শেরপুরের সীমান্তবর্তী ৩টি উপজেলার গারো পাহাড় ঘেরা বন-বাগানে বাণিজ্যিকভাবে মধু চাষ বেশ সফলতা এনে দিচ্ছে। সীমান্তের প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে থাকা ওইসব পাহাড়ি এলাকায় বছরব্যাপী স্থানীয় শিক্ষিত বেকাররাসহ প্রায় অর্ধশত মৌচাষী মধু চাষ ও আহরণ করছেন। শুধু তাই নয়, এখানকার মধু এলাকার চাহিদা মিটিয়ে রাজধানী ঢাকার গন্ডি ছাড়িয়ে এখন বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। এতে একদিকে সাফল্য পেয়ে উজ্জীবিত ওইসব চাষীরা, অন্যদিকে লাভের আশায় আগ্রহী হয়ে উঠছেন এলাকার অনেকেই। অভিজ্ঞ মহলের মতে, বানিজ্যিকভাবে ওই মধু চাষে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ওই পেশায় হাজারো তরুণের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।
জানা যায়, কয়েক বছর আগে শেরপুর জেলা সীমান্তবর্তী শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার গাড়ো পাহাড় এলাকায় প্রকৃতিক নানা গাছগাছালি ছাড়াও স্থানীয় বন বিভাগ নানা ধরণের ফলজ, বনজ ও ওষুধি গাছ রোপন করা হয়। ফলে এখন সারা বছরই পাহাড়ে অনেক বৃক্ষ ছেয়ে থাকে ফুলে ফুলে। এছাড়া ভারতের সীমানা দিয়েও রয়েছে অনেক ফুল ও ফলের বাগান। শিক্ষিত বেকার যুবকরা এ সুবিধা কাজে লাগিয়ে বাক্সে মৌচাষের মাধ্যমে মধু আহরণ শুরু করে কর্মসংস্থানের পথ খুঁজে নেয়। অল্প সময়ে ও কম পরিশ্রমে বেশি লাভ হওয়ায় দিন দিন মধু চাষে আগ্রহীর সংখ্যাও বাড়ছে।
স্থানীয় মৌ চাষীরা জানান, ওই উৎপাদক কার্যের মাধ্যমে যেমন কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত খুলে গেছে অপরদিকে স্বাদে অনন্য পাহাড়ি ফুলের খাঁটি ওই মধু বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা যাচ্ছে। এর মাধ্যমে আরও নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।
ঝিনাইগাতীর পানবড় গ্রামের যুবক কানরাম চন্দ্র কোচ জানান, তিনি দীর্ঘদিন বেকার ছিলেন। বেশ কয়েক বছর আগে একটি এনজিও থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে শুরু করেন মৌ চাষ। পাহাড়ি বাগানের ফাঁকে-ফাঁকে সারি সারি করে বসানো হয় মৌমাছির বাক্স। অল্পদিনেই পাই সফলতা।
স্থানীয় আরেক চাষী বলেন, আমরা যে মধু সংগ্রহ করছি তা বন ফুলের মধু। এই মধু অনেক সুস্বাদু। এ কারণে এর চাহিদাটাও অনেক বেশী। স্থানীয় পর্যায়ে বিক্রি শেষে এই মধু এখন বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। পাইকারি পর্যায়ে প্রতিমণ মধু ২২ হাজার থেকে ২৬ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
২০ বছর আগে মধুর ব্যবসা করতেন একই গ্রামের আকমল মিয়া। তিনি জানান, মধু সংগ্রহ করার মতো যুতসই জায়গা না পাওয়ায় এত দিন ব্যবসা বন্ধ রাখেন। এখন পাহাড়ে মধু চাষে সফলতা দেখে তিনিও শুরু করেছেন মৌ চাষ। মধু উৎপাদনের খামারে কাজ পেয়ে খুশি স্থানীয়রা।
ষাটোর্ধ্ব খামার শ্রমিক হায়দার আলী বলেন, বাড়ির পাশের খামারে কাজ পেয়েছি। প্রতিদিন ৫০০-৬০০ টাকা বেতন পাই। ওই টাকায় বউ, ছেলে ও মেয়ে নিয়ে ভালো আছি।
নালিতাবাড়ীর মধুটিলা রেঞ্জ অফিসার আব্দুল করিম বলেন, গারো পাহাড়ের বনাঞ্চলে বিভিন্ন প্রকারের ফুল জন্মে আর সেখান থেকেই মৌমাছি মধু সংগ্রহ করে। তাই বন মধু চাষের উপযুক্ত স্থান। এখানে কেউ মৌচাষ করে মধু উৎপাদন করতে চাইলে বন বিভাগের অনুমতি সাপেক্ষে তা করতে পারে। এর মাধ্যমে আরও নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি ।
এ ব্যাপারে জেলা কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-সহকারি উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা আতিকুর রহমান বলেন, ক্যাপ ছাড়া মধু তাপের সাহায্যে পিউরিফাই করতে হয়। এছাড়া মৌমাছি সারা দিন মধু সংগ্রহ করার পর রাতে ওই মধুতে তার পাখা প্রতি সেকেন্ডে ২০০ বার করে নাড়ায়। এভাবে ১২-১৪ দিন পর মধু পারফেক্ট হয়। তার মতে, সীমান্তের গারো পাহাড়ে মধু চাষ হওয়া এই মধু অনেক সুস্বাদু। এ কারণে এর চাহিদাটাও অনেক বেশী। স্থানীয় পর্যায়ে বিক্রি শেষে এই মধু এখন পাশ্ববর্তী ভারতসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে আশার আলো দেখা দিয়েছে। কাজেই ওই মধু চাষকে উৎসাহিত করতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা করা যেতে পারে।


















