০৬:১৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ০১ জুন ২০২৬

শিশুর নিজস্ব পথের সন্ধানে

একটি চার-পাঁচ বছরের শিশুকে গভীর মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করলে বিস্মিত হতে হয়। সে একটানা প্রশ্ন করে, ভেঙে দেখে, খুলে দেখে, ছুঁয়ে দেখে, নতুন কিছু আবিষ্কার করার চেষ্টা করে। পৃথিবী তার কাছে এক অনন্ত রহস্যের ভাণ্ডার। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে শিশু জন্মগতভাবে এত কৌতূহলী, শিক্ষাজীবনের কয়েক বছর পর সেই একই শিশু অনেক সময় প্রশ্ন করতে ভয় পায়, ভুল করতে সংকোচ বোধ করে, আর শেখাকে আনন্দের বদলে দায়িত্ব মনে করতে শুরু করে। তাহলে সমস্যা কোথায়? শিশুর মধ্যে, নাকি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কোথাও?

আধুনিক শিক্ষাচিন্তার কয়েকজন প্রভাবশালী গবেষক ও শিক্ষাবিদ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন প্রতিটি শিশুর মধ্যে অসাধারণ সম্ভাবনা আছে, কিন্তু সেই সম্ভাবনা বিকশিত হওয়ার জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত পরিবেশ, অর্থবহ জ্ঞান, সাংস্কৃতিক সংযোগ এবং স্বাধীনভাবে শেখার সুযোগ। শিক্ষা তখনই সফল হয়, যখন তা শিশুকে একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলার চেষ্টা না করে তার নিজস্ব শক্তি ও স্বাতন্ত্র্যকে বিকশিত করতে সাহায্য করে।

আমরা দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাকে অনেকটা শিল্পবিপ্লবের যুগের কারখানার মতো কল্পনা করেছি। একই বয়সের শিশু, একই শ্রেণিকক্ষ, একই পাঠ, একই মূল্যায়ন। যেন সবার শেখার ধরন, আগ্রহ এবং প্রতিভা একই রকম। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোনো শিশু ভাষায় অসাধারণ, কেউ সংগীতে, কেউ প্রকৃতি পর্যবেক্ষণে, কেউ গণিতে, কেউ আবার মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে পারদর্শী। শিক্ষার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো এই ভিন্নতাকে সম্মান করা।

প্রতিটি শিশুর জীবনে এমন একটি ক্ষেত্র থাকে, যেখানে তার স্বাভাবিক আগ্রহ, দক্ষতা এবং আনন্দ একসঙ্গে মিলিত হয়। যখন কোনো শিশু সেই জায়গাটি খুঁজে পায়, তখন শেখা তার কাছে বাধ্যবাধকতা নয়, আবিষ্কারের আনন্দ হয়ে ওঠে। শিক্ষা যদি তাকে নিজের ভেতরের সেই শক্তিকে চিনতে সাহায্য করতে পারে, তাহলে সে শুধু ভালো শিক্ষার্থী নয়, একজন আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবেও গড়ে ওঠে।

তবে শিশুর সম্ভাবনা বিকাশের জন্য শুধু স্বাধীনতা দিলেই যথেষ্ট নয়। আমাদের বুঝতে হবে, মস্তিষ্ক কীভাবে শেখে। শিশুদের অনেকেই পড়াশোনা অপছন্দ করে বলে অভিযোগ করা হয়। কিন্তু প্রকৃত প্রশ্ন হলো আমরা কি তাদের শেখার প্রক্রিয়াকে তাদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যপদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলতে পেরেছি? মানুষের মস্তিষ্ক চিন্তা করতে ভালোবাসে, কিন্তু অকারণে বিভ্রান্ত হতে ভালোবাসে না। যখন কোনো পাঠ অতিরিক্ত সহজ হয়, তখন তা একঘেয়ে লাগে; আবার অতিরিক্ত কঠিন হলে তা ভীতিকর হয়ে ওঠে। সবচেয়ে কার্যকর শিক্ষা সেই জায়গায় ঘটে, যেখানে শিশুকে ভাবতে হয়, কিন্তু হতাশ হতে হয় না। তাই ভালো শিক্ষক শুধু তথ্য দেন না; তিনি এমন প্রশ্ন করেন, এমন উদাহরণ দেন, এমন অভিজ্ঞতা তৈরি করেন, যা শিশুর কৌতূহলকে জাগিয়ে তোলে।

শিক্ষার আরেকটি বড় ভুল ধারণা হলো, পড়ার দক্ষতা মানেই ভালো শিক্ষা। বাস্তবে পড়ার দক্ষতা এবং বোঝার ক্ষমতা এক জিনিস নয়। একটি শিশু হয়তো সাবলীলভাবে একটি অনুচ্ছেদ পড়ে ফেলতে পারে, কিন্তু যদি বিষয়টি সম্পর্কে তার পূর্বজ্ঞান না থাকে, তাহলে সে প্রকৃত অর্থ বুঝতে পারবে না।

