলনায় আড়াই গুণ বেশি। ২০১৯ সালে অবলোপনের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা। কিন্তু অবলোপন করা ঋণ থেকে আদায় নেই বললেই চলে; আদায়ের হার এক শতাংশের নিচে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য পাওয়া গেছে। এদিকে খেলাপি ঋণ অবলোপনের পাশাপাশি নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখার জন্যেও অতিরিক্ত সময় পাচ্ছে ব্যাংকগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২০ সালের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) অবলোপন থেকে আদায়ের হার মাত্র শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশ। দ্বিতীয় প্রান্তিকে শূন্য দশমিক ১১ শতাংশ, তৃতীয় প্রান্তিকে শূন্য দশমিক ২৭ শতাংশ এবং চতুর্থ প্রান্তিকে আদায়ের হার ছিল ১ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। এরপরেও নতুন করে অত্যাধিক ঋণ অবলোপনকে আত্মঘাতী হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। মন্দ বা ক্ষতিকর মানের খেলাপি ঋণকে স্থিতিপত্র (ব্যালান্সশিট) থেকে বাদ দেওয়াকে ঋণ অবলোপন বলা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, ২০০৩ সাল থেকে ব্যাংকগুলো ঋণ অবলোপন করে আসছে। ঋণখেলাপি মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় ওই সময় ব্যাংকের স্থিতিপত্র ঠিক রাখতে অবলোপনের নীতিমালা জারি হয়। অবলোপন হওয়া মানে ঋণ মাফ হয়ে যাওয়া নয়, এই ঋণ গ্রাহককে পরিশোধ করতে হয়। এতে সুবিধা হলো গ্রাহক নিজে খেলাপি হয় না আবার ব্যাংকও খেলাপি গ্রাহকের সংখ্যা কম দেখাতে পারে। তবে অভিযোগ আছে, এই অবলোপন পদ্ধতির ফায়দা নিচ্ছে অনেক গ্রাহক। তারা পরে ঠিকমতো ঋণ পরিশোধ করছেন না। ২০১৯ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি অবলোপন সংক্রান্ত নতুন নীতিমালা জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সেই নিয়ম অনুযায়ী, এখন থেকে ৩ বছর হলেই মন্দমানের (কু-ঋণ) খেলাপি ঋণ অবলোপন করতে পারবে ব্যাংকগুলো। আগে ৫ বছর না হলে খেলাপি ঋণ অবলোপন করা যেত না। এছাড়া ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত খেলাপি ঋণ মামলা ছাড়াই অবলোপন করার সুযোগ ছিল; এখন তা বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে। মূলত কাগজে-কলমে খেলাপি কম দেখাতে এ সুবিধা নিচ্ছে ব্যাংকগুলো। এতে আড়াল হয়ে যাচ্ছে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে সবচেয়ে বেশি ঋণ অবলোপন করা হয়েছে বেসরকারি ব্যাংকগুলোয়। এসব ব্যাংকে পাঁচ হাজার ১৮৬ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ অবলোপন করা হয়। যা ব্যাংক খাতের মোট অবলোপনের ৭৮ দশমিক ৬৯ শতাংশ। সরকারি ব্যাংকগুলো অবলোপন করে ১ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২০ দশমিক ৭৮ শতাংশ। বিশেষায়িত ও বিদেশি ব্যাংকগুলো বাকি ৩৩ কোটি টাকা অবলোপন করে। ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর পুঞ্জীভূত অবলোপনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৬ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে কিছু অর্থ আদায়ের পর স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৪৪ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা। অবলোপন করা ঋণের মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর স্থিতির পরিমাণ ১৭ হাজার ৪৮৩ কোটি টাকা। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর স্থিতি ২৫ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা। বিশেষায়িত ব্যাংকে ১ হাজার ৩৬ কোটি টাকা এবং বিদেশি ব্যাংকগুলোয় স্থিতির পরিমাণ ৩৭৫ কোটি টাকা।

