০১:৪২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬

সবাইকে স্বস্তি দিলেন অর্থমন্ত্রী

বৃহস্পতিবার সংসদে আগামি অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। করোনা মহামারির ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে দেয়া দেশের ৫০তম এই বাজেটে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে স্বস্তি দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কর ও ভ্যাটে অনেকটা ছাড় দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে নেওয়া হয়েছে বেশ কিছু পদক্ষেপ। এতে ব্যবসায়ী ও স্থানীয় শিল্প উদ্যোক্তারা একরকম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন। এছাড়া সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টির নানা উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি আছে নারীদের জন্যও সুখবর। বিগত বছরগুলোতে বাজেট পেশ হওয়ার পর বিভিন্ন পক্ষের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দিলেও এবারের বাজেট নিয়ে প্রায় সবাই উচ্ছ্বসিত। সবার মধ্যে একটা স্বস্তি স্বস্তি ভাব আছে। মহামারি করোনার এই সময়ে সরকার যে বাজেট উপস্থাপন করেছে, তার প্রতিক্রিয়ায় উদ্যোক্তারা যা বলছেন অর্থনীতিবিদরাও প্রায় একই কথা বলছেন। বাজেট তৈরির সময় থেকেই বিভিন্ন পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিলো, করোনা মোকাবিলার পাশাপাশি কর্মসংস্থানকে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবাসায়ী নেতৃবৃন্দ বাজেট প্রতিক্রিয়ায় একই সুরে বলেছেন, বাজেট বাস্তবায়ন হলে সেটা কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখবে। তারা এবারের বাজেটকে শিল্পবান্ধব বলছেন। বাজেট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিভিন্ন ধরনের বড় ছাড় দেওয়া হয়েছে। করপোরেট কর কমানো হয়েছে আড়াই শতাংশ। কয়েকটি খাতে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। কিছু খাতে বাড়ানো হয়েছে ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদ। এছাড়া শিল্পের যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির শুল্ক কমানো হয়েছে। কিছু খাতে কমানো হয়েছে আগাম কর। ফলে দেশীয় শিল্প বাড়তি সুবিধা পাবে। শিল্পের খরচ কমায় বাড়বে বিনিয়োগ। এবারের বাজেট বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিশিষ্ট উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার ড. আতিউর রহমান বলেন, “আমরা মনে করি এবারের বাজেটটি দুই দিক থেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ। কোভিড মহামারির অভিঘাত থেকে উত্তরণের একটি ফ্রেমওয়ার্ক এই বাজেটে আছে যেটা গত বাজেট থেকেই শুরু হয়েছিল। একই সঙ্গে বাজেটটি ব্যবসা বান্ধব হয়েছে। ব্যবসায়ীদের অনেক দিনে দাবি ছিল ট্যাক্স, এআইটি, ভ্যাট, শুল্ক সহজ করা; এবার এই দাবি বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্যও ভালো বার্তা রয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষার ওপর খুব জোর দেওয়া হয়েছে। সরকারের সবগুলো বিভাগ মিলে ১ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকার সামাজিক সুরক্ষা দেয়ার চেষ্টা করছে। কৃষি-অকৃষি সব ক্ষেত্রেই কিছু না কিছু সুবিধা রয়েছে। তবে স্বাস্থ্যখাত নিয়ে আমাদের খানিকটা রিজার্ভেশন আছে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর সুযোগ ছিল। সম্ভবত স্বাস্থ্য খাতের সক্ষমতার অভাবেই সেটা হয়নি। যেটা আমরা আশা করছি, বড় বড় প্রকল্পগুলো দ্রুত শেষ করার জন্য হয়তো বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। শিক্ষা খাতেও বরাদ্দ যথেষ্ট বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এগুলোর