দেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে নিরাপদ ও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করতে দীর্ঘদিন উন্নয়নবঞ্চিত রেলপথের রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসনে বড় উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন সেকশনে ৩০ থেকে ৪০ বছর ধরে বড় ধরনের সংস্কার বা পুনর্বাসন না হওয়া রেলপথকে এবার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আনা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ট্র্যাক রক্ষণাবেক্ষণ, পুরোনো রেল ও স্লিপার পরিবর্তন, ক্ষতিগ্রস্ত ফিটিংস প্রতিস্থাপন এবং প্রয়োজনীয় ব্যালাস্ট সরবরাহসহ বিভিন্ন কাজ বাস্তবায়নে প্রায় ৮৮৪ কোটি টাকার ট্র্যাক-সংক্রান্ত প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে মোট ২ হাজার ৩১৩ দশমিক ৩৯ কিলোমিটার রেলপথ রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম প্রধান রেলপথসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন রুটে একাধিক উন্নয়ন প্রকল্প চলমান বা ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। তবে বিদ্যমান রেল নেটওয়ার্কের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিনের পুরোনো এবং বিভিন্ন মাত্রায় জরাজীর্ণ। দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে এসব রেলপথের রেল, স্লিপার, ফিটিংস ও ব্যালাস্টসহ বিভিন্ন উপাদানের কার্যক্ষমতা কমে গেছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও সময়মতো পুনর্বাসন না হওয়ায় কোথাও কোথাও ট্রেনের গতি সীমিত করার প্রয়োজনও দেখা দেয়।
এ অবস্থায় শুধু রাজস্ব খাতের সীমিত বরাদ্দের ওপর নির্ভর না করে উন্নয়ন বাজেটের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে পুরোনো রেলপথ পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এর ফলে যাত্রীসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ট্রেন পরিচালনার সক্ষমতা বাড়বে এবং রাষ্ট্রের বিপুল অর্থে নির্মিত বিদ্যমান রেল অবকাঠামোর কার্যকর আয়ুষ্কালও দীর্ঘায়িত হবে।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, পূর্বাঞ্চলের ট্র্যাক রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় ট্র্যাক-সংক্রান্ত কাজের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৮৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা। সরঞ্জামসহ প্রকল্পটির মোট ব্যয় প্রায় ১ হাজার ৭৯১ কোটি টাকা। জুলাই ২০২৫ থেকে জুন ২০২৯ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়।
প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রাম-ষোলশহর-ফতেয়াবাদ-নাজিরহাট, ফতেয়াবাদ-চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ-বেগুনবাড়ী, ময়মনসিংহ-মোহনগঞ্জ, শ্যামগঞ্জ জংশন-জারিয়া ঝাঞ্জাইল, ময়মনসিংহ জংশন-গৌরীপুর-আঠারবাড়ী-ভৈরববাজার এবং আখাউড়া-সিলেট সেকশনসহ দীর্ঘদিন বড় ধরনের সংস্কার থেকে বঞ্চিত বিভিন্ন রেলপথের প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া শ্রীপুর-ময়মনসিংহ, ময়মনসিংহ-দেওয়ানগঞ্জ, লাকসাম-নোয়াখালী, আখাউড়া-সাটিয়াজুড়ী এবং সিলেট-সাটিয়াজুড়ীসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সেকশনও এ উদ্যোগের আওতায় রয়েছে। এসব রেলপথ শুধু আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেই নয়, যাত্রী পরিবহন, পণ্য পরিবহন এবং সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিনের পুরোনো রেলপথে ক্ষয়প্রাপ্ত রেল, অকেজো বা ক্ষতিগ্রস্ত স্লিপার, ফিটিংসের ঘাটতি এবং পর্যাপ্ত ব্যালাস্টের অভাবে ট্র্যাকের কাঙ্ক্ষিত মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। রেলওয়ের নিজস্ব জনবল দিয়ে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, পর্যায়ক্রমিক রক্ষণাবেক্ষণ, বার্ষিক ওভারহোলিং ও গ্লু-প্যাকিংয়ের মতো কাজ করা হলেও দীর্ঘদিনের জনবল সংকটের কারণে সব সেকশনে প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।
এ কারণে রাজস্ব বাজেটের সীমিত অর্থ দিয়ে বড় ধরনের পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হওয়ায় পৃথক উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ছোট প্যাকেজে বাড়ছে অংশগ্রহণ
বড় প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নে ঠিকাদারদের অংশগ্রহণ নিয়ে যাতে অযথা সংকট তৈরি না হয়, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের বড় প্যাকেজে প্রতিযোগিতা তুলনামূলক কম হওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে কয়েকটি বড় প্যাকেজকে একাধিক লটে পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে সক্ষম ছোট ও মাঝারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি দরপত্রে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরির সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
এরই মধ্যে কয়েকটি প্যাকেজের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, কোনো কোনো দরপত্রে দুজন এবং কোনো কোনো দরপত্রে সর্বোচ্চ ছয়জন পর্যন্ত দরদাতা অংশ নিয়েছেন। বর্তমানে দরপত্রগুলোর কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই চলছে। অবশিষ্ট কাজগুলোর দরপত্রও নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী আহ্বানের প্রক্রিয়া চলছে।
