০৪:১৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

শুঁটকিতে ভাগ্য বদল!

 

বৃহত্তর চলনবিলের শুঁটকি মাছ তৈরি করে ভাগ্য বদলে যাচ্ছে অসংখ্য মানুষের। দেশের বিভিন্ন জায়গা ছাড়াও বিদেশে রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে ওই সব এলাকার নিম্ন আয়ের মানুষ। সেই সঙ্গে জাতীয় আয়েও অবদান রাখছেন তারা।

নাটোরের গুরুদাসপুরের বিলশা, সাবগাড়ী, পিপলা, খুবজীপুরে, সিংড়া কৃষ্ণপুর, নুরপুর, বামিহাল, পাবনার চাটমোহর, তাড়াশের মহিষলুটি মাছের আড়তে শুঁটকি শুকাতে ব্যস্ত অনেক নারী-পুরুষ।

খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, চলনবিলের পাঁচটি জেলার ১২টি উপজেলায় হাজারো শ্রমিক তাদের ব্যস্ত সময় পার করছেন। নারী-পুরুষের হাতের তৈরি চলনবিলের শুঁটকি এখন দেশ ছেড়ে বিদেশেও যাচ্ছে। শুঁটকি তৈরিতে নারীদের অবদানের কথা অস্বীকার করার উপায় নেই।

তবে পরিকল্পিতভাবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এই শুটকি প্রক্রিয়াজাত করে বিদেশে রফতানি করতে পারলে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।

বৃহত্তর চলনবিল সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নাটোর, বগুড়া ও রাজশাহী অঞ্চলে দেশীয় পদ্ধতিতে শুঁটকি তৈরি করা হচ্ছে। ভোরের আলো শুরু হতে না হতেই শুরু হয় তাদের কর্মযজ্ঞ। মাছে লবণ মাখানো, ওজন করা, মাচায় নেয়া, বাছাই করা শুকানো আরো কত কাজ। আর এসব কাজের বেশির ভাগই হয় নারীদের হাতে।

চলনবিলের মিঠা পানির মাছের শুঁটকির জন্য বেশ সুনাম রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে রাস্তার পাশেই তৈরি হয় বিশাল এলাকাজুড়ে বসে শুঁটকি মাছ তৈরির কারখানা। চলনবিলের অধিকাংশ মাছ চলে আসে জেলা-উপজেলা সদরের আড়ৎ ও বাজারে।

সেখান থেকে পাইকাররা শুঁটকির জন্য কিনে নিয়ে আসেন প্রচুর মাছ। তবে ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে মাছের বিশাল মৌসুম। ওই সময়ই বেশি চলে শুঁটকির মাছ সংগ্রহ। এসময় বর্ষার পানি শুকিয়ে যাওয়ায় শুরু হয় এই কর্মযজ্ঞ।

চাটমোহরের শুঁটকি ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন জানান, চলনবিলের শুঁটকি মাছের স্বাদ ও মান ভালো হওয়ায় দেশ-বিদেশে এর চাহিদা বেশি। আশ্বিন মাস থেকে শুটকির চাতালে মাছ শুকানো শুরু হয়েছে। অগ্রহায়ণ মাস পর্যন্ত চলে শুকানোর কাজ।

দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা শুঁটকি ব্যবসায়ীরা মাছ শুকানোর চাতাল তৈরি করেছেন। ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে এ ব্যবসা শুরু করা যায়।

গুরুদাসপুরের শুঁটকি ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম জানান, পানি কমতে থাকলে বিলের বিভিন্ন স্থানে সোঁতিজাল পাতা হয়। জালে ধরা পড়ে পুঁটি, খলসে, চেলা, টেংরা, বাতাশি, চিংড়ি, নলা, টাঁকি, গুচি, বাইম, বোয়ালসহ নানা জাতের মাছ। এসব মাছ চাতালে শুকিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। ২৫০ টাকা থেকে ৮ শ’ টাকা দরে প্রতি কেজি শুঁটকি মাছ বিক্রি করা হয়।

