কফি, রাম্বুটান, কোকো, সফেদা, ড্রাগন, অ্যাভোকাডো, প্যাশনসহ ২৪টি ফল উৎপাদনে সফল এক নারীর নাম খাদিজা আক্তার (৬০)। নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার কৈমারী ইউনিয়নের সুনগর গ্রামের নারী উদ্যোক্তা খাদিজা আক্তার। স্বামীহারা এ নারীর কৃতিত্ব ছড়িয়ে পড়েছে গোটা জেলায়। সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে খাদিজা বেগম ২০২২ সালে জয়িতা পুরস্কার অর্জন করেন। একই বছর তিনি মৎস্য চাষে জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন। এ ছাড়া নিরাপদ খাদ্য উৎপাদক হিসেবেও সনদ পেয়েছেন।স্বামী জমি-জমা আবাদ ও কসমেটিকস দোকান চালিয়ে সংসার চালাতেন। ২০১৪ সালে স্বামী মারা গেলে সংসারের পুরো দায়িত্ব তাঁর কাঁধে চাপে। কি করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। এসময় বাড়ির পাশে জমিতে শুরু করেন এসব ফলের মিশ্র বাগান। প্রথমে আরাবিকা জাতের কফির চারা সংগ্রহ করেন পাশের উপজেলা কিশোরগঞ্জের কুদ্দুস নামে জনৈক ব্যক্তির কাছ থেকে। এসব চারা থেকে গাছ পরিণত হওয়ায় ফলন আসে। সেসব ফল যাঁতায় গুঁড়ো করে পাউডার বানিয়ে অনলাইন ও অফলাইনে ব্যবসা শুরু করেন। তাঁর একাজে সফলতা দেখে কৃষি বিভাগ প্রায় দেড় হাজার রোবাস্টা জাতের কফি চারা খাদিজা আক্তারকে প্রদান করে। এই কফি বেশ কড়া ও কিছুটা তিতা স্বাদের হয়। এতে আরাবিকার চেয়ে দ্বিগুণ ক্যাফেইন থাকে। কফি তৈরির মেশিনও দেওয়া হয়।
তিনি বর্তমানে কফি ফল থেকে গুঁড়া বানিয়ে প্রতিকেজি ৩০০০ হাজার টাকায় বিক্রি করছেন। কফির চারা তৈরি করে প্রতিটি ১০০ টাকা করে বিক্রি করছেন। রাম্বুটান চারা বিক্রি করছেন প্রতিটি ৭০০ টাকা হিসেবে। খাদিজার এ কাজে স্থানীয়রা উৎসাহী হয়ে উঠেছেন এ ধরণের বাগান করতে।
সরজমিনে মিশ্রবাগানে গেলে দেখা যায়, কফির সাথে রাম্বুটান, ড্রাগন ও রাম্বুটান গাছ ফল এসেছে। ফল ধরেছে কোকো গাছেও। কফির গাছেও ঝুলে আছে থোকা থোকা কফির ফল। রঙিন ড্রাগনও নজর কাড়ছে। কাটিমন, ব্যানানা, বারী-৪ জাতের বাগানও সাথে রয়েছে। উৎপাদিত ফলের আয়ে দুই ছেলেকে লেখাপড়া করিয়েছেন সংসারটাকে সুন্দর করে সাজিয়েছেন।
খাদিজা আক্তার বলেন, ধৈর্য্য, পরিশ্রম ও আন্তরিকতা থাকলে সফলতা আসবেই। স্বামীর ব্যবসায় বসার পাশাপাশি সংসার ছেলেদের লেখাপড়া, বাগান এবং শ্রমিকের খরচ সবকিছুই আমাকে সামলাতে হয়েছে। আমি এখনো নিরাপদ ও সতেজ ফল উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। ছেলে শেফায়েত নাশরাত নয়ন কৃষি নিয়ে লেখাপড়া শেষ করায় আমার ছেলের পরামর্শে ও সহযোগিতায় বাগানের পরিধি ও আয় বাড়ছে। তাঁর বাগানে নারী-পুরষ মিলে ৩ জন শ্রমিক সারাবছরই দিন হাজিরায় কাজ করেন বলে জানান তিনি। তিনি এসবের পাশপাশি রঙিন মাছ (অ্যাকুরিয়াম ফিস), পুষ্টি বাগান, গরু-ছাগল পালনও করছেন।
বাগান পরিদর্শনের সময় নীলফামারী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোছা. হোমায়রা মন্ডল, অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (উদ্ভিদ সংরক্ষণ) শাহিনা বেগম, জলঢাকা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান, উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
এসময় জলঢাকা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বলেন, কৃষি বিভাগ ২০১৮ সাল থেকে সহযোগিতা দিয়ে আসছে। বর্তমানে তিনি সফলতার পর্যায়ে রয়েছেন। তাঁর দেখে অনেকে অনুপ্রাণিত হবেন আশা করছি।
নীলফামারী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোছা. হোমায়রা মন্ডল প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, নীলফামারীর অনন্য নাম খাদিজা। তিনি প্রথমে কফি দিয়ে শুরু করেন। এরপর তাঁর বাগানে কোকো, প্যাশন, সফেদা, ড্রাগন ইত্যাদি ফলের বাগান সাজিয়েছেন। প্রচলিত বিদেশি ফল একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে তিনি যেভাবে সফলভাবে উৎপাদন করছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। আমরা সব সময় তার পাশে আছি। আগামীতে বেগম রোকেয়া পদকের জন্যও তার নাম মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।নিজের সংগ্রাম, সাহস, উদ্ভাবনী চিন্তার মাধ্যমে খাদিজা আক্তার শুধু একজন সফল নারী উদ্যোক্তাই নন, উত্তরাঞ্চলের বিকল্প কৃষিরও একটি অনুকরণীয় মডেলে পরিণত হয়েছেন।
ডিএস./



