ধরা যাক, একটি শিশু নদী, পাহাড়, গ্রহ কিংবা মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে কিছুই জানে না। সে এসব বিষয়ে লেখা পাঠ্যাংশ হয়তো পড়ে ফেলবে, কিন্তু গভীর অর্থ অনুধাবন করতে পারবে না। তাই শিক্ষার মূল কাজ কেবল দক্ষতা শেখানো নয়; বরং শিশুর জ্ঞানের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করা। ইতিহাস, বিজ্ঞান, সাহিত্য, প্রকৃতি, ভূগোল এসব বিষয়ে যত সমৃদ্ধ ধারণা তার থাকবে, তার চিন্তাশক্তি ও ভাষাবোধও তত গভীর হবে। জ্ঞানই হলো বোধগম্যতার মাটি; সেই মাটি উর্বর না হলে দক্ষতার বীজও ভালোভাবে অঙ্কুরিত হয় না।

একইসঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে, শিশুরা কোনো শূন্যতা থেকে শেখে না। তারা শেখে তাদের পরিবার, ভাষা, সংস্কৃতি এবং সামাজিক অভিজ্ঞতার ভেতর থেকে। একটি শিশু যখন শ্রেণিকক্ষে নিজের পরিচিত জগৎকে খুঁজে পায়, তখন তার শেখার আগ্রহ বহুগুণ বেড়ে যায়।

বাংলাদেশের একটি গ্রামের শিশু, পাহাড়ি অঞ্চলের শিশু, শহরের শিশু কিংবা উপকূলীয় এলাকার শিশুর অভিজ্ঞতা এক নয়। তাই শিক্ষাকে এমন হতে হবে, যা শিশুর নিজস্ব বাস্তবতাকে সম্মান করে। পাঠ্যবইয়ের উদাহরণ, গল্প, উপমা এবং আলোচনায় যদি শিশুর পরিচিত জীবন ও সংস্কৃতির প্রতিফলন থাকে, তাহলে শিক্ষা তার কাছে অনেক বেশি অর্থবহ হয়ে ওঠে। তখন সে কেবল তথ্য গ্রহণ করে না; নিজের জীবন ও পৃথিবীর মধ্যে সম্পর্কও খুঁজে পায়।

তবে শিশুর বিকাশের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা সম্ভবত স্বাধীনতার মধ্যেই নিহিত। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ যেমন নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাধ্যমে পরিণত হয়, শিশুও তেমনি নিজের ছোট ছোট সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পেলে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে।

যখন একটি শিশু নিজে বই বেছে নেয়, নিজে কোনো কাজ সম্পন্ন করার চেষ্টা করে, নিজে ভুল করে এবং নিজেই সেই ভুল সংশোধন করতে শেখে, তখন তার ভেতরে আত্মনিয়ন্ত্রণের বীজ জন্মায়। এই শিক্ষা কোনো বক্তৃতা দিয়ে দেওয়া যায় না; এটি অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অর্জিত হয়। শিশুকে সবসময় নির্দেশ দেওয়া সহজ, কিন্তু তাকে নিজের শেখার দায়িত্ব নিতে শেখানো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আজকের পৃথিবীতে শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমরা প্রায়ই প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নতুন কারিকুলাম কিংবা আধুনিক অবকাঠামোর কথা বলি। এগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তারও আগে আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষা মূলত মানুষের সম্ভাবনা বিকাশের শিল্প।

একটি শিশুর ভেতরে যে কৌতূহল, সৃজনশীলতা, চিন্তাশক্তি এবং মানবিকতার বীজ লুকিয়ে আছে, শিক্ষা সেই বীজকে লালন করার নাম। একজন শিক্ষক বা অভিভাবকের কাজ সেই বীজকে টেনে বড় করা নয়; বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সে নিজের শক্তিতে বেড়ে উঠতে পারে।

কারণ শেষ পর্যন্ত শিক্ষা মানে কেবল ভালো ফলাফল নয়, ভালো মানুষ হওয়া। শিক্ষা মানে শিশুর ভেতরের আলোকে চিনতে পারা এবং সেই আলোকে এমনভাবে জ্বালিয়ে দেওয়া, যাতে সে একদিন নিজের পথও আলোকিত করতে পারে, অন্যের পথও।

লেখকঃমামুনুর রশীদ,
(উপজেলা নির্বাহী অফিসার)
পিরোজপুর সদর পিরোজপুর।
ডিএস./

শিশুর নিজস্ব পথের সন্ধানে

শিশুর নিজস্ব পথের সন্ধানে

প্রকাশিত : ০৬:০৬:৪৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ জুন ২০২৬

