০৭:৫৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২৬

মাইক্রোসফটের শুভেচ্ছা দূত ফাতেমা

মানুষের জীবনে প্রতিষ্ঠা পেতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ইচ্ছা, একাগ্রতা আর উদ্যম। এই তিনটি থাকলে কোন মানুষই সমাজে পিছিয়ে থাকে না তার যথার্থ উদাহরণ কুড়িগ্রামের ফাতেমা বেগম। ষোল বছর বয়সের উচ্ছ্বল এ মেয়েটির বাড়ি কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের নাখারগঞ্জ গ্রামে।

সংসারে অভাবের কারণে অপরের বাড়িতে সময় গৃহকর্মীর কাজ নেন ফাতেমা। সেই গৃহকর্মী আজ বিশ্বখ্যাত সফটওয়্যার নির্মাতা ‘মাইক্রোসফট’র শুভেচ্ছা দূত। তারই অংশগ্রহণে মাইক্রোসফট বানিয়েছে এক প্রামাণ্যচিত্র। আর মাইক্রোসফট এশিয়া এই প্রামাণ্যচিত্রটি প্রচার করছে ইউটিউবে। এ সময়ের গৃহকর্মী ফাতেমা এখন অনেক মেয়ের কাছেই অনুপ্রেরণা। অথচ এই ফাতেমাকে করতে হয়েছে গৃহকর্মীর কাজ, ঠেকাতে হয়েছে নিজের বাল্যবিবাহ।

মাত্র পাঁচ শতাংশ জমির উপর ফাতেমাদের বাড়ি। সম্পদ বলতে এই ভিটেটুকুই। দারিদ্র্যতা যেন ফুটে উঠছে পুরো ভিটেজুড়েই। এক সময় অভাব ছিল ফাতেমার নিত্যসঙ্গী। তিনি বলেন, আমি তখন দক্ষিণ রামখানা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণীতে পড়তাম। এমন অনেক দিন গেছে কোন কিছুই না খেয়ে বড় বোনের সাথে চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে স্কুলে যাওয়া-আসা করতাম।

মা অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ নিয়েছিলেন। এর মধ্যে বড় বোন আমেনার বিয়ে হয়ে যায়। তার বিয়ের খরচ জোগাতে সুদের ওপর টাকা ধার করতে হয় বাবাকে। আরও সংকটে পড়ে তারা। ফাতেমা বলে, ‘অভাবের কারণে ওই সময় আমার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। মাত্র নয় বছর বয়সে আমি অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ নেই। কাজ করে যা পেতাম তার সবটুকুই সংসারে দিতাম। ওই পরিবারের (য পরিবারে গৃহকর্মীর কাজ করতেন) ছেলে-মেয়েরা যখন স্কুলে যেত, খুব কষ্ট পেতাম। ওরা পড়তে বসলে আশপাশে ঘুরঘুর করতাম।

রাতে ওদের বই নিয়ে পড়তাম।’ দুই বছর এভাবে অন্যের বাড়িতে কাজ করতে থাকে ফাতেমা। একদিন বাবা ফাতেমাকে ডেকে পাঠান বাড়ি। ফাতেমা বলেন ‘আমার মনে হয়েছিল আবার স্কুলে ভর্তি করে দেবে। খুব খুশি হয়েছিলাম।’ সেই ডাকে বাড়িতে এসে ফাতেমা দেখল ২৫ বছর বয়সী এক যুবকের সঙ্গে তার বিয়ের সব আয়োজন সম্পন্ন।

ফাতেমার বয়স তখন ১১ বছর। কী করবে ভেবে পাচ্ছিলেন না। এ সময় স্থানীয় বেসরকারী সংস্থা ‘আশার আলো পাঠশালা’র পরিচালক বিশ্বজিৎ বর্মণসহ সংগঠনের কয়েকজন যুবক এসে এই বিয়েতে বাধা দেন। ফাতেমার বাবাকে বোঝান যে, বাল্যবিবাহ দেওয়া ঠিক না। পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে যাবে। ফাতেমাকে বিনা পয়সায় লেখাপড়া করানোর দায়িত্ব নেয় আশার আলো পাঠশালা। ফাতেমা বলেন, ‘তাদের সহযোগিতায় ও আমার মায়ের ইচ্ছায় আশার আলো পাঠশালায় ভর্তি হই।