বাস্তবায়নটাই মুখ্য বিষয়।” গত কয়েক বছর ধরে অটোমোবাইল শিল্প নিয়ে নীতি প্রণয়নে সেভাবে মনোযোগ ছিল না সরকারের। এবার ঠিক তার বিপরীতটাই হয়েছে। অটোমোবাইল-থ্রি হুইলার ও ফোর-হুইলার উৎপাদনকারী কোম্পানিকে শর্ত সাপেক্ষে ১০ বছর মেয়াদে কর অব্যাহতি এবং আরও কিছু শর্ত সাপেক্ষে আরও ১০ বছরের কর অব্যাহতি প্রদানের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। মোটরগাড়ি উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা আরও পাঁচ বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে এই শিল্পের জন্য এটা বড় পাওয়া। অর্থাৎ গাড়ি উৎপাদনে ২০ বছরের কর অবকাশ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে করোনার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকার উৎপাদনমুখী শিল্প খাতের কোম্পানিগুলোর কর ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব ইতিবাচক। কোনও কোনও খাতে আগাম কর কমানো হয়েছে। ভারী শিল্প খাতে করভার নিয়ে করোনার সময় অস্বস্তি ছিল। বাজেটে কর ভার কিছুটা হলেও কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে, এটা করোনার এই সময়ে স্বস্তি দেবে। অন্যদিকে প্রস্তাবিত বাজেটে দেশীয় শিল্পের সুরক্ষার জন্য আমদানিতে কর বাড়ানো হয়েছে। এটাকে খুবই ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও দেশিয় উদ্যোক্তারা। কারণ, দেশীয় উৎপাদকদের অনেক সময় আমদানি পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পড়তে হয়। সে ক্ষেত্রে শুল্ক-কর বাড়িয়ে দেশীয় খাতকে সুরক্ষা দিতে হয়। এবার বাজেটে তারই প্রতিফলন হয়েছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে দেশে বৃহৎ শিল্পের বিকাশ এবং আমদানির বিকল্প শিল্প উৎপাদনকে ত্বরান্বিত করার স্বার্থে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যেই বাংলাদেশে অটোমোবাইল-থ্রি হুইলার এবং ফোর হুইলার উৎপাদনকারী কোম্পানিকে শর্ত সাপেক্ষে ২০ বছর পর্যন্ত কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। বেশ কিছু হোম অ্যাপ্লায়েন্সেস ও কিচেন অ্যাপ্লায়েন্সেস পণ্য এবং হালকা প্রকৌশল শিল্পের পণ্যের উৎপাদনকারী কোম্পানিকেও শর্ত সাপেক্ষে ১০ বছর মেয়াদি কর অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। অর্থাৎ ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা রয়েছে বাজেটে। এই দশ বছরের কর অব্যাহতির সুবিধা নেওয়ার জন্য দেশে শত শত শিল্প-কারখানা গড়ে উঠতে পারে। এর বাইরে আগামী অর্থবছরে করপোরেট কর ৩০ শতাংশ প্রস্তাব করা হয়েছে। যা চলতি অর্থবছরে সাড়ে ৩২ শতাংশ। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ২২ শতাংশ এবং একক ব্যক্তি কোম্পানির করহার সাড়ে ৩২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশের প্রস্তাব করা হয়েছে। ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে ব্যক্তি করদাতাদের ব্যবসায়িক টার্নওভার করহার শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কৃষিভিত্তিক শিল্পে বেশ কিছু ছাড় দেওয়া হয়েছে। শর্ত সাপেক্ষে দেশে উৎপাদিত সব ধরনের ফল শাক-সবজি প্রসেসিং শিল্প, দুধ ও দুগ্ধজাতপণ্য উৎপাদন, সম্পূর্ণ দেশীয় কৃষি থেকে শিশুখাদ্য উৎপাদনকারী শিল্প এবং কৃষিযন্ত্র উৎপাদনকারী শিল্পের জন্য ১০ বছরের করমুক্ত সুবিধার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়াও কৃষি আধুনিকীকরণের লক্ষ্যে কৃষি কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি আমদানিতে আগাম কর প্রত্যাহার করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে থ্রেসার মেশিন, পাওয়ার রিপার, পাওয়ার টিলার, অপারেটেড সিডার, কম্বাইন্ড