একটি চার-পাঁচ বছরের শিশুকে গভীর মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করলে বিস্মিত হতে হয়। সে একটানা প্রশ্ন করে, ভেঙে দেখে, খুলে দেখে, ছুঁয়ে দেখে, নতুন কিছু আবিষ্কার করার চেষ্টা করে। পৃথিবী তার কাছে এক অনন্ত রহস্যের ভাণ্ডার। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে শিশু জন্মগতভাবে এত কৌতূহলী, শিক্ষাজীবনের কয়েক বছর পর সেই একই শিশু অনেক সময় প্রশ্ন করতে ভয় পায়, ভুল করতে সংকোচ বোধ করে, আর শেখাকে আনন্দের বদলে দায়িত্ব মনে করতে শুরু করে। তাহলে সমস্যা কোথায়? শিশুর মধ্যে, নাকি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কোথাও?

আধুনিক শিক্ষাচিন্তার কয়েকজন প্রভাবশালী গবেষক ও শিক্ষাবিদ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন প্রতিটি শিশুর মধ্যে অসাধারণ সম্ভাবনা আছে, কিন্তু সেই সম্ভাবনা বিকশিত হওয়ার জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত পরিবেশ, অর্থবহ জ্ঞান, সাংস্কৃতিক সংযোগ এবং স্বাধীনভাবে শেখার সুযোগ। শিক্ষা তখনই সফল হয়, যখন তা শিশুকে একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলার চেষ্টা না করে তার নিজস্ব শক্তি ও স্বাতন্ত্র্যকে বিকশিত করতে সাহায্য করে।

আমরা দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাকে অনেকটা শিল্পবিপ্লবের যুগের কারখানার মতো কল্পনা করেছি। একই বয়সের শিশু, একই শ্রেণিকক্ষ, একই পাঠ, একই মূল্যায়ন। যেন সবার শেখার ধরন, আগ্রহ এবং প্রতিভা একই রকম। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোনো শিশু ভাষায় অসাধারণ, কেউ সংগীতে, কেউ প্রকৃতি পর্যবেক্ষণে, কেউ গণিতে, কেউ আবার মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে পারদর্শী। শিক্ষার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো এই ভিন্নতাকে সম্মান করা।

প্রতিটি শিশুর জীবনে এমন একটি ক্ষেত্র থাকে, যেখানে তার স্বাভাবিক আগ্রহ, দক্ষতা এবং আনন্দ একসঙ্গে মিলিত হয়। যখন কোনো শিশু সেই জায়গাটি খুঁজে পায়, তখন শেখা তার কাছে বাধ্যবাধকতা নয়, আবিষ্কারের আনন্দ হয়ে ওঠে। শিক্ষা যদি তাকে নিজের ভেতরের সেই শক্তিকে চিনতে সাহায্য করতে পারে, তাহলে সে শুধু ভালো শিক্ষার্থী নয়, একজন আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবেও গড়ে ওঠে।

তবে শিশুর সম্ভাবনা বিকাশের জন্য শুধু স্বাধীনতা দিলেই যথেষ্ট নয়। আমাদের বুঝতে হবে, মস্তিষ্ক কীভাবে শেখে। শিশুদের অনেকেই পড়াশোনা অপছন্দ করে বলে অভিযোগ করা হয়। কিন্তু প্রকৃত প্রশ্ন হলো আমরা কি তাদের শেখার প্রক্রিয়াকে তাদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যপদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলতে পেরেছি? মানুষের মস্তিষ্ক চিন্তা করতে ভালোবাসে, কিন্তু অকারণে বিভ্রান্ত হতে ভালোবাসে না। যখন কোনো পাঠ অতিরিক্ত সহজ হয়, তখন তা একঘেয়ে লাগে; আবার অতিরিক্ত কঠিন হলে তা ভীতিকর হয়ে ওঠে। সবচেয়ে কার্যকর শিক্ষা সেই জায়গায় ঘটে, যেখানে শিশুকে ভাবতে হয়, কিন্তু হতাশ হতে হয় না। তাই ভালো শিক্ষক শুধু তথ্য দেন না; তিনি এমন প্রশ্ন করেন, এমন উদাহরণ দেন, এমন অভিজ্ঞতা তৈরি করেন, যা শিশুর কৌতূহলকে জাগিয়ে তোলে।