পাঠশালায় এসে নতুন জীবন ফিরে পাই।’ এখন নাগেশ্বরী রায়গঞ্জ ডিগ্রি কলেজের উচ্চমাধ্যমিক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ফাতেমা। পাশাপাশি মাইক্রোসফট অফিস ও কম্পিউটার গ্রাফিকস ডিজাইনে দক্ষ সে। আশার আলো পাঠশালার কম্পিউটার প্রশিক্ষক হিসেবে কাজও করছেন ফাতেমা। তিনি মেয়েদের কম্পিউটার শেখায়। ফাতেমার ছোট দুই বোন মিষ্টি ও আলমিনা। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে।

মাইক্রোসফট বাংলাদেশ, ভুটান, নেপাল ও লাওসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোনিয়া বশির কবির বলেন, ‘আশার আলো পাঠশালার অংশীদার ইয়াং বাংলা। তাদের আগ্রহে আমরা এই পাঠশালায় যাই। তখন ফাতেমা আমার সঙ্গে ইংরেজিতে এত সাবলীলভাবে কথা বলে যে, মুগ্ধ হয়ে যাই। আশার আলো পাঠশালায় কম্পিউটার ল্যাব করে দেয় মাইক্রোসফট। ফাতেমাসহ অনেক মেয়েই শেখে তথ্যপ্রযুক্তির নানা বিষয়।’

গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে মাইক্রোসফটের তত্ত্বাবধানে ফাতেমাকে নিয়ে তৈরি হয় একটি প্রামাণ্যচিত্র। এরপরই তাকে ‘ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর (শুভেচ্ছা দূত)’ মনোনীত করা হয়। আশার আলো পাঠশালার পরিচালক বিশ্বজিৎ বর্মণ জানান, ফাতেমা শুভেচ্ছাদূত হওয়ায় তাঁরা খুব খুশি। বলেলন, ‘এটা ইয়াং বাংলার জন্য সম্ভব হয়েছে। ফাতেমাকে দেখে গ্রামের মেয়েরা লেখাপড়া ও কম্পিউটার শেখার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছে।’

লেখাপড়া শেষ করে বাল্যবিবাহ রোধে সবাইকে নিয়ে কাজ করার ইচ্ছে পোষণ করা ফাতেমা বলেন, সুবিধাবঞ্চিত মেয়েদের পাশে দাঁড়িয়ে সহযোগিতা করতে চাই।

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রেলস্টেশন থেকে গুলিসহ একটি এয়ারগান উদ্ধার করেছে র‌্যাব-৯

মাইক্রোসফটের শুভেচ্ছা দূত ফাতেমা

প্রকাশিত : ০৯:২৮:১৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ মার্চ ২০১৮

মানুষের জীবনে প্রতিষ্ঠা পেতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ইচ্ছা, একাগ্রতা আর উদ্যম। এই তিনটি থাকলে কোন মানুষই সমাজে পিছিয়ে থাকে না তার যথার্থ উদাহরণ কুড়িগ্রামের ফাতেমা বেগম। ষোল বছর বয়সের উচ্ছ্বল এ মেয়েটির বাড়ি কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের নাখারগঞ্জ গ্রামে।

সংসারে অভাবের কারণে অপরের বাড়িতে সময় গৃহকর্মীর কাজ নেন ফাতেমা। সেই গৃহকর্মী আজ বিশ্বখ্যাত সফটওয়্যার নির্মাতা ‘মাইক্রোসফট’র শুভেচ্ছা দূত। তারই অংশগ্রহণে মাইক্রোসফট বানিয়েছে এক প্রামাণ্যচিত্র। আর মাইক্রোসফট এশিয়া এই প্রামাণ্যচিত্রটি প্রচার করছে ইউটিউবে। এ সময়ের গৃহকর্মী ফাতেমা এখন অনেক মেয়ের কাছেই অনুপ্রেরণা। অথচ এই ফাতেমাকে করতে হয়েছে গৃহকর্মীর কাজ, ঠেকাতে হয়েছে নিজের বাল্যবিবাহ।

মাত্র পাঁচ শতাংশ জমির উপর ফাতেমাদের বাড়ি। সম্পদ বলতে এই ভিটেটুকুই। দারিদ্র্যতা যেন ফুটে উঠছে পুরো ভিটেজুড়েই। এক সময় অভাব ছিল ফাতেমার নিত্যসঙ্গী। তিনি বলেন, আমি তখন দক্ষিণ রামখানা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণীতে পড়তাম। এমন অনেক দিন গেছে কোন কিছুই না খেয়ে বড় বোনের সাথে চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে স্কুলে যাওয়া-আসা করতাম।

