আব্বা ও মা’রে লই আন্ডা (আমরা) দুই বইন (বোন) ও তিন ভাই। আব্বা ডাব বেচে (বিক্রি করে)। মা ঘরের কাম (কাজ) করে। এক বছর ধরি (যাবত) স্কুল তো বন্ধ। লেয়া-হড়া (লেখা-পড়া) বাল (ভালো) লাগে না। হেল্লাই রিসকা (রিকসা) চালাই। আন্ডাগরিব মানুষ। আন্নেরা বালা আছেন। সরকাররে কননা (বলেন) স্কুল খুলি (খুলে) দিতো। তাইলে (তাহলে) আর আন্ডা (আমরা) তিন বন্ধু রিসকা (রিকসা) চালামু (চালাবো) না।
শনিবার দুপুরে (১২ জুন) লক্ষ্মীপুরের রায়পুর সরকারি হাসপাতালের সামনে আসে শিশু আনোয়ার হোসেন (১১)। সে উপজেলার দক্ষিন চরবংশী আখনবাজার এলাকার গাজি বাড়ির সিরাজ গাজির ৪র্থ ছেলে ও স্থানীয় চরলক্ষী জনতা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬ষ্ট শ্রেণী ছাত্র।
শিশু আনোয়ারে মত আরেক শিশু অন্তর হোসেন। স্কুল বন্ধ থাকায় সে বাবা সেলিম মোতাইলের সাথে নদিতে মাছ ধরে। এখন মাছ ধরা বন্ধ থাকায় একই এলাকার আনোয়ারের সাথে রিকসা চালনা শিখে। সে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণীর ছাত্র। তারা তিন ভাই ও এক বোন। একই এলাকার আরেক শিশু মোঃ রিপন (১২)। সে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে। বাবা কৃষক শাহ আলী খা ও মা গৃহিনী কহিনুর বেগম । স্কুল বন্ধ থাকায় রায়পুর সরকারি হাসপাতালের সামনে খাবার হোটেলে কাজ করে। তারা দুই ভাই ও এক বোন। এদের মতই আরো অনেক শিশু পেটের দায়ে শ্রম দিচ্ছে।
রিকশা চালক শিশু আনোয়ার জানায়, এক বছর ধরি (যাবত) স্কুল বন্ধ। লেয়া-হড়া (লেখা-পড়া) বাল (ভালো) লাগে না। ডেলি (প্রতিদিন) ৫০০-৬০০ টেয়া (টাকা) ভাড়া হাই (পাই)। আব্বা-আম্মা না করে রিসকা (রিকসা) চালাইতো না। আঁর তোন বালা লাগে না। স্কুলে যাইলে (গেলে) হত্তেগদিন (প্রতিদিন) আব্বা ১০ টেয়া (টাকা) করি দিতো। এহন দেয় না। হেল্লাই রিসকা চালাই। যেডা হাই (যা ভাড়া পাই) হেত্তোন (সেখান থেকে) আব্বা ও আম্মারে কিছু দেই। মইদ্দে মইদ্দে (মাঝে-মাঝে) হিডা লাগাই দেয় ( মারধর করে)। আন্ডা (আমরা) গরিব মানুষ। আন্নেরা (আপনারা) তো বালা (ভালো) আছেন। সরকার-রে কননা (বলেন) স্কুল খুলি (খুলে) দিতো। কত্ত (অনেক) মজা করতাম।
রায়পুর এলএম পাইলট পডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাহবুবুর রহমান বলেন-দেশে প্রথম কোভিড-১৯ রোগী শনাক্তের পর ২০২০ সালের ১৭ মার্চ সরকার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে। পর্যায়ক্রমে সবকিছু খুলে দিলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়টি বারবার পিছিয়ে আবারও স্কুল খোলার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে ৩০ জুন নিয়ে যায়। এমনিতেই শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার খুব বেশী। করেনাকালে ঝরে পড়ার হার অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে শিশু শ্রমের মাত্রা ও ভয়াবহ হারে বেড়ে যাচ্ছে। কম বয়সে শিশুরা নানান অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে কিশোর অপরাধ, কিশোর গ্যাং সহ সামাজিক অবক্ষয় সৃষ্টি হচ্ছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ক্ষতি একদিকে যেমন ধীরগতি, অন্যদিকে তেমনই সুদূরপ্রসারী। আর তাই দীর্ঘ এক বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের সুদূরপ্রসারী প্রভাব হয়তো এখন আমরা পরিমাপ করতে পারছি না। ছাত্রছাত্রী যারা গ্রামে বসবাস করে, তাদের কথা কেউ কি কখনো ভেবে দেখেছি? বেশির ভাগ নিম্ন আয়ের পরিবারের সন্তানেরা হয়তো আর স্কুলেই ফিরতে পারবে না। অনেকেই হয়তো উপার্জনের পথ বেছে নিয়েছে। তাদের বেশির ভাগই মুঠোফোনসহ বিভিন্ন নেশায় আসক্ত হয়েছে। আর এর সামাজিক ক্ষতির দিকগুলো একটু ভাবুন তো? তারা স্কুলে ফিরলেও তাদের শিক্ষার মান কী রকম হবে, তা–ও সহজেই অনুমেয়।
আবদুল মান্নান নামের এক অভিভাবক বলেন-দীর্ঘ এক বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ফলে শিক্ষার্থীদের সামাজিকভাবে গড়ে না ওঠার ক্ষতি এবং মানসিক ক্ষতি বিবেচনায় এনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্তই মনে হয় যুক্তিযুক্ত। শিক্ষকদের যেহেতু করোনা টিকার আওতায় আনা হয়েছে এবং বেশির ভাগ শিক্ষকই ইতিমধ্যে টিকা গ্রহণ করেছেন, তাই স্কুল ও কলেজ খোলার বিষয়ে একটি বড় বাধা অপসারিত হয়েছে। করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা কোনোক্রমেই আর গ্রহণযোগ্য নয়।
উল্লেখ্য-রায়পুর উপজেলায় ১৬৩ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৯৩ টি কেজি স্কুল, ৫৩ টি মাধ্যমিক ও ৭ টি উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। তার মধ্যে দুটি কেজি স্কুল গত ৮ বছর পরিচালনার পর করোনার সময় আর্থিক ক্ষতির কারনে বন্ধ হয়ে গেছে। তাই এসব শিক্ষার্থীরা কেও বিদেশ, কেও দিনমজুরি, কেও হোটেলে, কেও অলস সময় পার করছে। কেও বখাটে হয়ে গেছে।
বিজনেস বাংলাদেশ/ এ আর




















