ছয় দফা ঘোষণার পর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বা ন্যাপ-এর পূর্ব পাকিস্তান প্রধান অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আপনি এই যে ৬ দফা দিলেন তার মূল কথাটি কী?” আঞ্চলিক ভাষায় এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন জাতির পিতা। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, “আরে মিয়া বুঝলা না, দফা তো একটাই। একটু ঘুরাইয়া কইলাম।” ঘুরিয়ে বলা এই এক দফা হলো পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন অর্থাৎ স্বাধীনতা। এর আগে বিভিন্ন সময়ে এই অঞ্চলের স্বাধিকার আন্দোলনের দাবী উঠেছে কিন্তু ছয় দফার দাবির মধ্য দিয়ে এটি একক এজেন্ডায় পরিণত হয়। আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে লাহোরে বিরোধী দলগুলোর এক সম্মেলনে এই ছয় দফা পেশ করেন। তখনকার অনেকে এই দাবিগুলোকে ‘রাজনৈতিক বোমা’ বলে উল্লেখ করেছেন। ছয় দফা দাবি উত্থাপনের আগে বাঙালির রাষ্ট্রভাষা থেকে শুরু করে আরো অনেক এজেণ্ডা ছিল। কিন্তু ছয় দফা দেওয়ার পর থেকে জাতীয়তাবাদের বিষয়টি একমাত্র এজেন্ডায় পরিণত হয়। তখন বাঙালি জাতিকে সংগঠিত করা অনেক বেশি সহজ হল। হয় ছয় দফা তথা বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষে না হয় বিপক্ষে। এই ছয় দফা আন্দোলনের মাধ্যমে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দ্রুততম সময়ে বাঙালি জাতিকে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-এর পক্ষে নিতে পারলেন এবং ৭০-এর নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে দেশকে স্বাধীনতার চূড়ান্ত পথে নিয়ে গেলেন। ছয় দফার পটভূমি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ছয় দফা কোন রাতারাতি কর্মসূচি ছিল না। এর প্রস্তুতি ছিল দীর্ঘদিনের। উনিশশ চল্লিশ সালের লাহোর প্রস্তাব, ১৯৪৭ সালের ভারত ভাগ, ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, ‘৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয়, ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন – এসবই ছয় দফার ভিত তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি ও ধারাবাহিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এর তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি হচ্ছিল। একই সঙ্গে তৈরি হয়েছিল রাজনীতিবিদদের সঙ্গে অর্থনীতিবিদদের যুগলবন্দী, স্বাধিকারের দাবিতে যাঁরা এক মোহনায় মিলেছিলেন। ছয় দফার জন্মের পেছনে মূল কারণ ছিল মূলত পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক বৈষম্য। জন্মের পর থেকে পাকিস্তান যেসব বৈদেশিক সাহায্য পেয়েছে বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও তার বেশিরভাগ ব্যয় হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। পূর্ব পাকিস্তানের ‘সোনালী ফসল পাট’ বিদেশে রপ্তানি করে যে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হতো সেটাও চলে যেত পশ্চিম পাকিস্তানে। বৈদেশিক বাণিজ্যের ৬০ শতাংশ ছিল পূর্ব পাকিস্তানের কিন্তু প্রায় সমস্ত অর্থ ব্যয় হতো পশ্চিম পাকিস্তানে। পাকিস্তান সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের ১৯৭০ সালের রিপোর্টে দেখা যায় উন্নয়ন ও রাজস্ব খাতে পূর্ব পাকিস্তানের তুলনায় পশ্চিম পাকিস্তানে ৬০ শতাংশ বেশি ব্যয় করা হয়েছে। ফলে পশ্চিমের মাথা পিছু আয়ও বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থনীতিবিদরা লেখালেখির মাধ্যমে দেখাতে লাগলেন, এক অর্থনীতির বদলে আমাদের দুটো অর্থনীতি দরকার। ফলে এতো দিন যে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের কথা বলা হচ্ছিল সেটা একটা নতুন মাত্রা পেল। এর সঙ্গে ছিল রাজনৈতিক বৈষম্য। প্রশাসনে বাঙালিদের নিয়োগ দেওয়া হতো না। নেওয়া হতো না সেনাবাহিনীতেও। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক বৈষম্যও মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল। ১৭ দিনের পাক-ভারত যুদ্ধের সময় ৬ দফার আশু পটভূমি তৈরি হয়েছিল। এই যুদ্ধের সময় লক্ষ্য করা গিয়েছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সামরিক দিক থেকে সম্পূর্ণ অরক্ষিত ছিল। সেকারণে এই অঞ্চলের রাজনীতিবিদ ও সাধারণ লোকজনের মধ্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল। এই যুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, এই যুদ্ধের পর পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টি নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। যুদ্ধের সময় ভারত পূর্ব পাকিস্তানে আক্রমণ না করায় পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিবৃতিতে বলেছিলেন, ‘চীনের ভয়ে ভারত পূর্ব পাকিস্তানের যুদ্ধে জড়াতে সাহস করেনি।’ জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানকে যুদ্ধকালীন সময়ে এতিমের মতো ফেলে রাখা হয়েছে। ভারতীয় সৈন্যরা যদি দেশের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত লেফট রাইট করে হেঁটে যেত তবুও তাদেরকে বাধা দেওয়ার মতো অস্ত্র বা লোকবল কিছুই পূর্ব বাংলার ছিল না। আর চীনই যদি আমাদের রক্ষাকর্তা হয় তবে পশ্চিম পাকিস্তানের বদলে চীনের সঙ্গে গাঁটছাড়া বাঁধলেই হয়।’ যুদ্ধের পর তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যস্থতায় তাসখন্দে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি চুক্তি সই হয়। এই চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে পাকিস্তানের বিরোধীদলীয় রাজনীতিবিদরা ১৯৬৬ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি একটি জাতীয় সম্মেলন ডাকে। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমেদকে সাথে নিয়ে ওই সম্মেলনে যান শেখ মুজিবুর রহমান এবং আগের দিন সম্মেলনের বিষয় নির্ধারণী কমিটির সভায় ছয় দফা পেশ করেন। ছয় দফার দাবিগুলো ছিল এরকম: পাকিস্তান একটি সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় ফেডারেশন হিসেবে গঠিত হবে। ফেডারেল সরকারের এখতিয়ারে থাকবে কেবল প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র; অন্যান্য বিষয় প্রদেশগুলোর হাতে থাকবে। প্রতিটি প্রদেশের জন্য পৃথক তবে অবাধে রূপান্তরযোগ্য মুদ্রা থাকবে; যদি একক মুদ্রা হয় তাহলে মুদ্রা হস্তান্তর রোধ করার উপায় থাকতে হবে। রাজস্ব থাকবে প্রদেশের হাতে। প্রতিটি প্রদেশের মুদ্রা আয়ের জন্য পৃথক অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষায় প্রতিটি প্রদেশকে মিলিশিয়া রাখার অনুমতি দিতে হবে। এই ছয় দফায় স্বাধীনতার কোন কথা লেখা ছিল না। সেখানে ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের গণতন্ত্রায়নের সুপারিশ। এবং স্বায়ত্তশাসনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটা পথ-নির্দেশ। এটা ছিল হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক দূরদর্শীতার বহিঃপ্রকাশ। ছয় দফা সম্পর্কে বলতে গিয়ে শেখ মুজিব সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হককে বলেছিলেন: “আমার দফা আসলে তিনটা। কতো নেছো, কতো দেবা, কবে যাবা?” বিরোধী দলগুলোর সম্মেলনের নীতিনির্ধারণী সভায় বঙ্গবন্ধু ছয় দফা তুলে ধরলে সেখানেই তার বিরোধিতা করা হয়। সবার আপত্তির কারণে এই প্রস্তাব সম্মেলনের এজেন্ডায় স্থান পায়নি। ক্ষুব্ধ হয়ে শেখ মুজিব সম্মেলন থেকে ওয়াকআউট করেন। এই ছয় দফার প্রেক্ষিতে রাজনীতিবিদরা মন্তব্য করেন, এসব দফা বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তান থাকবে না, ভেঙে যাবে। পাকিস্তানের খবরের কাগজে তাকে চিহ্নিত করা হয় বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে। নিজের দল আওয়ামী লীগেরও সব নেতার সমর্থন ছিল না ছয় দফার প্রতি। তবে ছাত্রলীগের তরুণ নেতারা শেখ মুজিবের পাশে ছিলেন। অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলিও ছয় দফার বিরোধিতা করে। এমনকি বামপন্থীরাও। কারণ বামপন্থীরা তখন সবাই ন্যাপে চলে গিয়েছিল। আর আইয়ুব তখন চীনের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছিল। যে কারণে বামপন্থীরাও বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার সঙ্গে ছিল না। এর ফলে বামপন্থীরাই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে লাগলো। বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা আন্দোলনে পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খান বিচলিত হয়ে পড়েন। প্রয়োজনে তিনি অস্ত্রের ভাষায় ছয় দফার জবাব দেওয়ার হুমকি দেন। উনিশ’শ ছেষট্টি সালে মুসলিম লীগের কনভেনশনের সমাপ্তি অধিবেশনে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান বলেন, দেশের অখণ্ডতা-বিরোধী কোন প্রচেষ্টা সরকার সহ্য করবে না। এর পর বঙ্গবন্ধুকে বারবার গ্রেফতার করে কারাগারে আটক রাখা হয় এবং তার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। তখনই সারা বাংলার অলিতে গলিতে মাঠে ময়দানে স্লোগান উঠলো, ‘জেলের তালা ভাঙবো শেখ মুজিবকে আনবো’। লাহোরে ছয় দফার দাবি উত্থাপন করে ঢাকায় ফিরে পরের মাসেই আওয়ামী লীগের কনভেনশনে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। সাধারণ সম্পাদক হন তাজউদ্দীন আহমদ। ছয় দফা কর্মসূচি জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তারা সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান সফর করতে শুরু করেন। এই কর্মসূচিকে তারা ‘বাঙালির বাঁচার দাবি’ হিসেবে অভিহিত করেন। এই ছয় দফাকে কেন্দ্র করে সারা দেশে গণজাগরণের সৃষ্টি হলো। দৈনিক ইত্তেফাক এর পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখে। বঙ্গবন্ধুসহ সব রাজবন্দীর মুক্তির দাবিতে ১৯৬৬ সালের ৭ই জুন সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল ডাকা হয়। এদিন পুলিশের গুলিতে ১১ জন শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ নিহত হয়।
৬ দফা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জাতির পিতা শেখ মুজিব বাংলার অবিসম্বাদিত নেতা হয়ে ওঠেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় মুক্তি পাওয়ার পর তাকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেওয়া হয় এবং এর পর থেকেই তিনি হয়ে উঠলেন বাঙালির মুখপাত্র। ছয় দফা ঘোষণার পাঁচ বছরের মধ্যেই এই রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় লাল-সবুজের বাংলাদেশ; বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি এবং স্থান পান জাতির পিতার আসনে। যতদিন বাঙালি জাতি থাকবে ততদিন তিনি এই জাতির পিতা হিসেবে চিরঞ্জীব থাকবেন।
০৮:৫৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম :
ছয় দফা থেকে লাল-সবুজের পতাকা
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - প্রকাশিত : ১২:০১:০৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৭ জুন ২০২১
- 58
ট্যাগ :
জনপ্রিয়





