হারভেস্টর, রোটারি টিলার, উইডার (নিড়ানি) ও উইনোয়ার (ঝাড়াইকল)। পাশাপাশি স্ক্র্যাপ ভেসেল; স্টিল শিল্পের ওয়েস্ট ও স্ক্র্যাপ, ফেরো অ্যালয়, স্পঞ্জ আয়রন; পিভিসি ও পেট রেজিন উৎপাদনে ব্যবহৃত ইথাইলিন গ্লাইকল, টেরেফথালিক অ্যাসিড, ইথাইলিন/প্রোপাইলিন আমদানি এবং উপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাজু বাদাম আমদানিতে আগাম কর প্রত্যাহার হয়েছে। সিমেন্ট উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে করহার ৩ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ এবং সিমেন্ট, লৌহ ও লৌহজাতীয় পণ্য সরবরাহের বিপরীতে উৎসে কর কর্তন ৩ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া দেশে শিল্পায়নে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে বেশ কিছু খাতের কর্মীদের পেশাগত প্রশিক্ষণ প্রদানে স্থাপিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে শর্ত সাপেক্ষে ১০ বছরের জন্য কর অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশে হোম অ্যাপ্লায়েন্স সামগ্রী এবং তথ্যপ্রযুক্তি পণ্যের উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে। এয়ারকন্ডিশনে ২০২৪ সাল ও রেফ্রিজারেটরে ২০২২ সাল পর্যন্ত উৎপাদনে ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। কৃষি আধুনিকীকরণের লক্ষ্যে কৃষি কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি আমদানিতে আগাম কর প্রত্যাহার করা হয়েছে। ইলেকট্রনিক শিল্পে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়ায় শিল্প স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। এখন দেশেই বিশ্বমানের এয়ারকন্ডিশন ও রেফ্রিজারেটর উৎপাদন হচ্ছে। এমনকি বিদেশি ব্র্যান্ডও দেশে কারখানা স্থাপন করেছে এবং অনেক ব্র্যান্ড পরিকল্পনা করছে। এ দুই খাতে বিপুল বিনিয়োগের কারণে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে। যে কারণে করোনা পরিস্থিতিতে দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, হোম অ্যাপ্লায়েন্স সামগ্রী উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে আগামী দুই বছরের জন্য ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ দেশীয় গৃহস্থালি কাজের জন্য দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্য বিশেষ করে ব্লেন্ডার, জুসার, মিক্সার, গ্রাইন্ডার, ইলেকট্রনিক কেটলি, রাইস কুকার, মাল্টি কুকার পেসার কুকারে স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট ছাড় দেওয়া হয়েছে। একই সুবিধা দেওয়া হয়েছে ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, ইলেকট্রনিক ওভেনের স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে। এছাড়া নারী উদ্যোক্তাদের করমুক্ত বার্ষিক টার্নওভার সীমা ৫০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ লাখ টাকা করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি ও কম্পিউটার শিল্পের বিকাশে প্রিন্টার, টোনার কার্টিজ, ইনকজেট কার্টিজ, কম্পিউটার প্রিন্টারের যন্ত্রাংশ, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, এআইও, ডেস্কটপ, নোটবুক, নোটপ্যাড, ট্যাব, সার্ভার, কিবোর্ড, মাউস, বারকোড ও কিউআর কোড স্ক্যানার, পিসিবিএ/মাদারবোর্ড, পাওয়ার ব্যাংক, রাউটার, নেটওয়ার্ক সুইচ, মডেম, নেটওয়ার্ক ডিভাইস/হাব, স্পিকার, সাউন্ড সিস্টেম, ইয়ারফোন, হেডফোন, এসএসডি/পোর্টেবল এসএসডি, হার্ডডিস্ক ড্রাইভ, পেনড্রাইভ, মাইক্রো এসডি কার্ড, ফ্ল্যাশ মেমোরি কার্ড, সিসিটিভি, মনিটর, প্রজেক্টর, প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড, ই-রাইটিং প্যাড, ইউএসবি ক্যাবল, ডিজিটাল ঘড়ি, বিভিন্ন প্রকাশ লোডেড পিসিবি উৎপাদনে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ১৬শ সিসি পর্যন্ত গাড়ি উৎপাদনে প্রয়োজনীয় উপকরণ ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে ভ্যাট অব্যাহতির সুবিধা ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে যন্ত্রাংশ আমদানিতে আগাম কর দিতে হয়। আগামী বাজেটে সেটিও বাতিল করা হচ্ছে। এছাড়া পলিপ্রোপাইলিন স্ট্যাপল ফাইবার, মোবাইল ফোন এবং স্যানিটারি ন্যাপকিন ও ডায়াপারের কাঁচামাল আমদানিতে ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদ ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে। শুধু ভারী শিল্প বা আইটি শিল্প নয়, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পকেও বাজটে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসাবে শর্তসাপেক্ষে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে প্রস্তুতকৃত যন্ত্রাংশ সরবরাহ পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। শর্ত হচ্ছে, দেশীর ভারী শিল্পকে যেসব যন্ত্রাংশ আমদানিতে ভ্যাট ও শুল্ক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, সেসব যন্ত্রাংশ লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাত উৎপাদনের পর তা সরবরাহ করলে ভ্যাট দিতে হবে না। অবশ্য এ জন্য প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট নিবন্ধিত হতে হবে এবং রিটার্ন জমা দিতে হবে। বিদ্যমান ভ্যাট আইনটি আরও ব্যবসাবান্ধব ও যুগোপযোগী করতে আমদানি পর্যায়ে ভ্যাটের আগাম করহার কমানো হয়েছে। ভ্যাট ফাঁকির জরিমানা ও সরল সুদ দুটোতেই ছাড় দেওয়া হয়েছে। আগাম কর হার ৪ শতাংশ থেকে এক শতাংশ কমিয়ে ৩ শতাংশ করা হয়েছে। বর্তমানে ভ্যাট ফাঁকির ক্ষেত্রে ফাঁকি দেওয়া ভ্যাটের দ্বিগুণ জরিমানা আরোপের বিধান রয়েছে। আগামী বাজেটে এটি কমিয়ে ভ্যাট ফাঁকির সমপরিমাণ জরিমানার বিধান করা হচ্ছে। এছাড়া সময়মতো ভ্যাট না দিলে ভ্যাট আইন অনুযায়ী মাসিক ২ শতাংশ হারে সরল সুদে জরিমানার বিধান রয়েছে। এটি বাজেটে এক শতাংশ করা হচ্ছে। তৃতীয় লিঙ্গ বা হিজড়াদের সমাজের মূলধারায় আনতে কিছুটা উদ্যোগ রয়েছে বাজেটে। কোনও প্রতিষ্ঠান মোট কর্মচারীর ১০ শতাংশ বা ১শ জনের বেশি তৃতীয় লিঙ্গের শ্রমিক নিয়োগ দিলে কর রেয়াত সুবিধার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ভ্যাট ছাড় দেওয়া হয়েছে স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদিত স্যানিটারি ন্যাপকিন, করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে কোভিড-১৯ টেস্ট কিট, পিপি, ভ্যাকসিন আমদানি, উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়েও। এছাড়া অটিজম সেবার কার্যক্রম এবং ও মেডিটেশন সেবার ওপর ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর সব ধরনের তামাক পণ্যের মূল্য বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রস্তাবিত বাজেটে দু’লাখ টাকা বা তার নিচে সঞ্চয়পত্র কিনতে টিআইএন লাগবে না এমন বিধানও রাখা হয়েছে। বিকাশ-নগদসহ মোবাইলফোনে আর্থিক সেবা করপোরেট কর বাড়ানো হয়েছে। পঞ্চাশ হাজার টাকার বেশি ব্যবসায়িক লেনদেন ব্যাংকে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কৃষি খাতে সরবরাহ চেইনকে প্রভাবিত করতে কৃষি ও অকৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ১৩০টি গ্রোথ সেন্টার তথা হাটবাজার উন্নয়ন করার পরিকল্পনা রয়েছে বাজেটে। এছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে প্রস্তাবিত বাজেটে। এবারই প্রথম দেশের ১৫০টি উপজেলার সব বয়স্কজন ও বিধবা নারীকে ভাতা দেওয়া হবে।

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

