বিশ্ব পর্যটন দিবস ২৭ সেপ্টেম্বর ,প্রায় ৫০ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত একটি জলাভূমি। গাজীপুর সদর, কালীগঞ্জ, কাপাসিয়া ও শ্রীপুর-চার উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকার সঙ্গে যার যোগ। বর্ষায় বন্যা ও জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি দেশি মাছের অন্যতম ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত এই বিলকে ঘিরে জীবিকা নির্বাহ করেন চার উপজেলার শত শত মানুষ। আর বর্ষা এলেই সেই জলভূমিই বদলে যায় এক মনোরম প্রাকৃতিক পর্যটন গন্তব্যের নাম তার বেলাই বিল
বর্ষার পানিতে যখন বিলের বুক থইথই করে, তখন শাপলা, সবুজ গাছপালা আর নৌকার সারি মিলে বদলে দেয় পুরো দৃশ্যপট। শীতলক্ষ্যা নদী হয়ে ভাদার্ত্তী খাল দিয়ে বিলে প্রবেশের পথটি আরও আকর্ষণীয়। খালের দুই পাশে গাছপালা আর পানির আবহ অনেক দর্শনার্থীর কাছেই সিলেটের রাতারগুলের কথা মনে করিয়ে দেয়। গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের পর্যটন তথ্যেও বর্ষায় বেলাই বিলের ভিন্নরূপ এবং দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নৌকায় পর্যটকদের আসার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বেলাই বিলের গল্প শুধু সৌন্দর্যের নয়।
এটি একই সঙ্গে একটি জলাভূমি, মাছের ভাণ্ডার, কৃষি ও জীবিকার অবলম্বন এবং সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্র। বর্ষাকালে বিলের পানিতে মাছ ধরেন জেলেরা, শাপলা তুলে জীবিকা চালান অনেকে। আবার একই সময়ে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন প্রকৃতিপ্রেমীরা। ফলে একই জলরাশির সঙ্গে একদিকে মানুষের জীবন-জীবিকা, অন্যদিকে বিনোদন ও পর্যটনের সম্ভাবনা যুক্ত হয়েছে। এই সম্ভাবনাই এখন নতুন করে সামনে আনছে বেলাই বিলকে।
বিশ্ব পর্যটন দিবসের প্রেক্ষাপটে বেলাই বিল তাই শুধু একটি দর্শনীয় স্থান নয়; এটি গাজীপুরের পর্যটন অর্থনীতির সম্ভাব্য একটি বড় ক্ষেত্র। পরিকল্পিত যোগাযোগব্যবস্থা, পর্যটকদের নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, নৌভ্রমণের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা এবং জলাভূমির পরিবেশ রক্ষা করা গেলে এই প্রাকৃতিক সম্পদকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ তৈরি হতে পারে। সেই সম্ভাবনার কথা বলছেন স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটক এবং প্রশাসনের কর্মকর্তারাও।
সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের শিক্ষার্থী এবং বক্তারপুর ইউনিয়নের রাজনগর গ্রামের বেলাই বিলপাড়ের বাসিন্দা রানা সরকার বলেন, গাজীপুর তথা দেশের পর্যটন শিল্পের অপার এক সম্ভাবনার নাম বেলাই বিল। সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগ ও প্রচেষ্টাই পারে বিশ্বের দরবারে এই বিলকে আধুনিক পর্যটন এলাকা হিসেবে তুলে ধরতে।
বেলাই বিলের নিয়মিত পর্যটক নুরুল ইসলামও দেখছেন বড় সম্ভাবনা। তাঁর মতে, বিলের সৌন্দর্য যে কোনো পর্যটককে বিমোহিত করবে। তবে পর্যটন বাড়ানোর পাশাপাশি প্লাস্টিক-পলিথিনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, পর্যটকদের নিরাপত্তা এবং বিলে প্রবেশের সড়ক আরও প্রশস্ত করার প্রয়োজন রয়েছে।
কালীগঞ্জ পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ড বাঘেরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ও স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠন কালীগঞ্জ কল্যাণ সংস্থার সভাপতি অ্যাডভোকেট মু. আতিকুর রহমান ভূঞা বলেন, সরকারি অথবা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বেলাই বিলকে সুন্দর পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। স্থানীয় ও দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মানুষ এখানে এসে সময় কাটাতে পারবেন। তাঁর ভাষায়, বেলাই বিল হতে পারে দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র।
কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার এ. টি. এম. কামরুল ইসলামও বেলাই বিলকে উপজেলার অন্যতম সম্পদ হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে প্রয়োজনীয় কিছু সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি থাকলেও সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে এখানে দেশ-বিদেশের পর্যটক আকর্ষণ করা সম্ভব।
ইতোমধ্যে বিলটির প্রচারের জন্য প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বিল ভরাটের উদ্যোগ প্রতিহত করার কথাও জানিয়েছেন ইউএনও।
ফলে বেলাই বিলের সামনে এখন দুটি সমান্তরাল গল্প এবং একটি সম্ভাবনার, অন্যটি সংরক্ষণের।
একদিকে বর্ষার জলে ভেসে ওঠা অপার সৌন্দর্য পর্যটকদের ডাকছে; অন্যদিকে এই জলাভূমির স্বাভাবিক অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নটিও সামনে রয়েছে। ২০২৫ সালের আগস্টে হাইকোর্ট বেলাই বিল ভরাট কার্যক্রমের ওপর তিন মাসের স্থিতাবস্থা দিয়েছিল-যা বিলটির সংরক্ষণ প্রশ্নের গুরুত্বও সামনে আনে।
তাই বেলাই বিলকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও বড় একটি দায়িত্ব-বেলাইকে বাঁচিয়ে রেখেই বেলাইয়ের সৌন্দর্যকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
কারণ, এই বিলের সবচেয়ে বড় পর্যটন অবকাঠামো কোনো কংক্রিটের স্থাপনা নয়। প্রকৃতিই এখানে মূল আকর্ষণ। আর সেই প্রকৃতিকে ঘিরেই গাজীপুরে তৈরি হতে পারে পর্যটন, জীবিকা ও স্থানীয় অর্থনীতির নতুন এক গল্প।
ডিএস./



















