গ্রাহকদের সঙ্গে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রতারণার কারণে আস্থার সঙ্কটে পড়েছে সাম্প্রতিক সময়ে জনপ্রিয়তা পাওয়া ই-কমার্স খাত। সম্প্রতি খুব অল্প সময়ে দ্রুত জনপ্রিয়তা পাওয়া কয়েকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতসহ গ্রাহক ও মার্চেন্টদের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগ ওঠে। এরই প্রেক্ষিতে তদন্তে নামে সরকারের অন্তত ৯ সংস্থা। এরমধ্যে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ই-অরেঞ্জের দুটি ব্যাংক হিসাবের লেনদেন পর্যালোচনা করে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকার হদিস পাননি মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। দুই এ্যাকাউন্টে এখন সব মিলিয়ে জমা আছে ৩ কোটি ১২ লাখ ১৪ হাজার ৩৬৫ টাকা। আলোচিত ই-কমার্স কোম্পানি ইভ্যালির ২ লাখ গ্রাহকের পাওনা ৩১১ কোটি টাকা বলে সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এছাড়া পণ্য সরবরাহ ও অন্যান্য ব্যবসায়িক পাওনাদারের ২০০ কোটি টাকার মতো পাওনা রয়েছে। ইভ্যালি যেসব গ্রাহককে রিফান্ড চেক দিয়েছে, ব্যাংক এ্যাকাউন্টে টাকা না থাকায় সেগুলোও বাউন্স হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার ইভ্যালির নথি চেয়ে বিভিন্ন সংস্থার কাছে চিঠি পাঠিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এদিকে ৬০০ ব্যবসায়ীকে ১০ দিনের মধ্যে মূল্য পরিশোধের কথা দিলেও ছয় মাসেও ২০০ কোটি টাকা ফেরত দেয়নি ধামাকা শপিং। এছাড়া দালাল প্লাস, আদিয়ান মার্ট, শ্রেষ্ঠ ডটকম, আলাদীনের প্রদীপ, কিউকম, ফাল্গুনী শপ এবং বুমবুমসহ কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করেছেন গ্রাহকরা। সব মিলিয়ে গত দেড় বছরে এসব কোম্পানির অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় হদিস নেই অন্তত এক হাজার কোটি টাকার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিপুল ডিসকাউন্টের বিতর্কিত মডেলের ব্যবসা, ক্রেতার সচেতনতার অভাব, তদারকিতে ঘাটতিসহ নানা কারণ এ খাতে অস্থিরতার জন্য দায়ী। জানা যায়, গত বছর করোনা ছড়িয়ে পড়ার পর দেশে অনেক নতুন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান চালু হয়েছে। এর মধ্যে কোন কোন প্রতিষ্ঠান নিজেদের ব্যবসা ও পরিচিতির জন্য ব্যাপক ডিসকাউন্ট পদ্ধতিতে ব্যবসা করে। এসব কোম্পানির আকর্ষণীয় অফারে অনেক মানুষ পণ্য কিনতে আগাম টাকা দিয়েছেন। একশ্রেণীর ব্যবসায়ী তৈরি হয়েছে, যারা এসব ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান থেকে ছাড়ে পণ্য কিনে বিক্রির কাজ করছেন, আবার কেউ কেউ পণ্য না নিয়ে নগদ টাকা নিচ্ছেন। কিন্তু চাহিদার পণ্য বা টাকা না পেয়ে অনেকেই এখন দ্বারস্থ হয়েছেন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরে। ২০১৮ সালের জুলাই থেকে গত জুন পর্যন্ত ১৯টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গ্রাহকরা ১৩ হাজার ৩১৭টি অভিযোগ করেছেন। গত জুলাই-আগস্ট সময়ে অভিযোগ বেড়েছে আরও কয়েক হাজার। অভিযোগগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই নির্ধারিত সময়ের দুই থেকে ছয় মাস পরও পণ্য বুঝে না পাওয়া নিয়ে। এর বাইরে ‘চেক ডিজ অনার’ হওয়া, ‘রিফান্ডের’ টাকা ফেরত না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক উর্ধতন কর্মকর্তা বলেন, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার মডেলের কারণে এ খাতে এক ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। এসব প্রতিষ্ঠান মানুষের কাছ থেকে অনেক টাকা আগাম নিয়েছে। এখন চেষ্টা চলছে গ্রাহকের টাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার। যেসব প্রতিষ্ঠান এ ধরনের কার্যক্রম করেছে তাদের সম্পদের হিসাব ও ব্যবসায়িক পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া আগামীতে যাতে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি না হয় সেজন্য একটি নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। যেখানে আগাম পরিশোধ, সময়মতো পণ্য সরবরাহ, লেনদেন প্রক্রিয়া সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে ই-কমার্সের প্রতি মানুষের আস্থা কমেছে। পরিস্থিতির উন্নয়নের জন্য ই-ক্যাবসহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কাজ করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ই-কমার্স ব্যবসায়ীদের সংগঠন ই-ক্যাবের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ২ শতাংশ মানুষ ই-কমার্সে কেনাকাটা করেন। ছোট-বড় মিলিয়ে দুই হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। ফেসবুক পেজ খুলে ব্যবসা করছে আরও ৫০ হাজার লোক। বর্তমানে অর্ডার সরবরাহ হচ্ছে দৈনিক গড়ে দুই লাখের বেশি। প্রচলিত ধারার বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ই-কমার্স চালু করছে। ই-কমার্স খাতে স্থিতিশীলতার জন্য ই-কমার্স ব্যবসায়ীদের সংগঠন ই-ক্যাব বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে ১৬টি কোম্পানিকে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ক্রেতাকে সেবা দিতে না পারার কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছে সংগঠনটি। গত সপ্তাহে ৪টি কোম্পানির সদস্যপদ বাতিল করেছে ই-ক্যাব। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো ই-অরেঞ্জ ডট শপ, টোয়েন্টিফোর টিকেটিং ডট কম, গ্রীণ বাংলা ই-কমার্স লিমিটেড এবং এক্সিলেন্ট ওয়ার্ল্ড এ্যাগ্রো ফুড এ্যান্ড কনজ্যুমার লিমিটেড। শিগগিরই আরও ৪/৫টি কোম্পানির সদস্যপদ বাতিল করবে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি। প্রতারণা রোধে সরকারের ৯ সংস্থা : অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পণ্য বা সেবা বিক্রির নামে ই-কমার্স কোম্পানিগুলোর নানামুখী প্রতারণা রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। গ্রাহকের সঙ্গে ধোঁকাবাজি, হয়রানি, অর্থ আত্মসাত ও অর্থ পাচার রোধে একযোগে কাজ করছে সরকারের কমপক্ষে নয়টি দফতর। সেগুলো হচ্ছে- বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় ডিজিটাল কমার্স সেল, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাংলাদেশ ব্যাংকের বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর এবং নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগের প্রধান ও ডিআইজি মোহাম্মদ আবদুল্লাহেল বাকী বলেন, ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, ধামাকা, আলাদীনের প্রদীপ, কিউকম, বুমবুমসহ অনলাইন ফ্ল্যাটফর্মে পণ্য বা সেবা বিক্রয় করা বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রতারণা, অর্থ আত্মসাত ও অর্থ পাচার নিয়ে আমরা তদন্ত অব্যাহত রেখেছি। আর কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে কঠোরভাবে তদন্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হবে। এক্ষেত্রে সরকারের অন্যান্য দফতরের সঙ্গে সমন্বয় করেই আমরা কাজ করছি।
০১:৫২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম :
আস্থার সঙ্কটে ই-কমার্স
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - প্রকাশিত : ১২:০০:১৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২১
- 60
ট্যাগ :
জনপ্রিয়




