পিপিআর-২০২৫ এবং আদর্শ দরপত্র দলিল অনুসরণ করে ঠিকাদারদের অভিজ্ঞতার শর্তেও অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। একইভাবে যৌথ উদ্যোগ বা পার্টনারশিপের মাধ্যমে কোনো কাজ সম্পন্ন করে থাকলে সংশ্লিষ্ট চুক্তিপত্র ও প্রয়োজনীয় নথির ভিত্তিতে মূল্যায়নযোগ্য কাজের অভিজ্ঞতা দেখানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। এতে দীর্ঘদিন কাজের অভিজ্ঞতা থাকা ছোট ও মাঝারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার বাস্তব সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী ও ট্র্যাক রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. তানভিরুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হচ্ছে দীর্ঘদিনের পুরোনো ও ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথকে নিরাপদ ও টেকসইভাবে পুনর্বাসন করা। বড় কাজের পরিমাণের কারণে কোনো কোনো প্যাকেজে প্রতিযোগিতা কম হতে পারে—এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ইতোমধ্যে কয়েকটি বড় প্যাকেজকে একাধিক লটে ভাগ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “প্রয়োজন অনুযায়ী প্যাকেজ আরও ছোট করার সুযোগ রয়েছে। তবে এর জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন। আমরা চাই যোগ্য ও সক্ষম ঠিকাদাররা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কাজের সুযোগ পাক এবং একই সঙ্গে কাজের গুণগত মানও নিশ্চিত হোক। আমাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে রেলপথের নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা।”
মো. তানভিরুল ইসলাম আরও বলেন, দরপত্র প্রক্রিয়ায় সরকারি বিধিবিধান অনুসরণ করা হচ্ছে। বর্তমানে কার্যকর পিপিআর-২০২৫ অনুযায়ী দরপত্র প্রক্রিয়া পরিচালিত হচ্ছে। কোনো দরপত্রে প্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতা না থাকলে বা অন্য কোনো বাস্তব সমস্যা দেখা দিলে বিধি অনুযায়ী তা বাতিল করে পুনরায় দরপত্র আহ্বানের সুযোগ রয়েছে। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি নির্ধারিত নিয়ম ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হচ্ছে।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, এত বড় একটি প্রকল্প কোনো একক কর্মকর্তা বা প্রকল্প পরিচালকের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে গ্রহণ বা অনুমোদন করা সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল বিভাগ প্রয়োজনীয় সমীক্ষা ও প্রস্তাব তৈরি করে। এরপর বাংলাদেশ রেলওয়ে, রেলপথ মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশনের বিভিন্ন পর্যায়ের যাচাই-বাছাই শেষে একনেকের অনুমোদনের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন পর্যায়ে এসেছে। ফলে প্রকল্পের ব্যয়, কাজের পরিধি, প্যাকেজ কাঠামো ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা একাধিক পর্যায়ে যাচাই-বাছাই করা হয়েছে।
পশ্চিমাঞ্চলেও বড় পুনর্বাসন প্রকল্প
শুধু পূর্বাঞ্চল নয়, পশ্চিমাঞ্চলেও রেলপথের রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসনে বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে ট্র্যাক রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন (ফেজ-১)’ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ২৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। প্রায় পাঁচ বছর মেয়াদি সরকারি অর্থায়নের এ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৫০০ কিলোমিটার রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণ এবং ৪৩ দশমিক ৯০ কিলোমিটার ট্র্যাক পুনর্বাসনের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় জয়দেবপুর-ইব্রাহিমাবাদ, সৈয়দাবাদ-ঈশ্বরদী বাইপাস, ভেড়ামারা-ঈশ্বরদী বাইপাস, ঈশ্বরদী-সৈয়দপুর, সান্তাহার-জয়পুরহাট, বিরামপুর-পার্বতীপুর এবং আবদুলপুর-রাজশাহী কোর্টসহ বিভিন্ন সেকশন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের মতে, রেলপথের উন্নয়ন শুধু নতুন লাইন নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বিদ্যমান অবকাঠামোর সময়মতো রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি রেলপথ নির্মাণের পর দীর্ঘ সময় ব্যবহার হলে এর রেল, স্লিপার, ফিটিংস, ব্যালাস্টসহ বিভিন্ন উপাদানের কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে আসে। সময়মতো পুনর্বাসন করা না হলে একপর্যায়ে ট্রেনের গতি সীমিত করা, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
পূর্বাঞ্চলের রেলপথের ক্ষেত্রে ঢাকা-চট্টগ্রাম প্রধান রুটের পাশাপাশি লাকসাম-চাঁদপুর ও লাকসাম-নোয়াখালী সেকশনও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এসব রেলপথ ঢাকা ও চট্টগ্রামের সঙ্গে চাঁদপুর নদীবন্দর এবং নোয়াখালীর উপকূলীয় অঞ্চলকে যুক্ত করেছে। একইভাবে বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও সিলেট অঞ্চলের রেল যোগাযোগও দেশের বৃহত্তর রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি করেছে।
বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ রুটে নতুন লাইন নির্মাণ ও ট্র্যাক নবায়নের কাজ চললেও দীর্ঘদিন অবহেলিত সেকশনগুলোকে একইভাবে পুনর্বাসনের আওতায় আনার প্রয়োজন ছিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের প্রত্যাশা, পরিকল্পিতভাবে রেলপথের রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসনের পাশাপাশি দরপত্রে পর্যাপ্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে সরকারি অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার, কাজের গুণগত মান এবং অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব তিনটিই নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে দেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি দীর্ঘদিন উন্নয়নবঞ্চিত রেলপথগুলোও ফিরে পেতে পারে নতুন জীবন।
ডিএস./



