শুঁটকি তৈরির কাজে নিয়োজিত শ্রমিক শমসের আলী, বেলার মোল্লা, রজব আলী, রিতা রাণী, রজুফা বেওয়া ও রিনা খাতুন জানান, তিন কেজি তাজা মাছ শুকিয়ে এক কেজি শুঁটকি মাছ তৈরি হয়। এই ব্যবসা আর্থিকভাবে স্বচ্ছলতার পাশাপাশি ঝুঁকিও অনেক বেশি।

ঠিকমতো পরিচর্যা করতে না পারলে শুঁটকি মাছে পোকা লেগে নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া আবহাওয়া খারাপ হলে, রোদ না থাকলে বিপদে পড়তে হয়।

শুঁটকি পল্লীর কয়েকজন মালিক জানান, সরকারি জায়গা লিজ নিয়ে চালানো এ পল্লীতে কাজ করছেন হাজারো শ্রমিক। শুধু রোদে দেয়া নয়, সারাদিন তাদের কাজ কয়েকবার শুটকি উল্টে-পাল্টে দেয়া। রোদ কম থাকলে শুকাতে লাগে তিন-চার দিন।

আবার রোদ বেশি থাকলে একদিনেই শুঁটকি হয়ে যায়। তবে বড় মাছে সময় বেশি লাগে। এই ছয়মাস তাদের মাছ কেনাও লাগে না। মালিকরা নিয়মিত খেতে দেন। তাতে কম মজুরিতে কাজ করেও খুশি হন তারা।

গ্রামের সহজ সরল এসব শ্রমিক অল্পতেই তুষ্ট। তাই সারাদিন বিরামহীন খেটেও মুখে কষ্টের ছাপ নেই। এই শ্রমিকদের এই দৃঢ় কর্মদক্ষতায় ভালো মহাজনরা সবসময় ভালোই থাকেন।

নাটোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জানান, সব কিছু মিলিয়ে চলনবিল অঞ্চলের শস্য ও মৎস্য ভান্ডার নামে খ্যাত এই অঞ্চলের ফসলাদি ও মৎস্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে পারলে দেশ আর্থিকভাবে অনেক উন্নতি লাভ করবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

বিজনেস বাংলাদেশ/এম মিজান

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

হামে আক্রান্তদের বড় অংশই টিকাবিহীন শিশু

শুঁটকিতে ভাগ্য বদল!

প্রকাশিত : ০১:৩৪:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২০

 

বৃহত্তর চলনবিলের শুঁটকি মাছ তৈরি করে ভাগ্য বদলে যাচ্ছে অসংখ্য মানুষের। দেশের বিভিন্ন জায়গা ছাড়াও বিদেশে রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে ওই সব এলাকার নিম্ন আয়ের মানুষ। সেই সঙ্গে জাতীয় আয়েও অবদান রাখছেন তারা।

নাটোরের গুরুদাসপুরের বিলশা, সাবগাড়ী, পিপলা, খুবজীপুরে, সিংড়া কৃষ্ণপুর, নুরপুর, বামিহাল, পাবনার চাটমোহর, তাড়াশের মহিষলুটি মাছের আড়তে শুঁটকি শুকাতে ব্যস্ত অনেক নারী-পুরুষ।

খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, চলনবিলের পাঁচটি জেলার ১২টি উপজেলায় হাজারো শ্রমিক তাদের ব্যস্ত সময় পার করছেন। নারী-পুরুষের হাতের তৈরি চলনবিলের শুঁটকি এখন দেশ ছেড়ে বিদেশেও যাচ্ছে। শুঁটকি তৈরিতে নারীদের অবদানের কথা অস্বীকার করার উপায় নেই।

তবে পরিকল্পিতভাবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এই শুটকি প্রক্রিয়াজাত করে বিদেশে রফতানি করতে পারলে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।

বৃহত্তর চলনবিল সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নাটোর, বগুড়া ও রাজশাহী অঞ্চলে দেশীয় পদ্ধতিতে শুঁটকি তৈরি করা হচ্ছে। ভোরের আলো শুরু হতে না হতেই শুরু হয় তাদের কর্মযজ্ঞ। মাছে লবণ মাখানো, ওজন করা, মাচায় নেয়া, বাছাই করা শুকানো আরো কত কাজ। আর এসব কাজের বেশির ভাগই হয় নারীদের হাতে।