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

ব্যাংকার ও খেলাপিদের যোগসাজশে আড়াই গুণ বাড়লো ঋণ অবলোপন

প্রকাশিত : ১২:০১:৩১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ মে ২০২১

করোনা মহামারির বছরে দেশের ব্যাংক খাতে আড়াই গুণ বাড়লো ঋণ অবলোপন। আইনের শিথিলতার সুযোগ নিয়ে ব্যাংকগুলো বিপুল অংকের খেলাপি ঋণ অবলোপন করেছে। ২০২০ সালে অবলোপনের মাধ্যমে ৬ হাজার ৫৯০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ ব্যাংকের ব্যালেন্স শিট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এই অঙ্ক আগের বছরের তুলনায় আড়াই গুণ বেশি। ২০১৯ সালে অবলোপনের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা। কিন্তু অবলোপন করা ঋণ থেকে আদায় নেই বললেই চলে; আদায়ের হার এক শতাংশের নিচে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য পাওয়া গেছে। এদিকে খেলাপি ঋণ অবলোপনের পাশাপাশি নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখার জন্যেও অতিরিক্ত সময় পাচ্ছে ব্যাংকগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২০ সালের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) অবলোপন থেকে আদায়ের হার মাত্র শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশ। দ্বিতীয় প্রান্তিকে শূন্য দশমিক ১১ শতাংশ, তৃতীয় প্রান্তিকে শূন্য দশমিক ২৭ শতাংশ এবং চতুর্থ প্রান্তিকে আদায়ের হার ছিল ১ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। এরপরেও নতুন করে অত্যাধিক ঋণ অবলোপনকে আত্মঘাতী হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। মন্দ বা ক্ষতিকর মানের খেলাপি ঋণকে স্থিতিপত্র (ব্যালান্সশিট) থেকে বাদ দেওয়াকে ঋণ অবলোপন বলা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, ২০০৩ সাল থেকে ব্যাংকগুলো ঋণ অবলোপন করে আসছে। ঋণখেলাপি মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় ওই সময় ব্যাংকের স্থিতিপত্র ঠিক রাখতে অবলোপনের নীতিমালা জারি হয়। অবলোপন হওয়া মানে ঋণ মাফ হয়ে যাওয়া নয়, এই ঋণ গ্রাহককে পরিশোধ করতে হয়। এতে সুবিধা হলো গ্রাহক নিজে খেলাপি হয় না আবার ব্যাংকও খেলাপি গ্রাহকের সংখ্যা কম দেখাতে পারে। তবে অভিযোগ আছে, এই অবলোপন পদ্ধতির ফায়দা নিচ্ছে অনেক গ্রাহক। তারা পরে ঠিকমতো ঋণ পরিশোধ করছেন না। ২০১৯ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি অবলোপন সংক্রান্ত নতুন নীতিমালা জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সেই নিয়ম অনুযায়ী, এখন থেকে ৩ বছর হলেই মন্দমানের (কু-ঋণ) খেলাপি ঋণ অবলোপন করতে পারবে ব্যাংকগুলো। আগে ৫ বছর না হলে খেলাপি ঋণ অবলোপন করা যেত না। এছাড়া ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত খেলাপি ঋণ মামলা ছাড়াই অবলোপন করার সুযোগ ছিল; এখন তা বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে। মূলত কাগজে-কলমে খেলাপি কম দেখাতে এ সুবিধা নিচ্ছে ব্যাংকগুলো। এতে আড়াল হয়ে যাচ্ছে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে সবচেয়ে বেশি ঋণ অবলোপন করা হয়েছে বেসরকারি ব্যাংকগুলোয়। এসব ব্যাংকে পাঁচ হাজার ১৮৬ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ অবলোপন করা হয়। যা ব্যাংক খাতের মোট অবলোপনের ৭৮ দশমিক ৬৯ শতাংশ। সরকারি ব্যাংকগুলো অবলোপন করে ১ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২০ দশমিক ৭৮ শতাংশ। বিশেষায়িত ও বিদেশি ব্যাংকগুলো বাকি ৩৩ কোটি টাকা অবলোপন করে। ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর পুঞ্জীভূত অবলোপনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৬ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে কিছু অর্থ আদায়ের পর স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৪৪ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা। অবলোপন করা ঋণের মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর স্থিতির পরিমাণ ১৭ হাজার ৪৮৩ কোটি টাকা। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর স্থিতি ২৫ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা। বিশেষায়িত ব্যাংকে ১ হাজার ৩৬ কোটি টাকা এবং বিদেশি ব্যাংকগুলোয় স্থিতির পরিমাণ ৩৭৫ কোটি টাকা।