দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের হার ঊর্ধ্বগতিতে এগিয়ে চলছে, সঙ্গে বেড়েছে মৃত্যুও। তবে দেশের অন্যান্য স্থানের তুলনায় সীমান্তবর্তী ও এর আশেপাশের জেলাগুলোতে করোনার প্রকোপ অপেক্ষাকৃত বেশি। করোনার প্রকৃত চিত্র বুঝতে নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা আরও বাড়াতে হবে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সীমান্তবর্তী যেসব জেলায় সংক্রমণ বেশি, সেখানে কঠোর লকডাউন জোরদার করতে হবে। নমুনা পরীক্ষা বাড়াতে হবে, রোগী শনাক্ত এবং কন্টাক্ট ট্রেসিং করে ব্যবস্থা নিতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ৫০৯টি পরীক্ষাগারে করোনার নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। এরমধ্যে আরটি-পিসিআরের মাধ্যমে হচ্ছে ১৩১টি পরীক্ষাগারে, জিন এক্সপার্ট মেশিনের মাধ্যমে ৪৪টি পরীক্ষাগারে এবং র্যাপিড অ্যান্টিজেনের মাধ্যমে ৩৩৪টি পরীক্ষাগারে নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। এদিকে চলতি জুন মাস নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে স্বাস্থ্য অধিদফতর বলছে, গত মাসের মতো এটা স্বস্তির মাস নাও হতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের মুখপাত্র অধ্যাপক রোবেদ আমিন জানিয়েছেন, খুলনা, রাজশাহী, যশোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জে জরুরি রোগী ছাড়া যেন কাউকে ভর্তি নেওয়া না হয়, সে বিষয়ে বলা হয়েছে। প্রয়োজনে পুরো হাসপাতাল করোনা সেবায় ব্যবহার করা হবে। প্রান্তিক অন্য এলাকাগুলোতে তা-ই বলা হয়েছে। রোগী বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুর হারও বেড়েছে বলে জানান তিনি। অধ্যাপক রোবেদ আমিন বলেন, গত ৩০ মে থেকে সংক্রমণের হার উঠানামা করছে। এখন আমরা যে পর্যায়ে আছি, তাতে বলতে পারবো না যে অবস্থা স্থিতিশীল।এখন পর্যন্ত আমাদের ট্রান্সমিশন আনস্টেবল। তিনি বলেন, জুন মাসের কেবল মাত্র ছয় দিন গেছে। এর মধ্যে আমরা আট হাজার ৭৭৪ রোগী শনাক্ত করেছি। এই মাস গত মাসের মতো স্বস্তিকর যাবে বলে মনে হচ্ছে না।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের করোনা বিষয়ক নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় রাজশাহী বিভাগের রাজশাহী জেলায় করোনার নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ৫৫৫টি, শনাক্ত হয়েছেন ২২২ জন অর্থাৎ শনাক্তের হার প্রায় ৫০ শতাংশ। চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩৪৯টি পরীক্ষায় শনাক্ত হয়েছেন ১৪২ জন। আবার রংপুর বিভাগের ঠাকুরগাঁতে ২৭ নমুনা পরীক্ষায় শনাক্ত হয়েছেন ১৭ জন, দিনাজপুরে ১৫০ টি পরীক্ষায় ৪০ জন, কুড়িগ্রামে ২০টি পরীক্ষায় নয়জন আর খুলনা বিভাগে যশোর জেলায় ১০০টি নমুনা পরীক্ষায় ৪৬ জন, মেহেরপুরে ৪০টি পরীক্ষায় ১৩ জন, নড়াইলে ১০টিতে ছয়জন, ঝিনাইদহে ৭৫টিতে ২৪ জন। গত ৫ জুন স্বাস্থ্য অধিদফতর সাপ্তাহিক বিশ্লেষণে জানায়, গত সপ্তাহে ( ৩০ মে থেকে ৫ জুন পর্যন্ত) রোগী শনাক্ত হয়েছেন ১১ হাজার ৯২৮জন আর তার আগের সপ্তাহে ( ২৩ মে থেকে ২৯ মে পর্যন্ত) রোগী শনাক্ত হয়েছিলেন নয় হাজার ৬৬০ জন। আগের সপ্তাহের চেয়ে গত সপ্তাহে রোগী শনাক্তের হার বেড়েছে ২৩ দশমিক ৪৮ শতাংশ। অধিদফতর জানায়, গত সপ্তাহে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ২৫২ জন আর তার আগের সপ্তাহে মারা গেছেন ২০১ জন, সপ্তাহ শেষে মৃত্যুহার বেড়েছে ২৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ। কোভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি দেশের সংক্রমণ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, দেশের