কুমিল্লায় শতাধিক মাল্টিমিডিয়া সংবাদকর্মীদের নিয়ে কর্মশালা অনুষ্ঠিত

সবাইকে স্বস্তি দিলেন অর্থমন্ত্রী

প্রকাশিত : ১২:০০:৪৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৫ জুন ২০২১

বৃহস্পতিবার সংসদে আগামি অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। করোনা মহামারির ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে দেয়া দেশের ৫০তম এই বাজেটে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে স্বস্তি দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কর ও ভ্যাটে অনেকটা ছাড় দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে নেওয়া হয়েছে বেশ কিছু পদক্ষেপ। এতে ব্যবসায়ী ও স্থানীয় শিল্প উদ্যোক্তারা একরকম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন। এছাড়া সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টির নানা উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি আছে নারীদের জন্যও সুখবর। বিগত বছরগুলোতে বাজেট পেশ হওয়ার পর বিভিন্ন পক্ষের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দিলেও এবারের বাজেট নিয়ে প্রায় সবাই উচ্ছ্বসিত। সবার মধ্যে একটা স্বস্তি স্বস্তি ভাব আছে। মহামারি করোনার এই সময়ে সরকার যে বাজেট উপস্থাপন করেছে, তার প্রতিক্রিয়ায় উদ্যোক্তারা যা বলছেন অর্থনীতিবিদরাও প্রায় একই কথা বলছেন। বাজেট তৈরির সময় থেকেই বিভিন্ন পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিলো, করোনা মোকাবিলার পাশাপাশি কর্মসংস্থানকে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবাসায়ী নেতৃবৃন্দ বাজেট প্রতিক্রিয়ায় একই সুরে বলেছেন, বাজেট বাস্তবায়ন হলে সেটা কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখবে। তারা এবারের বাজেটকে শিল্পবান্ধব বলছেন। বাজেট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিভিন্ন ধরনের বড় ছাড় দেওয়া হয়েছে। করপোরেট কর কমানো হয়েছে আড়াই শতাংশ। কয়েকটি খাতে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। কিছু খাতে বাড়ানো হয়েছে ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদ। এছাড়া শিল্পের যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির শুল্ক কমানো হয়েছে। কিছু খাতে কমানো হয়েছে আগাম কর। ফলে দেশীয় শিল্প বাড়তি সুবিধা পাবে। শিল্পের খরচ কমায় বাড়বে বিনিয়োগ। এবারের বাজেট বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিশিষ্ট উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার ড. আতিউর রহমান বলেন, “আমরা মনে করি এবারের বাজেটটি দুই দিক থেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ। কোভিড মহামারির অভিঘাত থেকে উত্তরণের একটি ফ্রেমওয়ার্ক এই বাজেটে আছে যেটা গত বাজেট থেকেই শুরু হয়েছিল। একই সঙ্গে বাজেটটি ব্যবসা বান্ধব হয়েছে। ব্যবসায়ীদের অনেক দিনে দাবি ছিল ট্যাক্স, এআইটি, ভ্যাট, শুল্ক সহজ করা; এবার এই দাবি বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্যও ভালো বার্তা রয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষার ওপর খুব জোর দেওয়া হয়েছে। সরকারের সবগুলো বিভাগ মিলে ১ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকার সামাজিক সুরক্ষা দেয়ার চেষ্টা করছে। কৃষি-অকৃষি সব ক্ষেত্রেই কিছু না কিছু সুবিধা রয়েছে। তবে স্বাস্থ্যখাত নিয়ে আমাদের খানিকটা রিজার্ভেশন আছে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর সুযোগ ছিল। সম্ভবত স্বাস্থ্য খাতের সক্ষমতার অভাবেই সেটা হয়নি। যেটা আমরা আশা করছি, বড় বড় প্রকল্পগুলো দ্রুত শেষ করার জন্য হয়তো বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। শিক্ষা