মা অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ নিয়েছিলেন। এর মধ্যে বড় বোন আমেনার বিয়ে হয়ে যায়। তার বিয়ের খরচ জোগাতে সুদের ওপর টাকা ধার করতে হয় বাবাকে। আরও সংকটে পড়ে তারা। ফাতেমা বলে, ‘অভাবের কারণে ওই সময় আমার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। মাত্র নয় বছর বয়সে আমি অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ নেই। কাজ করে যা পেতাম তার সবটুকুই সংসারে দিতাম। ওই পরিবারের (য পরিবারে গৃহকর্মীর কাজ করতেন) ছেলে-মেয়েরা যখন স্কুলে যেত, খুব কষ্ট পেতাম। ওরা পড়তে বসলে আশপাশে ঘুরঘুর করতাম।

রাতে ওদের বই নিয়ে পড়তাম।’ দুই বছর এভাবে অন্যের বাড়িতে কাজ করতে থাকে ফাতেমা। একদিন বাবা ফাতেমাকে ডেকে পাঠান বাড়ি। ফাতেমা বলেন ‘আমার মনে হয়েছিল আবার স্কুলে ভর্তি করে দেবে। খুব খুশি হয়েছিলাম।’ সেই ডাকে বাড়িতে এসে ফাতেমা দেখল ২৫ বছর বয়সী এক যুবকের সঙ্গে তার বিয়ের সব আয়োজন সম্পন্ন।

ফাতেমার বয়স তখন ১১ বছর। কী করবে ভেবে পাচ্ছিলেন না। এ সময় স্থানীয় বেসরকারী সংস্থা ‘আশার আলো পাঠশালা’র পরিচালক বিশ্বজিৎ বর্মণসহ সংগঠনের কয়েকজন যুবক এসে এই বিয়েতে বাধা দেন। ফাতেমার বাবাকে বোঝান যে, বাল্যবিবাহ দেওয়া ঠিক না। পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে যাবে। ফাতেমাকে বিনা পয়সায় লেখাপড়া করানোর দায়িত্ব নেয় আশার আলো পাঠশালা। ফাতেমা বলেন, ‘তাদের সহযোগিতায় ও আমার মায়ের ইচ্ছায় আশার আলো পাঠশালায় ভর্তি হই।

পাঠশালায় এসে নতুন জীবন ফিরে পাই।’ এখন নাগেশ্বরী রায়গঞ্জ ডিগ্রি কলেজের উচ্চমাধ্যমিক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ফাতেমা। পাশাপাশি মাইক্রোসফট অফিস ও কম্পিউটার গ্রাফিকস ডিজাইনে দক্ষ সে। আশার আলো পাঠশালার কম্পিউটার প্রশিক্ষক হিসেবে কাজও করছেন ফাতেমা। তিনি মেয়েদের কম্পিউটার শেখায়। ফাতেমার ছোট দুই বোন মিষ্টি ও আলমিনা। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে।

মাইক্রোসফট বাংলাদেশ, ভুটান, নেপাল ও লাওসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোনিয়া বশির কবির বলেন, ‘আশার আলো পাঠশালার অংশীদার ইয়াং বাংলা। তাদের আগ্রহে আমরা এই পাঠশালায় যাই। তখন ফাতেমা আমার সঙ্গে ইংরেজিতে এত সাবলীলভাবে কথা বলে যে, মুগ্ধ হয়ে যাই। আশার আলো পাঠশালায় কম্পিউটার ল্যাব করে দেয় মাইক্রোসফট। ফাতেমাসহ অনেক মেয়েই শেখে তথ্যপ্রযুক্তির নানা বিষয়।’

গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে মাইক্রোসফটের তত্ত্বাবধানে ফাতেমাকে নিয়ে তৈরি হয় একটি প্রামাণ্যচিত্র। এরপরই তাকে ‘ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর (শুভেচ্ছা দূত)’ মনোনীত করা হয়। আশার আলো পাঠশালার পরিচালক বিশ্বজিৎ বর্মণ জানান, ফাতেমা শুভেচ্ছাদূত হওয়ায় তাঁরা খুব খুশি। বলেলন, ‘এটা ইয়াং বাংলার জন্য সম্ভব হয়েছে। ফাতেমাকে দেখে গ্রামের মেয়েরা লেখাপড়া ও কম্পিউটার শেখার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছে।’

লেখাপড়া শেষ করে বাল্যবিবাহ রোধে সবাইকে নিয়ে কাজ করার ইচ্ছে পোষণ করা ফাতেমা বলেন, সুবিধাবঞ্চিত মেয়েদের পাশে দাঁড়িয়ে সহযোগিতা করতে চাই।