সার্বিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে; বিশেষ করে সীমান্তবর্তী (রাজশাহী বিভাগের চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, রাজশাহী, নওগাঁ, এবং খুলনা বিভাগের সাতক্ষীরা, যশোর, খুলনা, বাগেরহাট) এলাকায় সংক্রমণের উচ্চহার দেখা যাচ্ছে। করোনা পরিস্থিতি বোঝার জন্য কতজন কতজন শনাক্ত হয়েছে তা না দেখে পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্তের হার কেমন হয় তা দেখি’ মন্তব্য করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমান বলেন, ‘গ্রামের মানুষের অসচেতনতা, করোনা নিয়ে কুসংস্কার এবং একেবারে গুরুতর না হলে তারা পরীক্ষা করাতে যান না। ‘এতে করে প্রকৃতপক্ষে ঢাকা এবং চট্টগ্রামের চেয়ে তাদের শনাক্তের চেয়ে সংক্রমণের হার অনেক বেশি’—বলে মন্তব্য করে ডা. জাহিদুর রহমান। তার মতে, থানা হেলথ কমপ্লেক্স, জেলা সদর হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। তিনি বলেন, সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে বৈধ পথে যত মানুষ আসেন তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি যাতায়াত হয় অবৈধ পথে। তাই এক্ষেত্রে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। নাহলে পরিস্থিতি কন্ট্রোল করা যাবে না। একইসঙ্গে মানুষকে টেস্ট করাতে আসার জন্য সচেতন করতে হবে, যখন আরটি-পিসিআরে চাপ বাড়বে তখন সেখানে অ্যান্টিজেন টেস্ট করার সুযোগ তৈরি করতে হবে। কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, আরটি-পিসিআরের মাধ্যমে নমুনা পরীক্ষা করে কো-অর্ডিনেশন করা মুশকিল, যদি এসব এলাকায় অ্যান্টিজেন টেস্ট করা হয় তাহলে একটা সুরাহা হয়। তাতে দ্রুত রোগী শনাক্ত হবে, আর রোগী শনাক্ত হলে তাদের আইসোলেশন করা, রোগীর সংস্পর্শে আসাদের কোয়ারেন্টিন করতে সুবিধা হবে। আর যেসব এলাকায় আরটি-পিসিআরের মাধ্যমে পরীক্ষার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতাও রয়েছে, সেখানে অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করা হলে রোগী শনাক্তের হার আরও বাড়বে, আর তখন সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতেও সুবিধা হবে। ভারতীয় তথা ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে শনাক্ত হয়েছে এবং সেটা এখন বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ছে জানিয়ে অধ্যাপক রোবেদ আমিন বলেন, ভারতীয় ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ ক্ষমতা অন্য ভ্যারিয়েন্টের চেয়ে অনেক বেশি। আর সংক্রমণ অনেক বেশি হলে মৃত্যুর সংখ্যাও অনেক বেশি হবে। তবে দেশে করোনার নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা আরও বাড়ানোর জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতর চেষ্টা করছে জানিয়ে রোবেদ আমিন বলেন, বিশেষ করে র্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্ট বাড়ানোর জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে। আমি বলবো, যেসব প্রান্তিক জায়গাতে, বর্ডারে, যেসব জায়গা থেকে মানুষ আসা যাওয়া করছে বিশেষ করে যেখানে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্টসহ করোনার সংক্রমণ অনেক বেড়ে যাচ্ছে সেখানে যে কোনও লক্ষ্মণসহ সমস্যা এলেই অ্যান্টিজেন টেস্ট ব্যবস্থাকে সহজ করতে হবে। চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মী যারা আছেন যেন র্যাপিড অ্যান্টিজেন করতে থাকেন। এতে কেউ আক্রান্ত হলে এক ঘণ্টার মধ্যে শনাক্ত হবেন এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।




















