সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন এলাকায় শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। কিছু স্থানে প্রাণহানির খবর আসায় অভিভাবকদের মধ্যে কাজ করছে তীব্র আতঙ্ক। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সঠিক তথ্য জানা এবং সচেতন থাকাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়ি এলাকার পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন প্রকৃতিনির্ভর, শান্ত এবং সরল। তবে ভৌগোলিক দূরত্ব, দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং নানা সীমাবদ্ধতার কারণে এসব এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
বিশেষ করে শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি অনেক সময়ই বাধাগ্রস্ত হয়, যার ফলে ‘ড্রপ আউট’ বা টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুর সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা থাকে। এই প্রেক্ষাপটে সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ এক প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ আলতাপ হোসেনের নেতৃত্বে সম্প্রতি পরিচালিত হয় একটি বিশেষ অনুসন্ধানমূলক ও টিকাদান কার্যক্রম। এই কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য ছিল ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর মধ্যে এমন কোনো শিশু আছে কিনা, যারা জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি থেকে বাদ পড়ে গেছে তা চিহ্নিত করা এবং তাদেরকে দ্রুত টিকার আওতায় আনা।
এই অভিযানে অংশগ্রহণ করেন অভিজ্ঞ টিকা কর্মী, স্বাস্থ্য পরিদর্শক, সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক এবং ইপিআই (এমটি) সদস্যরা। তারা দলবদ্ধভাবে দুর্গম পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছে যান। অনেক ক্ষেত্রে তাদের হেঁটে যেতে হয়েছে দীর্ঘ পথ, পার হতে হয়েছে সংকীর্ণ পাহাড়ি রাস্তা এবং প্রতিকূল পরিবেশ। স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রতিটি পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন, শিশুদের টিকাদান কার্ড যাচাই করেন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করেন।
প্রায় ৫৫টি পরিবারে মোট ৭০ জন মানুষের মধ্যে এই কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তবে ভালো বিষয় হলো এই পুরো কার্যক্রমে একটি শিশুকেও টিকাদান থেকে বাদ পড়া অবস্থায় পাওয়া যায়নি। এই সাফল্য শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রতিফলন। স্থানীয় জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত তদারকি এবং সময়মতো সেবা প্রদান সবকিছুর সম্মিলিত ফলাফল এই অর্জন।
সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ আলতাপ হোসেন এ বিষয়ে বলেন, আমাদের লক্ষ্য শুধু টিকা প্রদান নয়, বরং প্রতিটি শিশুর সুস্থ ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা। দুর্গম এলাকায় বসবাসকারী মানুষদের কাছেও সমানভাবে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। এই কার্যক্রমের মাধ্যমে আমরা নিশ্চিত হতে পেরেছি যে, ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর মধ্যে কোনো শিশু টিকাদান থেকে বাদ পড়েনি যা আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের।
তিনি জানান, ভবিষ্যতেও এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার মান আরও উন্নত করার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতাও এই সাফল্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের উদ্যোগ দেশের অন্যান্য দুর্গম এলাকাতেও অনুসরণযোগ্য একটি উদাহরণ হতে পারে। এতে করে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির সফলতা আরও বৃদ্ধি পাবে এবং শিশুমৃত্যুর হার কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ডিএস./

















