মহামারী পরিস্থিতিতে কর্মহীন হয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানে নতুন বাজেটে ‘স্পষ্ট কিছু নেই’ বলে সমালোচনা হলেও অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল তার পরিকল্পনার একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সরকারের একার পক্ষে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব না। সেই দায়িত্ব নিতে হবে বেসরকারি খাতকে। তারা যেন সেটা করতে পারে, সেজন্য প্রস্তাবিত বাজেটে দেশের ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসারের সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেন, “প্রাইভেট সেক্টরকে ড্রাইভিং সিটে বসাতে হবে, তারা এগিয়ে নিয়ে যাবে। তারা যেন সেটা করতে পারে, সেজন্য সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে।” মহামারীর মধ্যে ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ কোটি টাকার এই বাজেট প্রস্তাব বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি একে ‘জীবন-জীবিকা রক্ষার’ বাজেট বললেও বাজেটের পরিকল্পনায় তার ‘প্রতিফলন আসেনি’ বলে সমালোচনা হচ্ছে। প্রস্তাবিত বাজেটে বিরাট ছাড় এসেছে করপোরেট করের ক্ষেত্রে, এছাড়া ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড তৈরির লক্ষ্যে ভারী শিল্পে কর অবকাশ সুবিধা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। স্থানীয় শীল্পে উৎসাহ দিতে শুল্ক ও করে নীতি সহায়তা দেওয়া হয়েছে। বাজেটের এসব উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন অর্থনীতির বিশ্লেষকরা। কিন্তু মহামারীর মধ্যে নতুন করে যারা দরিদ্রের কাতারে নাম লিখিয়েছেন, বা কাজ হারিয়ে যারা দুর্দশায় পড়েছেন, তাদের জন্য বাজেটে ‘স্পষ্ট কিছু’ নেই বলেও সমালোচনা হচ্ছে। রেওয়াজ অনুযায়ী অর্থমন্ত্রী শুক্রবার বাজেট পরবর্তী ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনে হাজির হলে কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা নিয়েও সাংবাদিকরা তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। উত্তরে অর্থমন্ত্রী বলেন, “বাজেট ইজ কোয়াইট ওপেন। পুরোটাই ব্যবসা বান্ধব। আমি মনে করি ব্যবসায়ীরা সুযোগ নেবে। সুযোগ নেওয়া মানে হচ্ছে উৎপাদন যাওয়া। উৎপাদনে গেলে তা হবে কর্মসংস্থান। কর্মসংস্থান সৃষ্টি না করলে উৎপাদন কীভাবে হবে? এজন্য আমি মনে করি ব্যবসায়ীরা কর্মসংস্থান সৃষ্টির কাজটি করবে। আমরা মেইড ইন বাংলাদেশের ট্যাগলাইনটা ব্যবহার করতে শুরু করেছি। এটা সময়োপযোগী পদক্ষেপ।”
ভবিষ্যতে ভ্যাট, ট্যাক্স কমিয়ে দেশীয় শিল্পকে আরও বেশি সুরক্ষা দেওয়া হবে বলে ইঙ্গিত দেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, “আমাদরে দেশীয় পণ্য যেগুলো আছে। যেখানেই সম্ভাবনা আছে, সক্ষমতা আছে, আমরা সেটাকে কাজে লাগাব। আমরা কিছুটা ফ্লেক্সিবল থাকব। ভ্যাট ট্যাক্স কখনও বাড়াবো না। এটা পরিবর্তন হতে থাকবে। পরিবর্তন হওয়া মানে কমে যাওয়া। এর উদ্দেশ্য থাকবে রেভিনিউ বাড়ানো।” গত বছর মহামারীর শুরুর দিকে বেকারত্ব নিয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপে দেখানো হয়, কোভিড-১৯ মহামারীর প্রভাবে গত এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে বেকারত্বের হার ২২ শতাংশের উপরে চলে গেলেও সেপ্টেম্বরে তা ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে বেকারেত্বের হার এখনও ১০ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে বলে একাধিক গবেষণার বরাত দিয়ে দাবি করছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকনোমিক মডেলিং বা সানেম। সানেমের গবেষণায় বলা হচ্ছে, মহামারীকালে দুই কোটির মত মানুষ ছদ্ম বেকারত্বের মধ্যে পড়েছে নতুন করে। সে কারণে এবারের বাজেটে শ্রমবাজারের কাঠামোগত পরিবর্তন নিয়ে দিক নির্দেশনা আশা করছিলেন অর্থনীতির গবেষকরা। সেজন্য তারা ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করারও ওপরও জোর দিচ্ছিলেন। অর্থমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম বলেন, উত্তরণের অনেক কিছুই নির্ভর করছে করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে আসার ওপর। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে মানুষের কাজ পেতে বেশি সময় লাগবে না।
করোনা মহামারির মধ্যে ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘অতীতে আমরা যা বলেছি তা অর্জন করেছি। এটা অর্জন করতে যে সমস্ত নেটওয়ার্ক দরকার সেগুলো খুব শক্তিশালী। সামষ্টিক অর্থনীতির গতিমুখীতা অত্যন্ত অগ্রসরমুখী। দেশ স্বাভাবিক হলে আবারও বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। আমরা প্রবৃদ্ধি অর্জন করে দেখাবো।’ মন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে সারা দুনিয়ায় আলোচনা চলছে। ২০১৯ সালের জুলাইয়ের ৩০ তারিখে আমাদের ফরেন এক্সচেঞ্জের রিজার্ভ ছিল ৩২ পয়েন্ট ৭ বিলিয়ন ডলার, একবছর পর সেটা ৩২ থেকে ৩৬ বিলিয়নে চলে আসল। ১ বছরের মাঝে চার বিলিয়ন বাড়লে। এর পর গত ডিসেম্বরে সেটা ৪৩ পয়েন্ট ১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। আর গতকাল (বৃহস্পতিবার) সেটা ছিল ৪৫ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার।’ আ হ ম মুস্তফা কামাল আরও বলেন, ‘আমরা যথেষ্ট ক্যাপাবল। ২০১৯ সালে আমরা বলেছি, সেদিন খুব দূরে নয়, যেদিন আমরা অন্যদেশকে ঋণ দেবো। আগামীতে আমরা ঋণ নেবো না, ঋণ দেবো।’




