চলনবিলের মিঠা পানির মাছের শুঁটকির জন্য বেশ সুনাম রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে রাস্তার পাশেই তৈরি হয় বিশাল এলাকাজুড়ে বসে শুঁটকি মাছ তৈরির কারখানা। চলনবিলের অধিকাংশ মাছ চলে আসে জেলা-উপজেলা সদরের আড়ৎ ও বাজারে।

সেখান থেকে পাইকাররা শুঁটকির জন্য কিনে নিয়ে আসেন প্রচুর মাছ। তবে ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে মাছের বিশাল মৌসুম। ওই সময়ই বেশি চলে শুঁটকির মাছ সংগ্রহ। এসময় বর্ষার পানি শুকিয়ে যাওয়ায় শুরু হয় এই কর্মযজ্ঞ।

চাটমোহরের শুঁটকি ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন জানান, চলনবিলের শুঁটকি মাছের স্বাদ ও মান ভালো হওয়ায় দেশ-বিদেশে এর চাহিদা বেশি। আশ্বিন মাস থেকে শুটকির চাতালে মাছ শুকানো শুরু হয়েছে। অগ্রহায়ণ মাস পর্যন্ত চলে শুকানোর কাজ।

দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা শুঁটকি ব্যবসায়ীরা মাছ শুকানোর চাতাল তৈরি করেছেন। ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে এ ব্যবসা শুরু করা যায়।

গুরুদাসপুরের শুঁটকি ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম জানান, পানি কমতে থাকলে বিলের বিভিন্ন স্থানে সোঁতিজাল পাতা হয়। জালে ধরা পড়ে পুঁটি, খলসে, চেলা, টেংরা, বাতাশি, চিংড়ি, নলা, টাঁকি, গুচি, বাইম, বোয়ালসহ নানা জাতের মাছ। এসব মাছ চাতালে শুকিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। ২৫০ টাকা থেকে ৮ শ’ টাকা দরে প্রতি কেজি শুঁটকি মাছ বিক্রি করা হয়।

শুঁটকি তৈরির কাজে নিয়োজিত শ্রমিক শমসের আলী, বেলার মোল্লা, রজব আলী, রিতা রাণী, রজুফা বেওয়া ও রিনা খাতুন জানান, তিন কেজি তাজা মাছ শুকিয়ে এক কেজি শুঁটকি মাছ তৈরি হয়। এই ব্যবসা আর্থিকভাবে স্বচ্ছলতার পাশাপাশি ঝুঁকিও অনেক বেশি।

ঠিকমতো পরিচর্যা করতে না পারলে শুঁটকি মাছে পোকা লেগে নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া আবহাওয়া খারাপ হলে, রোদ না থাকলে বিপদে পড়তে হয়।

শুঁটকি পল্লীর কয়েকজন মালিক জানান, সরকারি জায়গা লিজ নিয়ে চালানো এ পল্লীতে কাজ করছেন হাজারো শ্রমিক। শুধু রোদে দেয়া নয়, সারাদিন তাদের কাজ কয়েকবার শুটকি উল্টে-পাল্টে দেয়া। রোদ কম থাকলে শুকাতে লাগে তিন-চার দিন।

আবার রোদ বেশি থাকলে একদিনেই শুঁটকি হয়ে যায়। তবে বড় মাছে সময় বেশি লাগে। এই ছয়মাস তাদের মাছ কেনাও লাগে না। মালিকরা নিয়মিত খেতে দেন। তাতে কম মজুরিতে কাজ করেও খুশি হন তারা।

গ্রামের সহজ সরল এসব শ্রমিক অল্পতেই তুষ্ট। তাই সারাদিন বিরামহীন খেটেও মুখে কষ্টের ছাপ নেই। এই শ্রমিকদের এই দৃঢ় কর্মদক্ষতায় ভালো মহাজনরা সবসময় ভালোই থাকেন।

নাটোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জানান, সব কিছু মিলিয়ে চলনবিল অঞ্চলের শস্য ও মৎস্য ভান্ডার নামে খ্যাত এই অঞ্চলের ফসলাদি ও মৎস্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে পারলে দেশ আর্থিকভাবে অনেক উন্নতি লাভ করবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

বিজনেস বাংলাদেশ/এম মিজান