খাতেও বরাদ্দ যথেষ্ট বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এগুলোর বাস্তবায়নটাই মুখ্য বিষয়।” গত কয়েক বছর ধরে অটোমোবাইল শিল্প নিয়ে নীতি প্রণয়নে সেভাবে মনোযোগ ছিল না সরকারের। এবার ঠিক তার বিপরীতটাই হয়েছে। অটোমোবাইল-থ্রি হুইলার ও ফোর-হুইলার উৎপাদনকারী কোম্পানিকে শর্ত সাপেক্ষে ১০ বছর মেয়াদে কর অব্যাহতি এবং আরও কিছু শর্ত সাপেক্ষে আরও ১০ বছরের কর অব্যাহতি প্রদানের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। মোটরগাড়ি উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা আরও পাঁচ বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে এই শিল্পের জন্য এটা বড় পাওয়া। অর্থাৎ গাড়ি উৎপাদনে ২০ বছরের কর অবকাশ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে করোনার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকার উৎপাদনমুখী শিল্প খাতের কোম্পানিগুলোর কর ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব ইতিবাচক। কোনও কোনও খাতে আগাম কর কমানো হয়েছে। ভারী শিল্প খাতে করভার নিয়ে করোনার সময় অস্বস্তি ছিল। বাজেটে কর ভার কিছুটা হলেও কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে, এটা করোনার এই সময়ে স্বস্তি দেবে। অন্যদিকে প্রস্তাবিত বাজেটে দেশীয় শিল্পের সুরক্ষার জন্য আমদানিতে কর বাড়ানো হয়েছে। এটাকে খুবই ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও দেশিয় উদ্যোক্তারা। কারণ, দেশীয় উৎপাদকদের অনেক সময় আমদানি পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পড়তে হয়। সে ক্ষেত্রে শুল্ক-কর বাড়িয়ে দেশীয় খাতকে সুরক্ষা দিতে হয়। এবার বাজেটে তারই প্রতিফলন হয়েছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে দেশে বৃহৎ শিল্পের বিকাশ এবং আমদানির বিকল্প শিল্প উৎপাদনকে ত্বরান্বিত করার স্বার্থে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যেই বাংলাদেশে অটোমোবাইল-থ্রি হুইলার এবং ফোর হুইলার উৎপাদনকারী কোম্পানিকে শর্ত সাপেক্ষে ২০ বছর পর্যন্ত কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। বেশ কিছু হোম অ্যাপ্লায়েন্সেস ও কিচেন অ্যাপ্লায়েন্সেস পণ্য এবং হালকা প্রকৌশল শিল্পের পণ্যের উৎপাদনকারী কোম্পানিকেও শর্ত সাপেক্ষে ১০ বছর মেয়াদি কর অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। অর্থাৎ ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা রয়েছে বাজেটে। এই দশ বছরের কর অব্যাহতির সুবিধা নেওয়ার জন্য দেশে শত শত শিল্প-কারখানা গড়ে উঠতে পারে। এর বাইরে আগামী অর্থবছরে করপোরেট কর ৩০ শতাংশ প্রস্তাব করা হয়েছে। যা চলতি অর্থবছরে সাড়ে ৩২ শতাংশ। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ২২ শতাংশ এবং একক ব্যক্তি কোম্পানির করহার সাড়ে ৩২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশের প্রস্তাব করা হয়েছে। ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে ব্যক্তি করদাতাদের ব্যবসায়িক টার্নওভার করহার শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কৃষিভিত্তিক শিল্পে বেশ কিছু ছাড় দেওয়া হয়েছে। শর্ত সাপেক্ষে দেশে উৎপাদিত সব ধরনের ফল শাক-সবজি প্রসেসিং শিল্প, দুধ ও দুগ্ধজাতপণ্য উৎপাদন, সম্পূর্ণ দেশীয় কৃষি থেকে শিশুখাদ্য উৎপাদনকারী শিল্প এবং কৃষিযন্ত্র উৎপাদনকারী শিল্পের জন্য ১০ বছরের করমুক্ত সুবিধার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়াও কৃষি আধুনিকীকরণের লক্ষ্যে কৃষি কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি আমদানিতে আগাম কর প্রত্যাহার করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে থ্রেসার মেশিন, পাওয়ার রিপার, পাওয়ার টিলার, অপারেটেড সিডার, কম্বাইন্ড হারভেস্টর, রোটারি টিলার, উইডার (নিড়ানি) ও উইনোয়ার (ঝাড়াইকল)। পাশাপাশি স্ক্র্যাপ ভেসেল; স্টিল শিল্পের ওয়েস্ট ও স্ক্র্যাপ, ফেরো অ্যালয়, স্পঞ্জ আয়রন; পিভিসি ও পেট রেজিন উৎপাদনে ব্যবহৃত ইথাইলিন গ্লাইকল, টেরেফথালিক অ্যাসিড, ইথাইলিন/প্রোপাইলিন আমদানি এবং উপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাজু বাদাম আমদানিতে আগাম কর প্রত্যাহার হয়েছে। সিমেন্ট উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে করহার ৩ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ এবং সিমেন্ট, লৌহ ও লৌহজাতীয় পণ্য সরবরাহের বিপরীতে উৎসে কর কর্তন ৩ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া দেশে শিল্পায়নে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে বেশ কিছু খাতের কর্মীদের পেশাগত প্রশিক্ষণ প্রদানে স্থাপিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে শর্ত সাপেক্ষে ১০ বছরের জন্য কর অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশে হোম অ্যাপ্লায়েন্স সামগ্রী এবং তথ্যপ্রযুক্তি পণ্যের উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে। এয়ারকন্ডিশনে ২০২৪ সাল ও রেফ্রিজারেটরে ২০২২ সাল পর্যন্ত উৎপাদনে ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। কৃষি আধুনিকীকরণের লক্ষ্যে কৃষি কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি আমদানিতে আগাম কর প্রত্যাহার করা হয়েছে। ইলেকট্রনিক শিল্পে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়ায় শিল্প স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। এখন দেশেই বিশ্বমানের এয়ারকন্ডিশন ও রেফ্রিজারেটর উৎপাদন হচ্ছে। এমনকি বিদেশি ব্র্যান্ডও দেশে কারখানা স্থাপন করেছে এবং অনেক ব্র্যান্ড পরিকল্পনা করছে। এ দুই খাতে বিপুল বিনিয়োগের কারণে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে। যে কারণে করোনা পরিস্থিতিতে দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, হোম অ্যাপ্লায়েন্স সামগ্রী উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে আগামী দুই বছরের জন্য ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ দেশীয় গৃহস্থালি কাজের জন্য দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্য বিশেষ করে ব্লেন্ডার, জুসার, মিক্সার, গ্রাইন্ডার, ইলেকট্রনিক কেটলি, রাইস কুকার, মাল্টি কুকার পেসার কুকারে স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট ছাড় দেওয়া হয়েছে। একই সুবিধা দেওয়া হয়েছে ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, ইলেকট্রনিক ওভেনের স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে। এছাড়া নারী উদ্যোক্তাদের করমুক্ত বার্ষিক টার্নওভার সীমা ৫০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ লাখ টাকা করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি ও কম্পিউটার শিল্পের বিকাশে প্রিন্টার, টোনার কার্টিজ, ইনকজেট কার্টিজ, কম্পিউটার প্রিন্টারের যন্ত্রাংশ, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, এআইও, ডেস্কটপ, নোটবুক, নোটপ্যাড, ট্যাব, সার্ভার, কিবোর্ড, মাউস, বারকোড ও কিউআর কোড স্ক্যানার, পিসিবিএ/মাদারবোর্ড, পাওয়ার ব্যাংক, রাউটার, নেটওয়ার্ক সুইচ, মডেম, নেটওয়ার্ক ডিভাইস/হাব, স্পিকার, সাউন্ড সিস্টেম, ইয়ারফোন, হেডফোন, এসএসডি/পোর্টেবল এসএসডি, হার্ডডিস্ক ড্রাইভ, পেনড্রাইভ, মাইক্রো এসডি কার্ড, ফ্ল্যাশ মেমোরি কার্ড, সিসিটিভি, মনিটর, প্রজেক্টর, প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড, ই-রাইটিং