শিক্ষার আরেকটি বড় ভুল ধারণা হলো, পড়ার দক্ষতা মানেই ভালো শিক্ষা। বাস্তবে পড়ার দক্ষতা এবং বোঝার ক্ষমতা এক জিনিস নয়। একটি শিশু হয়তো সাবলীলভাবে একটি অনুচ্ছেদ পড়ে ফেলতে পারে, কিন্তু যদি বিষয়টি সম্পর্কে তার পূর্বজ্ঞান না থাকে, তাহলে সে প্রকৃত অর্থ বুঝতে পারবে না।

ধরা যাক, একটি শিশু নদী, পাহাড়, গ্রহ কিংবা মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে কিছুই জানে না। সে এসব বিষয়ে লেখা পাঠ্যাংশ হয়তো পড়ে ফেলবে, কিন্তু গভীর অর্থ অনুধাবন করতে পারবে না। তাই শিক্ষার মূল কাজ কেবল দক্ষতা শেখানো নয়; বরং শিশুর জ্ঞানের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করা। ইতিহাস, বিজ্ঞান, সাহিত্য, প্রকৃতি, ভূগোল এসব বিষয়ে যত সমৃদ্ধ ধারণা তার থাকবে, তার চিন্তাশক্তি ও ভাষাবোধও তত গভীর হবে। জ্ঞানই হলো বোধগম্যতার মাটি; সেই মাটি উর্বর না হলে দক্ষতার বীজও ভালোভাবে অঙ্কুরিত হয় না।

একইসঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে, শিশুরা কোনো শূন্যতা থেকে শেখে না। তারা শেখে তাদের পরিবার, ভাষা, সংস্কৃতি এবং সামাজিক অভিজ্ঞতার ভেতর থেকে। একটি শিশু যখন শ্রেণিকক্ষে নিজের পরিচিত জগৎকে খুঁজে পায়, তখন তার শেখার আগ্রহ বহুগুণ বেড়ে যায়।

বাংলাদেশের একটি গ্রামের শিশু, পাহাড়ি অঞ্চলের শিশু, শহরের শিশু কিংবা উপকূলীয় এলাকার শিশুর অভিজ্ঞতা এক নয়। তাই শিক্ষাকে এমন হতে হবে, যা শিশুর নিজস্ব বাস্তবতাকে সম্মান করে। পাঠ্যবইয়ের উদাহরণ, গল্প, উপমা এবং আলোচনায় যদি শিশুর পরিচিত জীবন ও সংস্কৃতির প্রতিফলন থাকে, তাহলে শিক্ষা তার কাছে অনেক বেশি অর্থবহ হয়ে ওঠে। তখন সে কেবল তথ্য গ্রহণ করে না; নিজের জীবন ও পৃথিবীর মধ্যে সম্পর্কও খুঁজে পায়।

তবে শিশুর বিকাশের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা সম্ভবত স্বাধীনতার মধ্যেই নিহিত। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ যেমন নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাধ্যমে পরিণত হয়, শিশুও তেমনি নিজের ছোট ছোট সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পেলে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে।

যখন একটি শিশু নিজে বই বেছে নেয়, নিজে কোনো কাজ সম্পন্ন করার চেষ্টা করে, নিজে ভুল করে এবং নিজেই সেই ভুল সংশোধন করতে শেখে, তখন তার ভেতরে আত্মনিয়ন্ত্রণের বীজ জন্মায়। এই শিক্ষা কোনো বক্তৃতা দিয়ে দেওয়া যায় না; এটি অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অর্জিত হয়। শিশুকে সবসময় নির্দেশ দেওয়া সহজ, কিন্তু তাকে নিজের শেখার দায়িত্ব নিতে শেখানো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আজকের পৃথিবীতে শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমরা প্রায়ই প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নতুন কারিকুলাম কিংবা আধুনিক অবকাঠামোর কথা বলি। এগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তারও আগে আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষা মূলত মানুষের সম্ভাবনা বিকাশের শিল্প।

একটি শিশুর ভেতরে যে কৌতূহল, সৃজনশীলতা, চিন্তাশক্তি এবং মানবিকতার বীজ লুকিয়ে আছে, শিক্ষা সেই বীজকে লালন করার নাম। একজন শিক্ষক বা অভিভাবকের কাজ সেই বীজকে টেনে বড় করা নয়; বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সে নিজের শক্তিতে বেড়ে উঠতে পারে।

কারণ শেষ পর্যন্ত শিক্ষা মানে কেবল ভালো ফলাফল নয়, ভালো মানুষ হওয়া। শিক্ষা মানে শিশুর ভেতরের আলোকে চিনতে পারা এবং সেই আলোকে এমনভাবে জ্বালিয়ে দেওয়া, যাতে সে একদিন নিজের পথও আলোকিত করতে পারে, অন্যের পথও।

লেখকঃমামুনুর রশীদ,
(উপজেলা নির্বাহী অফিসার)
পিরোজপুর সদর পিরোজপুর।
ডিএস./