প্যাড, ইউএসবি ক্যাবল, ডিজিটাল ঘড়ি, বিভিন্ন প্রকাশ লোডেড পিসিবি উৎপাদনে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ১৬শ সিসি পর্যন্ত গাড়ি উৎপাদনে প্রয়োজনীয় উপকরণ ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে ভ্যাট অব্যাহতির সুবিধা ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে যন্ত্রাংশ আমদানিতে আগাম কর দিতে হয়। আগামী বাজেটে সেটিও বাতিল করা হচ্ছে। এছাড়া পলিপ্রোপাইলিন স্ট্যাপল ফাইবার, মোবাইল ফোন এবং স্যানিটারি ন্যাপকিন ও ডায়াপারের কাঁচামাল আমদানিতে ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদ ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে। শুধু ভারী শিল্প বা আইটি শিল্প নয়, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পকেও বাজটে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসাবে শর্তসাপেক্ষে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে প্রস্তুতকৃত যন্ত্রাংশ সরবরাহ পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। শর্ত হচ্ছে, দেশীর ভারী শিল্পকে যেসব যন্ত্রাংশ আমদানিতে ভ্যাট ও শুল্ক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, সেসব যন্ত্রাংশ লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাত উৎপাদনের পর তা সরবরাহ করলে ভ্যাট দিতে হবে না। অবশ্য এ জন্য প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট নিবন্ধিত হতে হবে এবং রিটার্ন জমা দিতে হবে। বিদ্যমান ভ্যাট আইনটি আরও ব্যবসাবান্ধব ও যুগোপযোগী করতে আমদানি পর্যায়ে ভ্যাটের আগাম করহার কমানো হয়েছে। ভ্যাট ফাঁকির জরিমানা ও সরল সুদ দুটোতেই ছাড় দেওয়া হয়েছে। আগাম কর হার ৪ শতাংশ থেকে এক শতাংশ কমিয়ে ৩ শতাংশ করা হয়েছে। বর্তমানে ভ্যাট ফাঁকির ক্ষেত্রে ফাঁকি দেওয়া ভ্যাটের দ্বিগুণ জরিমানা আরোপের বিধান রয়েছে। আগামী বাজেটে এটি কমিয়ে ভ্যাট ফাঁকির সমপরিমাণ জরিমানার বিধান করা হচ্ছে। এছাড়া সময়মতো ভ্যাট না দিলে ভ্যাট আইন অনুযায়ী মাসিক ২ শতাংশ হারে সরল সুদে জরিমানার বিধান রয়েছে। এটি বাজেটে এক শতাংশ করা হচ্ছে। তৃতীয় লিঙ্গ বা হিজড়াদের সমাজের মূলধারায় আনতে কিছুটা উদ্যোগ রয়েছে বাজেটে। কোনও প্রতিষ্ঠান মোট কর্মচারীর ১০ শতাংশ বা ১শ জনের বেশি তৃতীয় লিঙ্গের শ্রমিক নিয়োগ দিলে কর রেয়াত সুবিধার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ভ্যাট ছাড় দেওয়া হয়েছে স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদিত স্যানিটারি ন্যাপকিন, করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে কোভিড-১৯ টেস্ট কিট, পিপি, ভ্যাকসিন আমদানি, উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়েও। এছাড়া অটিজম সেবার কার্যক্রম এবং ও মেডিটেশন সেবার ওপর ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর সব ধরনের তামাক পণ্যের মূল্য বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রস্তাবিত বাজেটে দু’লাখ টাকা বা তার নিচে সঞ্চয়পত্র কিনতে টিআইএন লাগবে না এমন বিধানও রাখা হয়েছে। বিকাশ-নগদসহ মোবাইলফোনে আর্থিক সেবা করপোরেট কর বাড়ানো হয়েছে। পঞ্চাশ হাজার টাকার বেশি ব্যবসায়িক লেনদেন ব্যাংকে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কৃষি খাতে সরবরাহ চেইনকে প্রভাবিত করতে কৃষি ও অকৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ১৩০টি গ্রোথ সেন্টার তথা হাটবাজার উন্নয়ন করার পরিকল্পনা রয়েছে বাজেটে। এছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে প্রস্তাবিত বাজেটে। এবারই প্রথম দেশের ১৫০টি উপজেলার সব বয়স্কজন ও বিধবা নারীকে ভাতা দেওয়া হবে।